সববাংলায়

ভাইফোঁটা

ভাইফোঁটা হিন্দুদের একটি উৎসব যা কার্ত্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়দিন উদযাপিত হয়। উত্তর ভারতে এটি ‘ভাইদুজ’, গুজরাট গোয়া মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে ‘ভাউ বিজ’ এবং নেপালে ‘ভাই টিকা’ নামে পরিচিত। ভাইফোঁটার দিন বোনেরা তাদের ভাইদের কপালে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে তাদের দীর্ঘ জীবন কামনা করে।

২০২৪ সালের ভাইফোঁটা কবে?

  • বাংলা তারিখ: ১৭ কার্ত্তিক, ১৪৩১
  • ইংরাজি তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০২৪

এই উৎসবের আরও একটি নাম হল যম দ্বিতীয়া। কথিত আছে দেবতা সূর্য ও তাঁর স্ত্রী সংজ্ঞা’র দুই সন্তান ছিল। পুত্র যম ও কন্যা যমুনা। সূর্যের প্রবল তেজ সহ্য করতে না পেরে সংজ্ঞা পৃথিবীতে ফিরে যান আর যাওয়ার সময় তিনি রেখে যান তাঁর ছায়া যা কিনা হুবহু তাঁর মত দেখতে যাতে সূর্যের মনে হয় সংজ্ঞা তাঁর সাথেই আছেন। ছায়া ক্রমে অত্যন্ত নিষ্ঠুর সৎ মা হিসেবে প্রতিপন্ন হন ও সূর্যকে বশ করে যম ও যমুনাকে স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দেন। বছর যায়, মাস যায়। যমুনার ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে গেলেও ভাইয়ের জন্য খুব মন খারাপ করতে থাকে। অন্য দিকে যমেরও দিদির জন্য একই অবস্থা। যম ঠিক করে যমুনাকে দেখতে যাবে। দীপাবলির ঠিক দুদিন পর যম যখন দিদির বাড়ি পৌঁছয় দেখে দিদি যমের জন্য বিশাল অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করেছে। আপ্লুত যম দিদিকে বলেন দিদির কি উপহার চাই ভাইয়ের থেকে, উত্তরে যমুনা বলেন সে চায় এই দিনটি যেন পৃথিবীর সমস্ত ভাই তাদের বোনদের স্মরণ করে ও সমস্ত বোন যেন এই দিনটিতে তাদের ভাইদের দীর্ঘায়ু কামনা করে।এটি ছাড়াও ভাইফোঁটার উদ্ভব হিসেবে আরও একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। সেটি হল- নরকাসুরকে যুদ্ধে পরাজিত করার পর শ্রীকৃষ্ণ অক্ষত দেহে ফিরে আসেন।কৃষ্ণকে অক্ষত দেখে আনন্দিত সুভদ্রা ভাইয়ের কপালে পবিত্র তিলক পরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই থেকেই ভাই ফোঁটার উদ্ভব।

ব্রিটিশ গবেষক মুরিয়েল ম্যারিয়ন আন্ডারহিল  ভাইফোঁটার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে  বলেছেন এই দিনে যেহেতু যম আপন বাড়িতে না খেয়ে বোনের বাড়িতে গিয়ে খাওয়াদাওয়া করেন, সুতরাং এমন মনে করা যেতেই পারে  এ দিন কেউ মারা গেলে তাকে যমের বাড়ি যেতে হবে না । সঙ্গে এটাও লিখেছেন যে, এইদিন অনেকে দুপুরে যমের মূর্তি পূজা করেন এবং সুযোগ পেলে যমুনা নদীতে স্নান করেন।

সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁর ইন্ডিয়ান থিয়োগনি গ্রন্থে যম যমীকে নিয়ে যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন সেই অনুসারে, শুরুতে যম-যমীকে যমজ হিসেবে দেখা হত কিন্তু  ক্রমশ যম অশুভ শক্তি হিসেবে প্রতিপন্ন হলেন।ওদিকে যমীও পরিণত হলেন অমঙ্গলের দেবী নির্তি-তে। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ-এর এই যমী কালক্রমে  পুরাণের যমুনা নদীতে পরিণত হন এবং এই কারণেই কালো যমুনার আরেকনাম নাম কালিন্দী।

প্রসার ভারতীর প্রাক্তন কর্ণধার জহর সরকারের মতে- “রক্ষাবন্ধন অনুষ্ঠানটি খুব সম্ভবত নাগপঞ্চমী থেকে এসেছে। এটি সচরাচর ভরা বর্ষায় পালিত হয়, ঠিক যে সময় সাপের উত্পাত খুব বেশি হত, তাই বোনেরা সাপের কামড় থেকে ভাইদের রক্ষা করার জন্য এই তিথি পালন করত। হেমন্ত বা প্রথম শীতে সাপের ভয় অনেক কম। কিন্তু ঋতুপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নানা আধিব্যাধি আসে, তাদের হাত থেকে ভাইদের রক্ষা করতেই ভাই ফোঁটার প্রচলন হয়ে থাকতে পারে। আধুনিক চিকিত্সা ও ওষুধপত্র এসে অবশ্য যমের প্যাঁচপয়জার কিছুটা বানচাল করে দিয়েছে। বস্তুত, আশ্বিন-কার্ত্তিকে নানা উত্সবে ভূত প্রেত ডাকিনী যোগিনী ইত্যাদিদের প্রাদুর্ভাব, ভাই ফোঁটায় যমের দুয়ারে কাঁটা দিয়ে সেই পর্ব বছরকার মতো শেষ হয়। প্রসঙ্গত, দক্ষিণ ভারতে দেওয়ালির কয়েক দিন পরে ‘কার্ত্তিকেয় দীপম্’ অনুষ্ঠানে বোনেরা আরও এক বার প্রদীপ জ্বালান, ভাইয়ের মঙ্গলকামনায়।”

ভাইফোঁটার উদ্ভব বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু ভাই বোনের পবিত্র সম্পর্কের বুনটটা শক্ত হাতে ধরে রাখতে ভারতীয় বোনদের এই প্রচেষ্টার আন্তরিক অনুভূতিটা নিয়ে কোন মতপার্থক্য নেই সে কথা বলা যেতেই পারে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading