যে সমস্ত বাঙালি বৈজ্ঞানিক তাঁদের প্রতিভার বলে আন্তর্জাতিক স্তরেও খ্যাতিলাভ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন শশাঙ্ক চন্দ্র ভট্টাচার্য (Sasanka Chandra Bhattacharyya)। তিনি মূলত ছিলেন একজন প্রথিতযশা রসায়নবিদ। বিশেষত প্রাকৃতিক পণ্য রসায়ন (Natural Product Chemstry) এবং বিশ্লেষণী রসায়ন (Analytical Chemistry) ছিল তাঁর চর্চার ক্ষেত্র। টার্পিনয়েড-এর কাঠামো ও তার রূপরেখা এবং খুস ঘাসের তেল (Vetiver Oil) ও প্রাকৃতিক কস্তুরীর সংশ্লেষণ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। ভারতীয় জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। আইআইটি বোম্বের সঙ্গেও ছিল তাঁর সংযোগ। আবার বিখ্যাত বোস ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ভারতে বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ পুরস্কার শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছিল।
১৯১৮ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত আসাম প্রদেশে অবিভক্ত বাংলার সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত সিলেট অঞ্চলে শশাঙ্ক চন্দ্র ভট্টাচার্যের জন্ম হয়। তাঁর পিতা শিরীষচন্দ্র ছিলেন সংস্কৃতের একজন নামকরা পন্ডিত। তাঁর মায়ের নাম কাদম্বিনী দেবী।
বিদ্যালয় স্তরের পড়াশোনা সফলভাবে সম্পন্ন করবার পরে শশাঙ্ক চন্দ্র ভট্টাচার্য উচ্চশিক্ষার জন্য চলে এসেছিলেন কলকাতায়। এখানে এসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ বিজ্ঞান পড়বার উৎকৃষ্ট প্রতিষ্ঠান রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে তিনি ১৯৩৮ সালে বি.এসসি. ডিগ্রি লাভে সফলতা অর্জন করেন। সেখান থেকেই স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা করে ১৯৪০ সালে এম.এসসি. ডিগ্রি লাভ করেন। এই সময়েই বিখ্যাত এবং তৎকালের শ্রেষ্ঠ রসায়নবিদ হিসেবে পরিচিত এস.এস. গুহ সরকারের অধীনে পড়াশোনা করবার অমূল্য সুযোগ লাভ করেছিলেন তিনি। তাঁর কাছেই একরকম গবেষণার হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর। ১৯৪১ সালে অজৈব রসায়নে বিকারকের উপর গবেষণা-সংক্রান্ত তাঁদের দুজনের দুটি নিবন্ধও প্রকাশিত হয়েছিল।
এক নজরে শশাঙ্ক চন্দ্র ভট্টাচার্য-র জীবনী:
- জন্ম: ৩১ আগস্ট, ১৯১৮
- মৃত্যু: ১৯ মে, ২০১৩
- কেন বিখ্যাত: শশাঙ্ক চন্দ্র ভট্টাচার্য একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাঙালি বিজ্ঞানী। টার্পিনয়েড-এর কাঠামো ও তার রূপরেখা এবং খুস ঘাসের তেল (Vetiver Oil) ও প্রাকৃতিক কস্তুরীর সংশ্লেষণ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। ভারতীয় জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির সহ-সভাপতি ছিলেন, বোস ইনস্টিটিউটের পরিচালকও হয়েছিলন।
- পুরস্কার: ১৯৬২ সালে বিজ্ঞানে ভারতের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘শান্তি স্বরূপ ভাটনগর’ পুরস্কার পেয়েছেন।
স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হওয়ার পরে ১৯৪১ সালে শশাঙ্ক বেঙ্গালুরু যান এবং এখানকার বিখ্যাত ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সায়েন্সে (IISC) যোগ দেন। বিজ্ঞানের নেশা তখন পেয়ে বসেছে তাঁকে। এম.এসসি.-র পরে গবেষণা করবার দিকে মন দিয়েছিলেন তিনি। বেঙ্গালুরুর আইআইএসসি-তে আবার আরেক প্রথিতযশা জৈব রসায়নবিদ পি.সি গুহ-র সান্নিধ্য লাভ করবার সুযোগ হয় তাঁর। সেই পি.সি গুহ-র অধীনে চন্দন তেল গবেষণা শুরু করেছিলেন কিন্তু শশাঙ্ক চন্দন তেল রসায়নের ওপর তাঁর গবেষণাপত্র ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দিয়েছিলেন এবং এর এক বছর পরে তাঁকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছিল।
এরপর সুযোগ ঘটে গিয়েছিল বিদেশ যাওয়ার। ১৯৪৫ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়্যাল স্যোসাইটির একজন ফেলো বি.ল্যাথগোর তত্ত্বাবধানে শশাঙ্ক চন্দ্র ভট্টাচার্য কুষ্ঠরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সেন্টেলা এশিয়াটিকা নিয়ে গবেষণা করেন এবং ১৯৪৯ সালে তিনি তাঁর দ্বিতীয় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁরা এই ঔষধি গাছটির রাসায়নিক উপাদানগুলির ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করেছিলেন এবং তাঁদের এই গবেষণাকর্ম ‘নেচার’ পত্রিকায় দুটি নিবন্ধ হিসেবে প্রকাশ পেয়ছিল।
শশাঙ্ক চন্দ্র হার্টস ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে গবেষণায় একজন রসায়নবিদ হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। যদিও ১৯৪৯ থেকে ১৯৫০ সাল—এই একবছরই এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫০ সালে যখন তিনি ভারতবর্ষে ফিরে আসেন ততদিনে ভারতে স্বাধীনতা এসে গেছে। ফিরে এসে বেঙ্গালুরুর আইআইএসসি-এর রসায়ন বিভাগের একজন অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেছিলেন তিনি। এরপর ১৯৫১ সালে তাঁর কাছে জাতীয় রাসায়ানিক পরীক্ষাগার (NCL)-এ কাজ করবার সুযোগ আসে এবং সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে সেখানে প্রায় দেড় দশক তিনি একজন সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই এনসিএল-এ তিনি কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ-এর সহায়তায় অপরিহার্য তেলগুলির জন্য একটি নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেই বিভাগের ফাউন্ডার ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল, মুম্বাইয়ের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে ১৯৬৬ সালে একজন সিনিয়র প্রফেসর হিসেবে রসায়ন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে সেই পদ থেকে অবসর নেওয়ার সময় তিনি সেই বিভাগের উপ-পরিচালকের দায়িত্ব নেন। এখান থেকে অবসর নেওয়ার পর কলকাতার বোস ইনস্টিটিউটের পরিচালকের পদ গ্রহণ করেন তিনি এবং ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। একজন ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আইআইটি মুম্বইয়ের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র বজায় ছিল।
বিভিন্ন নামজাদা পত্রিকায় শশাঙ্ক চন্দ্র ভট্টাচার্যের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। প্রায় ২৫০টিরও বেশি গবেষণাধর্মী নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। ভারতে এসেও তিনি টের্পারনয়েড নিয়ে গবেষণা চালিয়ে গিয়েছিলেন এবং প্রাকৃতিক কস্তুরী গন্ধযুক্ত যৌগগুলির সংশ্লেষণের কাজ করেন, যার ফলে মস্কোন, ডাইহাইড্রোসিভেটোন, এক্সালটোন, এক্সালটোলাইড এবং অ্যামব্রেটোলাইডের মতো যৌগগুলির বিকাশ ঘটে, যেগুলির বাণিজ্যিক মূল্য আছে বলেও জানা যায়। এছাড়াও, তিনি জ্যাসমিন, রোজ অক্সাইড, স্যান্টালল এবং স্যান্টালিনের মতো যৌগগুলিও সংশ্লেষিত করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে চলা গবেষণা গোষ্ঠীর একটি প্রধান অবদান ছিল ভেটিভার অয়েলের উপাদানগুলির অ্যান্টিপোডাল প্রকৃতির প্রদর্শন। তিনি এবং তাঁর দল বেশ কিছু যৌগের পেটেন্টেরও অধিকারী। তিনি ৯০ জন ডক্টরেট ছাত্রকে পরামর্শদাতা ছিলেন এবং হাউস অব টাটাসের উপদেষ্টা হিসেবেও করেছেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ‘জার্নাল অফ ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটি’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এছাড়াও ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ কেমিস্ট্রি’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বোর্ডের একজন সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স একাডেমির কাউন্সিলে দায়িত্ব পালন করেন এবং পারফিউম অ্যান্ড ফ্লেভারস অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার (বর্তমানে ফ্রেগরেন্সেস অ্যান্ড ফ্লেভারস অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া নামে পরিচিত) আজীবন সদস্য তিনি। ১৯৬৬ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স একাডেমি তাঁকে একজন ফেলো হিসাবে নির্বাচিত করে। ১৯৭৫ সালে ইন্ডিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্সেসের একজন নির্বাচিত ফেলো হন। এছাড়াও ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটিরও একজন ফেলো ছিলেন তিনি।
বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন শশাঙ্ক চন্দ্র ভট্টাচার্য। মহারাজা সায়াজিরাও ইউনিভার্সিটি অব বরোদা ১৯৬০ সালে তাঁকে কেজি নায়েক স্বর্ণপদক প্রদান করে। কাউন্সিল অব সায়েন্টেফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ তাঁকে ১৯৬২ সালে ভারতীয় বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ পুরস্কার শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরস্কারে সম্মানিত করেন। তিনি ছিলেন এই পুরস্কারের তৃতীয় প্রাপক। ১৯৭৬ সালে পান আইএনএসএ থেকে অধ্যাপক টি.আর.শেষাদ্রীর ৭০তম জন্মদিবস স্মরণ পদক। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের প্ল্যাটিনাম জুবিলি মেডেল পান ১৯৮৫ সালে এবং ১৯৮৯ সালে পান আইএফইএটি পদক। এছাড়াও আচার্য পিসি রায় মেমোরিয়াল লেকচার অ্যান্ড মেডেল (১৯৬৯) এবং ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটির আচার্য জে সি ঘোষ মেমোরিয়াল লেকচার অ্যান্ড মেডেল (১৯৭১), মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে ভেঙ্কটরামন লেকচার অ্যাওয়ার্ড (১৯৭০) এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স একাডেমির জিপি চ্যাটার্জি লেকচার অ্যাওয়ার্ডে তিনি তাঁর মূল্যবান লেকচারও প্রদান করেছিলেন।
শশাঙ্ক চন্দ্র ভট্টাচার্যের স্ত্রী হলেন গীতা ভট্টাচার্য, ১৯৯৯ সালে যাঁর মৃত্যু হয়। তাঁদের মোট একটি ছেলে এবং দুটি মেয়ে রয়েছে। স্ত্রীবিয়োগের পর দেরাদুনে এক মেয়ের কাছেই থাকতেন। সেখানেই ২০১৩ সালের ১৯ মে ৯৪ বছর বয়সে এই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাঙালি বিজ্ঞানী শশাঙ্ক চন্দ্র ভট্টাচার্যের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান