রুয়াল আমুনসেন (Roald Amundsen) ছিলেন নরওয়ের একজন বিখ্যাত মেরু অভিযাত্রী ও আবিষ্কারক। তাঁর সম্পূর্ণ নাম রুয়াল এঙ্গেলব্রেগ গ্রাওনিং আমুনসেন। ১৯১০ সাল থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে দক্ষিণ মেরুতে পদার্পণকারী প্রথম অভিযাত্রীদলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। উত্তর এবং দক্ষিণ মেরুজয়ী অভিযাত্রীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বপ্রথম। সর্বপ্রথম নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ (Northwest Passage) ব্যবহার করার জন্যও তিনি পরিচিত।
১৮৭২ সালের ১৬ জুলাই নরওয়ের বর্জ শহরের এক জাহাজ মালিক এবং নাবিক পরিবারে রুয়াল আমুনসেনের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ইয়েন্স আমুনসেন এবং মা হানা সাহলকভিস্ট। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের চতুর্থ সন্তান। আমুনসেন ছিলেন চিরকুমার।
কিশোর রুয়াল আমুনসেন স্যার জন ফ্রাংকলিনের (John Franklin) মেরু-অভিযানের কাহিনি এবং ১৮৮৮ সালে ফ্রিৎসফ নানসেনের (Fridtjof Nansen) গ্রিনল্যান্ড অতিক্রম করার কাহিনি জেনে অভিযাত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর মা চাননি যে, তাঁর পরিবারের মতো আমুনসনও জাহাজ শিল্প বা নাবিক জীবন বেছে নিক। মায়ের ইচ্ছা ছিল তাঁকে ডাক্তার বানাবেন। তাই তিনি তাঁকে পারিবারিক জাহাজ-শিল্পের সাথে যুক্ত হওয়া থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতেন।
মায়ের মৃত্যুর-আগে পর্যন্ত আমুনসেন মায়ের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অন্তরে অভিযাত্রীদের জীবনের প্রতি আগ্রহ সবসময়ই সুপ্ত ছিল। আর তাই মায়ের মৃত্যুর পর ২১ বছর বয়সে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে নাবিক জীবনই বেছে নিয়েছিলেন।
১৮৯৭-৯৯ সালে সংঘটিত বেলজিয়ান দক্ষিণ মেরু অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন ফার্স্ট মেট হিসেবে। এটা শীতকালে সংঘটিত দক্ষিণ মেরুর প্রথম অভিযান ছিল। আদ্রেঁ দ্যা গেরলাশের নেতৃত্বে ‘‘বেলজিকা’’ নামক জাহাজে করে তাঁরা এই অভিযানে বের হয়েছিলেন। নাবিকদের ভুল অথবা নকশার ভুলে ‘বেলজিকা’ অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের পশ্চিমে অ্যালেকজ্যান্ডার ল্যান্ড হিমবাহে আটকে যায়। তখন আমুনসেনের দেওয়া ধারণা অনুযায়ী, জাহাজের মার্কিন ডাক্তার ফ্রেডেরিক কুক পশু শিকার করে তাজা মাংস খাইয়ে অভিযাত্রীদের স্কার্ভি রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী অভিযানে আমুনসেনের জন্য একটি শিক্ষনীয় বিষয় ছিল।
১৯০৩ সালে রুয়াল আমুনসেন প্রথমবারের মতো আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যবর্তী নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করতে সক্ষম হন। এর আগে অনেকে চেষ্টা করলেও এই প্যাসেজ অতিক্রম করতে পারেনি। তাঁর নেতৃত্বে আরও ছয়জন অভিযাত্রী সঙ্গে নিয়ে ৪৫ টন ওজনবিশিষ্ট জোইয়া (Gjoa) নামের জাহাজে করে এই অভিযানে বেরিয়েছিলেন তিনি। তাঁরা ব্যাফিন উপসাগর, ল্যাংকাস্টার, পীল সাউন্ড এবং জেমস রস, সিম্পসন ও রে প্রণালী অতিক্রম করেছিলেন। কিং উইলিয়াম দ্বীপে গিয়ে দুটি শীতকালও পার করেছিলেন। এই জায়গাটি বর্তমানে কানাডার নুনাভুট প্রদেশে জোইয়া হেভেন নামে পরিচিত।
এসময় আমুনসেন স্থানীয় নেটসিলিক অধিবাসীদের কাছ থেকে উত্তরমেরুর প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার কিছু কৌশল আয়ত্ত্ব করেছিলেন। যেমন, পণ্যবাহী স্লেজ ডগ ব্যবহার করতে শেখেন, উলের ভারী পার্কার বদলে পশুর চামড়া ব্যবহার করা শেখেন। বরফে আটকাবস্থায় তৃতীয় শীতকাল অতিবাহিত করার পর আমুনসেন বোফোর্ট সাগরে একটি প্যাসেজ খুঁজে পান যা তাকে বেরিং প্রণালীতে নিয়ে যায়। এইভাবে তাঁর নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ অতিক্রম সম্পূর্ণ হয়।
এরপর তিনি ভিক্টোরিয়া দ্বীপের আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়েছিলেন। এবং ১৯০৫ সালের ১৭ আগস্ট কানাডীয় আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জ অতিক্রম করেন। কিন্তু প্রচন্ড শীতে তিনি আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে পৌঁছানোর আগে বাধ্য হয়েই থেমে যান। সেখান থেকে পাঁচশ মাইল দূরে আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের ঈগল সিটিতে একটি টেলিগ্রাফ অফিস খুঁজে পান। ১৯০৫ সালের ৫ ডিসেম্বর আমুনসেন স্থলপথে সেই টেলিগ্রাফ অফিসে গিয়ে একটি সফলবার্তা পাঠিয়ে আবার জাহাজে ফিরে যান। ১৯০৬ সালে তিনি নোম পৌঁছান।
এসময় আমুনসেন জানতে পারেন যে নরওয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সুইডেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এবং নতুন রাজা সপ্তম হাকোন তাঁর দায়িত্বভারও গ্রহণ করেছেন। আমুনসেন তখনই নতুন রাজাকে সাফল্যবার্তা পাঠিয়ে দেন।
১৯০৯ সালে রুয়াল আমুনসেন পরিকল্পনা করেন নর্থ পোলার বেসিন জয়ের। এ অভিযানের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে প্রথমে ফ্রেডেরিক কুক এবং পরবর্তীতে রবার্ট পিয়েরি উত্তর মেরু বিজয় করেছেন বলে দাবী করেছেন। আমুনসেন তাই এই পরিকল্পনা পরিবর্তন করে দক্ষিণ মেরু অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। তবে পরিকল্পনাটি রবার্ট ফ্যালকন স্কট এবং নরওয়েবাসীর কাছ থেকে গোপন রাখেন।
১৯১০ সালের ৩ জুন তিনি ফ্রাম নামের একটি জাহাজ নিয়ে অসলো থেকে দক্ষিণ দিকে যাত্রা করেন। মাঝসমুদ্রে পৌঁছানোর পর আমুনসেন তাঁর পরিকল্পনার কথা তাঁর সঙ্গীদের জানান। এবং স্কটকে একটি টেলিগ্রাম বার্তা দিয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। স্কটও দক্ষিণ মেরু অভিযানের পরিকল্পনা করছিলেন তাই এই ব্যাপারটি সহজে মেনে নিতে পারলেন না। আর তাই ফ্যালকন স্কটও ১৬ জনের একটি দল নিয়ে রওনা দেন দক্ষিণ মেরু জয় করার উদ্দেশ্যে।
রুয়াল আমুনসেন ও ফ্যালকন স্কট দুজনের দলই ১৯১১ সালের জানুয়ারিতে অ্যান্টার্কটিকায় পৌঁছায়। প্রথম কয়েক মাস তাঁরা তাঁদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাতে থাকেন। শীত কেটে যাওয়ার পরপরই ২০ অক্টোবর দক্ষিণ মেরু যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন আমুনসেন। সঙ্গে নিলেন স্লেজ ডগ। আর উলের তৈরি পোশাকের পরিবর্তে কারিবু স্কিন ।
অন্যদিকে স্কট নিলেন মোটর লাগানো স্লেজ। যা কিছুদূর যাওয়ার পর বিকল হয়ে পড়ে। তিনি সঙ্গে নিয়েছিলেন ঘোড়া। প্রচণ্ড শীতে তুষারের ফাঁকে ঘোড়াগুলোর পা ভেঙে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত গুলি করে মেরে ফেলতে হয়েছিল। এছাড়া এতো বেশি জিনিসপত্র নিয়েছিলেন যে সেই ওজনেই তাঁর মোটর ও ঘোড়া বেশিদূর এগোতে পারেনি।
ইতিমধ্যে রস আইস শেলফের পূর্ব দিকে একটি বিশাল খাঁড়িতে পৌছাঁন আমুনসেনের দল। এখানেই তাঁর মূল ক্যাম্প নির্বাচন করে জায়গাটির নাম দিলেন “ফ্রামহেইম”। ১৯১১ সালের ১৯ অক্টোবর তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে আমুনসেন সেখান থেকে আবার যাত্রা শুরু করলেন। তাঁদের সঙ্গে ৪টি স্লেজ এবং ৫২টি কুকুর ছিল। অজ্ঞাত এক্সেল হাইবার্গ গ্লেসিয়ারের মধ্যবর্তী একটি পথ ব্যবহার করে চার দিন পর ২১ নভেম্বর তাঁরা পোলার উপদ্বীপে পৌঁছান। ১৯১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাঁদের পাঁচজনের দলটি ১৬টি কুকুর সাথে নিয়ে ৯০°০’মেরুতে দক্ষিণে পৌঁছান। আমুনসেন দক্ষিণ মেরুতে তাঁদের ক্যাম্পের নাম দেন পোলহেইম, “হোম অফ দ্য পোল”। সেই সাথে অ্যান্টার্কটিক উপত্যকার নাম বদলে রাজা সপ্তম হাকোন উপদ্বীপ রাখেন। এবং সেখানে পতাকা উত্তোলোন করেন। তাঁরা আতঙ্কে ছিলেন যে, হয়ত ঠিকমতো ফ্রামহেইমে ফিরতে পারবেন না। তাই আমুনসেন ও তাঁর দল একটি চিঠিতে তাঁদের জয়ের কথা উল্লেখ করে তাঁবুতে রেখে আসেন। এবং পতাকা উত্তোলন করেন।
অপরদিকে ১৯১২ সালের জানুয়ারিতে স্কটরা দক্ষিণ মেরু পৌঁছে দেখেন, তাঁদের আগেই আমুনসেন সেখানে পৌঁছে গেছেন। সেখানে টাঙানো তাঁবুর মাথায় উড়ছে নরওয়ের পতাকা। এই অভিযানেই স্কটের মৃত্যু হয়।
১৯১২ সালের ২৫ জানুয়ারি রুয়াল আমুনসেন তাঁর দল নিয়ে ১১টি কুকুর সহ ফ্রামহেইমে ফিরে যায়। ১৯১২ সালের ৭ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার হোবার্টে পৌঁছে আমুনসেনের সাফল্যের কথা জনসমক্ষে ঘোষণা করেন।
১৯১৮ সালে রুয়াল আমুনসেন মড নামে আরেকটি জাহাজ নিয়ে নতুন অভিযানে বের হয়েছিলেন। ১৯২৫ সালে অভিযানটি শেষ হলেও সফল হননি তিনি।
১৯২৫ সালে এন-২৪ ও এন-২৫ নামের দুটি বিমানে রুয়াল আমুনসেন ৮৭° ৪৪’ উত্তর অক্ষাংশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এটি ছিল তখন পর্যন্ত বিমান নিয়ে পৌঁছানো সর্বাধিক উত্তর অক্ষাংশ। এন-২৪ বিমানটি অবতরণের সমযেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিমান এন-২৫ এ ঠাসাঠাসি করে ছয় জন অভিযাত্রী ওঠেন। এবং রিজার-লারসেন তাঁর বুদ্ধি ও প্রচেষ্টা দিয়ে ফাটল ধরা বরফের উপরে বিমানটিকে উড্ডয়ন করাতে সক্ষম হন। তাঁরা সেদিন ধরেই নিয়েছিলেন যে আর ফিরতে পারবেন না। বরফের বুকে চিরকালের জন্য তাঁরা হারিয়ে যাবেন। কিন্তু আমুনসেন তাঁর দল নিয়ে ঠিকই সফল হয়ে ফিরেন।
১৯২৬ সালে রুয়াল আমুনসেন ৪ জনের একটি দল নিয়ে প্রথমবারের মত আর্কটিক অতিক্রম করেছিলেন। তাঁরা একটি এয়ারশিপ নোর্জ ব্যবহার করেছিলেন, যেটি তাঁর দলের নোবিলের নকশা করা ছিল। ১৯২৬ সালের ১১ মে স্পীটসবার্জেন থেকে রওনা দিয়ে দুই দিন পর আলাস্কায় পৌঁছান তাঁরা। এর আগে আরও তিনজন উত্তর মেরুতে পৌঁছানোর দাবী করেছিলেন। প্রথমবার ফ্রেডেরিক কুক ১৯০৮ সালে, দ্বিতীয়বার রবার্ট পিয়েরি ১৯০৯ সালে এবং তৃতীয়বার রিচার্ড বেয়ার্ড ১৯২৬ সালে। কিন্তু তাঁরা সেগুলোর জয়ের কোনও শক্তিশালী প্রমাণ দিতে পারেননি। আর তাই অনেকেই আমুনসেন ও তাঁর সহ-অভিযাত্রীদেরকেই প্রথম উত্তরমেরুতে পৌঁছানো অভিযাত্রী বলে স্বীকৃতি দেন।
১৯২৮ সালের ১৮ জুন রুয়াল আমুনসেন ইতালির অভিযাত্রী উম্বেরতো নোবিলকে উদ্ধার করতে এক অভিযানে উত্তর মেরুর দিকে যান। কিন্তু এই উদ্ধার কাজে গিয়ে রুয়াল আমুনসেন তাঁর দলসহ চিরতরে হারিয়ে যান।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান