সববাংলায়

রাজীব দীক্ষিত মৃত্যুরহস্য

ভারতবর্ষে বাবা রামদেব একজন বিশেষ জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। একজন যোগগুরু ও ভেষজ পণ্যাদির জন্য বিখ্যাত পতঞ্জলি ব্র্যান্ডটির প্রধান মুখ হিসেবে ভারতজোড়া খ্যাতি তাঁর। এই রামদেবেরই প্রায় ছায়াসঙ্গীর মত ছিলেন রাজীব দীক্ষিত, যাঁর আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে অনেক জল্পনার অবকাশ রয়ে গেছে। রামদেবের বিখ্যাত পরিকল্পনা ‘ভারত স্বভিমান আন্দোলন’-এর জাতীয় সচিব এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ সব উদ্যোগে রামদেবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নিকটতম ব্যক্তি রাজীব দীক্ষিতের মৃত্যুটিকে প্রাথমিকভাবে স্বাভাবিক এবং জেনেটিক অসুস্থতার কারণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও বেশ কিছু মানুষের উদ্যোগ এই মৃত্যুর নেপথ্যে কোন রহস্য লুকিয়ে থাকবার সম্ভাবনা যে আছে বা থাকতে পারে, সেদিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সহায়তা করেছিল। মাত্র ৪৩ বছর বয়সী একজন মানুষের এই আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে গণমাধ্যম যেমন তোলপাড় হয়েছিল তেমনই সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটা কৌতুহল জেগে উঠেছিল কারণ বাবা রামদেবের মত এত জনপ্রিয় এক মানুষের নাম জড়িয়ে ছিল এই ঘটনার সঙ্গে। রাজীব দীক্ষিত মৃত্যুরহস্য কালের নিয়মে ম্লান হয়ে গেলেও রামদেবের জীবন সম্পর্কিত আলোচনায় এই মৃত্যুর প্রসঙ্গ নিরপেক্ষ ও সত্যানুসন্ধানী মানুষের পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

রাজীব দীক্ষিতের জন্ম হয় ১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর উত্তর প্রদেশের আলিগড় জেলার নাহ গ্রামে। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সমাজকর্মী, স্বদেশী আন্দোলনের প্রচারক ও জনসচেতনতা সৃষ্টিকারী বক্তা। তিনি ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।ইলেকট্রনিক্স ও টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সমাজসেবার পথে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি “আজাদী বাঁচাও আন্দোলন”-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। রাজীব দীক্ষিত ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, বহুজাতিক সংস্থার কার্যকলাপ, ঐতিহ্যবাহী আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা, রাসায়নিকমুক্ত খাদ্য ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন এবং তাঁর জ্ঞান সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সারা জীবন কাজ করেন।

অফিসিয়াল রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০ সালের ৩০ নভেম্বর নিজের জন্মদিনের দিন রাজীব দীক্ষিতের আকস্মিকভাবে মৃত্যু হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ডাক্তাররা জানিয়েছিলেন যে হার্ট অ্যাটাকের কারণেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর। ছত্তিসগড়ের বেশ প্রান্তিক এক শহর বেমেতারার আর্য সমাজ গেস্ট হাউসের বন্ধ বাথরুমে পড়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে তাঁকে উদ্ধার করে নিকটবর্তী ভিলাইয়ের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেই হাসপাতালেই ৪৩ বছর বয়সে পদার্পণের দিনই মৃত্যু হয়েছিল তাঁর।

‘ভারত স্বভিমান আন্দোলন’ (Bharat Swabhiman Andolan) মডেলটিকে বাবা রামদেব একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন। এইরকম পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গে রাজীব দীক্ষিতেরও গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছিল। তিনিই হয়ে উঠেছিলেন রামদেবের এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নের একজন প্রধান মুখ। ক্রমশ বাবা রামদেবের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার কারণে রাজীব দীক্ষিত অনেকেরই বিরাগভাজন হয়ে উঠেছিলেন। যখন তিনি রামদেবের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হয়ে উঠলেন তখন বালকৃষ্ণ এবং রাম ভারতের মত মানুষেরা বহিরাগত রাজীব দীক্ষিতের প্রতি বেশ কিছুটা অসন্তুষ্টই হয়েছিলেন বলে মনে হয়।

রামদেব এবং রাজীব ভারত স্বভিমান দলের পক্ষে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায় করবার জন্য দেশব্যাপী ভারত স্বভিমান যাত্রা শুরু করেন এবং তার দু’মাস পর বেমেতারার গেস্ট হাউসে রাজীব দীক্ষিতের হার্ট অ্যাটাকের ঘটনাটি ঘটে।
রাজীবের মৃত্যুর পর রামদেব তাঁর শোকাহত পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন এবং গঙ্গার তীরে রাজীবের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে রাজীবের পরিবারও রামদেবের কথায় রাজি হয়। তবে ওয়ার্ধায় নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে রাজীবের মৃতদেহ চার্টার্ড বিমানে করে নিয়ে যাওয়া হয় হরিদ্বারে। তবে মদন দুবের (রাজীবের ঘনিষ্ঠ, আজাদি বাঁচাও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ একজন অংশ) মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল রাজীবের মৃতদেহ দেখবার পর। রাজীবের মুখে অদ্ভুত বেগুনি ও নীল আভা লক্ষ করা গিয়েছিল। তাঁর ত্বক অদ্ভুতভাবে খোসার মতো ঝরে পড়ছিল। এমনকি নাকের কাছে কালো-নীল রক্তের আভাসও দেখেছিলেন বলে মনে করেন দুবে। ফলে ধীরে ধীরে এই মৃত্যুর পিছনে একটা ষড়যন্ত্র উঁকি দিতে শুরু করে। অনেকের মধ্যেই চাপা উত্তেজনা ও ফিসফিস চলছিল এই মৃত্যু নিয়ে। মদন দুবে অবশেষে সাহস করে গলা তুলে রাজীব দীক্ষিতের ময়নাতদন্তের দাবি তোলেন। মদন দুবেকে যারা সমর্থন করেছিল তাদের তিনি রামদেবের উদ্দেশে লেখা ময়নাতদন্তের দাবি জানানো এক আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করতে বলেন। রাতের মধ্যে তাতে প্রায় পঞ্চাশ জন স্বাক্ষর করেছিল।

পরদিন সকাল ছয়টায় শীতের কুয়াশা ভেদ করে মোট নয়জনের একটি দল রামদেবের আবাসের দিকে গিয়েছিলেন কিন্তু প্রহরীরা তাদের ঢুকতে দেয়নি। তখন দুবে প্রহরীকে বলে দেন যে বাবাজীকে যেন তারা বলে দেয় যে ময়নাতদন্তের আগে মৃতদেহ সৎকার করতে তাঁরা দেবেন না। রামদেব অবশেষে মদন দুবেদের সঙ্গে সকাল সাড়ে সাতটায় একটি বৈঠকে বসতে রাজি হন। দুবে জানান তাঁদের মোবাইল ফোনগুলি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যাতে কিছু রেকর্ড করা না যায়। এরপর বৈঠকে পোস্টমর্টেম করা নিয়ে বাগবিতণ্ডা চলে। দুবেরা পোস্টমর্টেমের দাবি জানালেও রামদেব বলেন মৃতের শরীর কাটাছেঁড়া করা হিন্দুধর্মবিরোধী। তিনি এও বলেন যে, তিনি নিজের ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁরা এটাকে হার্ট অ্যাটাক বলেই ঘোষণা করেছেন। দুবেরা জানান এই কথায় তাঁদের বিশ্বাস নেই। দুবের বয়ান অনুযায়ী, রামদেব এমন কথার পর রেগে যেতে থাকেন। এমনকি দুবেরা হিন্দুধর্মবিরোধী মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বলেছিলেন রাজীব নিজেকে কোনও ধর্মের মানুষ বলে মনে করতেন না। তাঁর ধর্ম ছিল দেশের মানুষের সেবা করা। দুবে তখন এই প্রশ্নও তুলেছিলেন যে, রামদেবের দলের অন্যান্য লোকেদের রাজীবের সঙ্গে মতবিরোধ হয়েছিল কিনা! এমনকি বক্রোক্তি করবার মতো বলেছিলেন বহিরাগত রাজীব যে রামদেবের এত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন এটাও নিশ্চয়ই এই দলের অনেকের পছন্দ হয়নি। প্রায় একঘন্টারও বেশি এই বৈঠক চলে। দুবে জানিয়েছেন এরপর রামদেব সকলকে সেই হলঘরে যাওয়ার কথা বলেন যেখানে রাজীবের মৃতদেহ রাখা ছিল এবং সেখানে গিয়ে দীক্ষিত পরিবারের মত চাওয়ার কথা বলা হয়। বাবাজি নিজে পারিষদদের নিয়ে গাড়ি করে রওনা দেন এবং দুবে তাঁর লোকজন নিয়ে প্রায় কুড়িমিনিটের হাঁটাপথে গিয়ে হলে পৌঁছন। রামদেব আগে হলে পৌঁছে নিজের ক্ষোভ উগরে দেন দুবেদের উপর। সেই হলেই একজন ডাক্তার যখন রামদেবকে জিজ্ঞেস করেন কেন তিনি পোস্টমর্টেমের জন্য রাজি হচ্ছেন না, তখন আরও রেগে যান রামদেব। অবশেষে মৃতদেহ দাহ করবার আদেশ দেন নিজের লোকদের। যখন দুবেরা সেই হলে পৌঁছন দেখা যায় রাজীবের মৃতদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে রওনা দেওয়া হয়েছে সৎকারের জন্য। কনভয়টি শ্মশানে যখন পৌঁছায় সেখানে অসংখ্য মানুষের ভিড় ছিল। প্রদীপ দীক্ষিতকে তখন রামদেব পোস্টমর্টেমের কথা জিজ্ঞেস করলেও প্রদীপ জানিয়েছিলেন যে বাবা নিজে যা ঠিক করেছেন, তাই হোক। এরপরই পোস্টমর্টেম ছাড়াই রাজীবের মৃতদেহ সৎকার করা হয়।

রাজীব দীক্ষিতের সহোদর প্রদীপ দীক্ষিতের কথা অনুযায়ী রাজীবকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় ভারত স্বভিমান আন্দোলনের কর্মীরা ছত্তিসগড় থেকে তাঁকে ফোন করেছিলেন। তবে রাজীবের সঙ্গে তিনি কথা বলতে পারেননি, কারণ কর্মীরা জানিয়েছিলেন যে রাজীব কথা বলবার মতো অবস্থাতে নেই। প্রদীপ দীক্ষিতের বয়ান অনুযায়ী পরেরদিন সকালে তিনি যখন হাসপাতালে পৌঁছান তখন তাঁর ভাই মৃত।

প্রদীপ দীক্ষিতের এই বয়ানের সঙ্গে কিন্তু বাবা রামদেবের নিজের বলা কথারই অসঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায়। রামদেব জানিয়েছিলেন দীক্ষিত নাকি স্থানীয় ডাক্তারের প্রেসক্রাইব করা ওষুধ খেতে রাজি হননি। এমনকি টেলিভিশনে আস্থা চ্যানেলে সম্প্রচারিত এক কথোপকথনে এও জানিয়েছিলেন যে, তিনি রাজীব দীক্ষিতের সঙ্গে ফোনে প্রায় ঘন্টাখানেক কথা বলেছিলেন এবং রাজীবকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন তাঁর রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের মত কিছু জেনেটিক সমস্যা রয়েছে। প্রদীপ দীক্ষিত বিস্মিত হন এই কারণেই যে, ভারত স্বভিমান আন্দোলনের কর্মীরা তাঁকে জানিয়েছিল রাজীব কথা বলার অবস্থায় নেই অথচ রামদেব কীভাবে রাজীবের সঙ্গে ফোনে এক ঘন্টা কথা বললেন! এমনকি প্রদীপ দীক্ষিত এও জানিয়েছিলেন যে, রাজীব কখনও ডায়াবেটিস, রক্তচাপ কিংবা হৃদরোগের জন্য কোনও ওষুধ খাননি। প্রদীপকে পরে এও জিজ্ঞেস করা হয় যে, শ্মশানে তিনি কেন রামদেবকে পোস্টমর্টেমের কথা বলেননি? প্রদীপবাবু তখন বলেছিলেন অত অসংখ্য লোকের মাঝে দাঁড়িয়ে অমন অবস্থায় তিনি কী বলবেন বুঝতে পারেননি। এমনকি পোস্টমর্টেম রিপোর্ট যে জাল করা হবে না তার গ্যারান্টিও তো ছিল না, ফলে তিনি তখন বাবাজিদের সিদ্ধান্তেই সায় দিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য যে দেহ সৎকারের পরে রাজীবের ফোন এবং ল্যাপটপ যখন তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়, দেখা যায় ল্যাপটপের তিনটি ডিভাইসের সমস্ত তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। এমনকি দুবে এও জানান যে, হরিদ্বারের রাজীবের ঘরটিকেও তিনি অগোছালো অবস্থায় দেখেছিলেন যেন লুটপাট করা হয়েছে সেখানে। তাঁর জিনিসপত্র এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রও উধাও হয়ে গিয়েছে। এইসব তথ্যগুলি রাজীব দীক্ষিত মৃত্যুরহস্যকে আরও বেশি রহস্যাবৃত করে তোলে এবং এর নেপথ্যে যে কোনও গভীর ষড়যন্ত্র ছিল তারও ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু মৃতদেহ সৎকারের আগে যেহেতু পোস্টমর্টেম করবার কোনও সুযোগ দেওয়া হল না ফলত মৃত্যুর আরও বিশদ কারণ জানার কোনওরকম সম্ভাবনাই রইল না। ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী অফিস থেকে মধ্যপ্রদেশ পুলিশকে রাজীব দীক্ষিত হত্যারহস্য পুনরায় তদন্ত করতে নির্দেশ দেয়। অবশ্য তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে আর বিশেষ কিছু জানা জায় না। তবে যাই হোক, বাবা রামদেবের জীবনের সঙ্গে একরকম কলঙ্কের দাগের মতই তাই রাজীব দীক্ষিত মৃত্যুরহস্য ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকবে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading