ইতিহাস

মার্লোন ব্র্যান্ডো

মার্লোন ব্র্যান্ডো জুনিয়র (Marlon Brando Jr) একজন বিশ্বখ্যাত আমেরিকান চলচ্চিত্র অভিনেতা ও পরিচালক যিনি শুধুমাত্র নিজের অভিনয় ক্ষমতাকে সম্বল করে হলিউডে এক নতুন যুগের সুচনা করেন। তাঁকে তর্কযোগ্যভাবে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে মনে করা হয়ে থাকে। বিশ্বযুদ্ধের পরে রনক্লান্ত দেশবাসীর সামনে এক নতুন স্বাদের, আঙ্গিকের অভিনয়ের পরিচয় দিয়ে অভিনেতা থেকে রাতারাতি স্টার হয়ে উঠতে খুব বেশী সময় লাগেনি ব্র্যান্ডোর। একের পর এক ইতিহাসসৃষ্টিকারী ছবিতে তাঁর চোখ ধাঁধানো অভিনয় তৈরি করেছে অগুনতি গুণগ্রাহীর দল এবং একপাল উঠতি অভিনেতা যারা তাঁকে সামনে রেখে পথ চলতে শুরু করেছিলেন, আর সাফল্য পাওয়ার পরে কৃতজ্ঞ চিত্তে আজও মনে রেখেছেন তাঁকে। প্রচলিত ছক ভেঙে তাই তিনি কখনও পায়ে পা মেলান মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান-বিরোধী নেতার, আবার কখনও হলিউডের ছবিতে আমেরিকার নেটিভ ইন্ডিয়ানদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়না বলে ফিরিয়ে দেন মহামূল্যবান অস্কার। চলচ্চিত্র অভিনয়ে স্ট্যানিস্লাভস্কি পদ্ধতি এবং মেথড অ্যাক্টিং প্রবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁকে পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৯২৪ সালের ৩ এপ্রিল, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা রাজ্যের ওমাহা শহরে মার্লোন ব্র্যান্ডো জুনিয়ারের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম মার্লোন ব্র্যান্ডো সিনিয়ার এবং মায়ের নাম ডরোথি জুলিয়া পেনিবেকার। তাঁর বাবা ছিলেন কেমিক্যাল ফিড নির্মাতা ও এবং তাঁর মা ছিলেন একজন মঞ্চাভিনেত্রী। মার্লোনরা তিন ভাইবোন। বড় বোন জসেলিন ছিলেন অভিনেত্রী ও ছোটবোন ফ্র্যানি একজন চিত্রশিল্পী। দুই বোনই এক সময় অভিনয় ও শিল্পকলা নিয়ে পড়াশুনো করতে নিউ ইয়র্ক যাত্রা করেন। ১৯৫৭ সালে খ্যাতির মধ্যগগনে থাকা মার্লোন ব্র্যান্ডো বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন অভিনেত্রী আনা কাশফির সাথে। তাঁর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের পর ১৯৬০ সালে মার্লোন বিয়ে করেন মোভিটা কাস্তানেডাকে। মার্লোন তৃতীয়বার বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন ১৯৬২ সালে ফরাসী অভিনেত্রী তারিতা তেরিপাইয়ার সাথে। তিন স্ত্রীয়ের গর্ভে মার্লোনের মোট এগারোটি সন্তানের জন্ম হয়।

তাঁর বোনেরা যখন অভিনয় আর চিত্রকলা নিয়ে আরও পড়াশুনোর জন্য পাড়ি জমিয়েছেন নিউ ইয়র্কে, মার্লোন তখন লিবার্টিভিল হাই স্কুল থেকে বিতাড়িত হন। এরপর তাঁর বাবা তাঁকে ভর্তি করে দেন শাটাক মিলিটারি অ্যাকাডেমীতে। পড়াশুনোয় মোটামুটি উতরে গেলেও শিক্ষকের সাথে অভব্যতার জন্য এখান থেকেও তাঁকে বিতাড়িত করা হয়। পরের বছর যখন আবার এই প্রতিষ্ঠান থেকে ডাক পেলেন মার্লোন, তখন আর ফিরে গেলেন না তিনি। তাঁর বাবার তাঁর ওপর জমে থাকা রাগ আর মায়ের অত্যাধিক মাদকাসক্তি মার্লোনের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বাবার ব্যবহারে, কথাবার্তায় তাঁর মনে ধারনা জন্মাচ্ছিল যে তাঁকে দিয়ে কিছুই হবেনা। মাঝেমাঝেই মদ্যপ অবস্থায় মাকে ফিরিয়ে আনতে হত বাড়িতে তাঁকেই। মার্লোন মায়ের নজরে পড়ার জন্য পশুপাখির ডাক নকল করে শোনাতেন। অভিনয়ের প্রতি ভালবাসার টানেই শাটাক মিলিটারি অ্যাকাডেমীর ডাক অগ্রাহ্য করে ১৮ বছর বয়সে মার্লোন নিউ ইয়র্কে যাত্রা করলেন। আমেরিকান থিয়েটার উইং প্রোফেশনাল স্কুলে প্রশিক্ষণ চলাকালীন সংস্পর্শে এলেন স্টেলা আডলারের এবং তাঁর হাত ধরেই জানতে পারলেন স্ট্যানিস্লাভস্কি সিস্টেম, বা মেথড অ্যাক্টিংয়ের বিষয়ে। অভিনয়ের এই ধারাকে মঞ্চে এবং পরবর্তীকালে সিনেমার পর্দায় সফলভাবে আনার কৃতিত্ব অনেকাংশেই মার্লোন ব্র্যান্ডোর।

১৯৪৪ সালে ব্রডওয়েতে মার্লোন ব্র্যান্ডো আত্মপ্রকাশ করেন ‘আই রিমেম্বার মামা’ নাটকে। টানা দু-বছর ধরে সাফল্যের সাথে চলার পর ১৯৪৬ সালে নিউ ইয়র্ক সমালোচকদের থেকে “ব্রডওয়ের সবথেকে প্রতিভাবান অভিনেতা”-র খেতাব পান তিনি। এরপরই ১৯৪৭ সালে রাতারাতি তারকা হিসেবে ছড়িয়ে পড়লো তাঁর নাম এলিয়া কাজান নির্দেশিত ব্রডওয়ের পরবর্তী প্রযোজনা টেনেসি উইলিয়ামসের ‘আ স্ট্রিটকার নেমড ডিসায়ার’- এ স্ট্যানলি কোওওলস্কি’র চরিত্রে তাঁর অসামান্য অভিনয়ের দৌলতে। ১৯৫০ সালে ফ্রেড জিনারম্যানের ‘দ্য মেন’ ছবিতে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন মার্লোন ব্রান্ডো। এই ছবিতে তাঁকে এক প্রতিবন্ধীর চরিত্রে অভিনয় করতে হবে শুনে একটি পক্ষাঘাত পুনর্বাসন কেন্দ্রে কয়েকমাসের জন্য ভর্তি হয়ে যান মেথড আক্টিংয়ের এই একনিষ্ঠ ছাত্র। এই ধরনের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এর আগে হলিউডে আর কেউ করেছে বলে জানা যায়নি। ১৯৫১ সালে এই নাটকটি চলচ্চিত্রায়িত করার কাজ শুরু করেন এলিয়া কাজান, এবং তাতেও তাঁর অসাধারণ অভিনয়ের জোরে জীবনে প্রথমবার অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেন মার্লোন ব্র্যান্ডো। এর পরের তিন বছর তিনবার অস্কারে মনোনীত হয়ে খ্যাতির শিখরে পৌঁছন তিনি। ১৯৫২ সালে ‘ভিভা জাপাটা’, ১৯৫৩ সালে ‘জুলিয়াস সিজার’ এবং ১৯৫৪ সালে আবারও এলিয়া কাজানকে সঙ্গী করে ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’। এই শেষের ছবিটি প্রথমবারের জন্য তাঁকে এনে দেয় বহু প্রতিক্ষীত অস্কার। জুলিয়াস সিজার ছবিতে মার্ক অ্যান্টনির চরিত্রে মার্লোনের অভিনয় দেখে জন হাস্টন বলেছিলেন, “মনে হচ্ছিল একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে একটা গরম ফার্নেসের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে।” সহশিল্পী জন গিলগুড তাঁর নাটকের দলে যোগ দিতে সেই সময় মার্লোন ব্রান্ডোকে অনুরোধ করেন। ১৯৫১-১৯৫৪ সালের এই কয়েকটা বছর হলিউডের অভিনয় জগতে বিপ্লব এসে গিয়েছিল জেমস ডীন, পল নিউমান, স্টিভ ম্যাককুইন, ওয়ারেন বিটির মতো দিকপাল অভিনেতাদের হাত ধরে যারা প্রায় সকলেই মার্লোন ব্র্যান্ডোর দেখানো পথে নিজেদের তৈরি করেছেন। “আমরা সবাই ব্র্যান্ডো সন্তান-সন্ততি” বলেছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা জ্যাক নিকলসন, “উনিই আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন”। এই বিপুল জনপ্রিয়তা, বন্ধুদের থেকে দেবতাসুলভ ব্যবহার পাওয়া এসব মিলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করল তা মার্লোনের মাথা ঘুরিয়ে দিল।

প্রযোজক বা স্টুডিয়োগুলি ক্রমেই এড়িয়ে চলতে লাগলো তাঁকে, কারণ, তাঁর পারিশ্রমিক অত্যন্ত বেশী, তাঁর খামখেয়ালিপনার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে ছবির বাজেট বেড়ে যায়, কোনও প্রতিষ্ঠিত পরিচালক তাঁর সাথে কাজ করার আগে দশবার ভাবে, ডায়ালগ মুখস্থ করেননা বলে ছোট ছোট কার্ডে লাইনগুলি লিখে কামেরার পাশে বা সেটের বিভিন্ন কোণায় লুকিয়ে রাখতে হয় এবং সেদিকে তাকিয়ে ডায়ালগ বলেন মার্লোন, নির্দেশককে খেয়াল রাখতে হয় যাতে সেইসব কার্ডগুলি ছবির ফ্রেমে না চলে আসে। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত যে খ্যাতির শিখরে পৌঁছন মার্লোন, ১৯৫৭ সালের ‘সায়োনারা’ ছবির সাফল্যের পর তাঁর ঔজ্বল্য ক্রমশ ফিকে হতে শুরু করে। ১৯৬১ সালে তাঁর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা পেনিবেকার প্রোডাকশনসের ব্যানারে শুরু ‘ওয়ান আইড জ্যাকস’ ছবিটি। কিছুদিনের মধ্যেই মার্লোনের সাথে মনোমালিন্যের ফলে কাজ ছেড়ে দেন নির্দেশক স্ট্যানলি কুব্রিক। সদ্য মা কে হারিয়ে এবং বিবাহবিচ্ছেদের ঝড়ঝাপটার মধ্যেই নির্দেশনার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন মার্লোন এবং ছবিটি প্রযোজনার প্রতিটি স্তরে ধাক্কা খেতে থাকে। প্রচুর সমস্যা সামলে মুক্তি পেলেও ‘ওয়ান আইড জ্যাকস’ সাফল্য পায়নি, যার ফলে মার্লোনকেও আর নির্দেশক হিসেবে দেখা যায়নি।

১৯৬৭ সালে মার্লোন মুখিয়ে ছিলেন ‘এ কাউন্টেস ফ্রম হংকং’ ছবিতে প্রবাদ প্রতিম চার্লি চ্যাপলিনের নির্দেশনায় কাজ করার জন্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই অভিজ্ঞতাও মোটেই সুখকর হয়নি এবং ছবিটিও অসফল হয়। স্পটলাইটের আলোয় ফিরতে অপেক্ষা করতে হয় আরও ৫ বছর। ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা প্যারামাউন্টের জন্য মারিও পুযোর লেখা ‘ গডফাদার’ চিত্রায়িত করবেন ঠিক করেন এবং বয়স্ক ভিটো কোর্লিওনির চরিত্রে মার্লোন নির্বাচিত হন। এই চরিত্র যে শুধু তাঁকে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমরত্ব দিয়েছে তাই নয়, এনে দিয়েছে তাঁর দ্বিতীয় অস্কার পুরস্কার যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।বার্নার্দো বার্তোলুচ্চির ছবি ‘দ্য লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস’- এ অভিনয় করেন এই বছরেই তিনি। ছবিটি সফল হলেও তাঁর ম্যাজিক যে শেষ হয়ে আসছে বুঝতে পারছিলেন মার্লোন। সেই সময় তাঁর পারিশ্রমিক ছিল আকাশছোঁয়া, কিন্তু শরীরে অতিরিক্ত মেদ, কাজে মন না থাকা তাঁকে ক্রমশ দর্শকের থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৭৯ সালে ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার ‘অ্যাপোক্যালিপ্স নাও’ ছবিতে কর্নেল কার্টজের একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি, যা এখনও তাঁর অনুরাগীরা মনে রেখে দিয়েছেন। এরপরের বেশ কিছু বছর তাঁকে দেখা যায় কিছু ছবিতে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করতে কিন্তু সেই প্রবাদপ্রতিম মার্লোন ব্রান্ডোকে আর খুঁজে পাওয়া যায়না। ১৯৯৯ সালে বিখ্যাত পত্রিকা টাইম্‌স এর বিচারে মার্লোন ব্র্যান্ডো জায়গা করে নেন শতাব্দীর সেরা ১০০ জন মানুষের তালিকায়। এই তালিকায় তাঁর নাম ঘোষিত হয় ‘শতাব্দির সেরা অভিনেতা’ হিসেবে।

১ জুলাই ২০০৪ সালে এ ইউ সি এল এ মেডিক্যাল সেন্টারে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার কারণে মার্লোন ব্র্যান্ডোর মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন