ইতিহাস

চার্লি চ্যাপলিন

চার্লি চ্যাপলিন(charlie chaplin) একজন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র অভিনেতা, পরিচালক ও সুরকার যিনি বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মূকাভিনেতা ও কৌতুকাভিনেতা হিসেবে পরিচিত। চার্লি চ্যাপলিনকে আজও নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের অন্যতম মৌলিক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে মনে করা হয়। তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা, পরিচালনা, প্রযোজনা, এমনকি সংগীত পরিচালনাও করতেন। তাঁর অভিনীত এবং পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলি আজও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পায়।

চার্লি চ্যাপলিন নামে অধিক পরিচিত হলেও, তাঁর পুরো নাম চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র। ১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল দক্ষিণ লন্ডনের ওয়ালওর্থের ইস্ট স্ট্রিটে চার্লি চ্যাপলিনের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম চার্লস চ্যাপলিন সিনিয়র এবং মায়ের নাম হান্নাহ চ্যাপলিন। বাবা ছিলেন গীতি মঞ্চের জনপ্রিয় গায়ক। চার্লির জন্মের দু’বছরের মধ্যেই তাঁর বাবা মা আলাদা থাকতে শুরু করলে শিশু চার্লি মায়ের কাছেই থাকতে শুরু করেন। তাঁর বাবা তাঁদের কোনো রকম আর্থিক সাহায্য করতেন না। তাঁর মা কোনমতে সেবিকা হিসেবে আবার কখনও দর্জির কাজ করে সংসার চালাতেন। ফলে চার্লি চ্যাপলিনের শৈশব কাটে প্রচন্ড দারিদ্র্য আর কষ্টের মধ্যে। অত্যধিক দারিদ্র্যের কারণে চ্যাপলিনকে সাত বছর বয়সে ল্যামবেথ কর্মশালায় কাজের জন্য পাঠানো হয়।এই কর্মশালা থেকে তাঁকে  ‘সেন্ট্রাল লন্ডন ডিস্ট্রিক্ট’ স্কুলে পাঠানো হয়। এখান থেকে তাঁকে পরবর্তীকালে দুস্থ শিশুদের জন্য তৈরি ‘নরউড স্কুল’-এ পাঠানো হয়।

১৮৯৮ সাল নাগাদ চার্লির মা’কে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ।এই সময়ের মধ্যে চার্লি তাঁর বাবার কাছে থাকতেন। কিন্তু সেখানে তাঁর জীবন খুবই কষ্টে কাটে।এরপর চার্লির মা কিছুদিনের জন্য হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও পরে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। এদিকে বাবাও মারা যান কিছুদিন আগে। ফলে চোদ্দ বছরের চার্লিকে একাই জীবন যাপন করতে হয়। খাবারের খোঁজে তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় রাত কাটাতে হয়। আট মাস পর তাঁর মা মানসিক হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও ১৯০৫ সালের পর তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এবার্ পুরোপুরিভাবে ওখানেই রয়ে যান। চ্যাপলিন পরবর্তীকালে লিখেছিলেন “মায়ের করুণ ভাগ্যকে বরন করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার ছিল না”। ১৯২৮ সালে মায়ের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত চ্যাপলিন তাঁকে নিজের কাছে রেখেই সেবা যত্ন করেন।

মায়ের কাছ থেকেই চার্লি প্রথম অভিনয়ের জন্য উৎসাহ পান। পাঁচ বছর বয়সে মঞ্চে গান গাওয়ার মাধ্যমে চ্যাপলিনের মঞ্চে প্রবেশ ঘটে।মাত্র আট বছর বয়সে অভাবের তাড়নায় তিনি যুক্ত হন “দ্য এইট ল্যাঙ্কাশায়ার ল্যাডস ক্লগ ড্যান্সিং”(Eight Lancashire Lads clog-dancing) নামের একটি যাত্রা দলের সঙ্গে। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। এরপর একের পর এক  মঞ্চে অভিনয়ের জন্য তিনি প্রশংসিত হতেন। কিন্তু এই প্রশংসা তাঁর আর্থিক দুর্দশা তখনও পুরোপুরি ঘোঁচাতে পারেনি। ফলে হন্যে হয়ে তিনি কাজ খুঁজতে থাকেন এবং অভিনয়কেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাঁর বয়স যখন আঠারো তখন তিনি ‘ফ্রেড কার্ণো’র’ কোম্পানিতে যোগদান করেন। এটি ছিল তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তৎকালীন বৃটেনের এই স্বনামধন্য কোম্পানি কমেডি নাটক তৈরি করত এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে সেগুলো প্রদর্শনী করে বেড়াত। এই কোম্পানিতে যোগদান চ্যাপলিনের সামনে নিজেকে প্রমাণ করার ও বিশ্ববাসীর সামনে নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ এনে দেয়। ১৯১০ সালে তাঁকে মঞ্চনাটক প্রদর্শনীর জন্য আমেরিকায় পাঠানো হয়। দু’বছর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। এর কয়েক মাস বাদে আবার তাঁকে আমেরিকা যেতে হয়। এই সময় আমেরিকার একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান তাঁদের সঙ্গে কাজে করার জন্য আহ্বান জানান । “কিস্টোন স্টুডিও’তে কাজ করার জন্য চার্লি চুক্তিবদ্ধ হন অবশেষে।এখানেই তিনি চলচ্চিত্র তৈরির কৌশল রপ্ত করেন। ১৯১৪ সালে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘মেকিং এ লিভিং'(Making a Living) মুক্তি পায় যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন চ্যাপলিন নিজে। তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্রের জন্য তিনি এক বিশেষ ধরনের পোশাক নির্বাচন করে যা পরবর্তীকালে তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা ও বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দিয়েছিল। তাঁর বিখ্যাত পোশাকটি ছিল ঢিলেঢালা প্যান্ট, আঁটোসাঁটো কোট, ছোট মাথার টুপি, বড় জুতো ও একটি ছোট গোঁফ। এই বিশেষ চেহারাতেই তিনি চলচ্চিত্র জগতে এক মাইলস্টোন তৈরি করেন।

প্রথম দিকে তিনি অন্যান্য পরিচালকদের পরিচালনায় অভিনয় করলেও পরবর্তীকালে পরিচালনার ভার নিজে হাতে তুলে নেন। ১৯১৪ সালে চ্যাপলিনের চলচ্চিত্র পরিচালনায় হাতেখড়ি ঘটে ‘কট ইন দা রেইন'(Caught in the Rain) ছবিটির মাধ্যমে এবং এই ছবিটি ব্যাপক সফলতা লাভ করে। তাঁর জীবনের এই সময় তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বলে অনেকে মনে করেন কারণ এই সময়ে তিনি প্রচুর কাজ করেন এবং নিজের এক বিরাট ভক্তকূল তৈরি করেন। তাঁর অভিনীত ‘দ্য ট্র্যাম্প'(the Tramp) এক যুগান্তকারী সিনেমা। কাজের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত খুঁতখুঁতে ছিলেন। কাজের গুণগত মান ছিল তাঁর কাছে মুখ্য। তিনি একের পর এক বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং এক একটি অসাধারণ ছবি দর্শকদের উপহার দিয়ে গেছেন। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া ব্যাক্তিদের মধ্যে একজন হয়ে ওঠেন। এরপর ১৯১৯ সালে কয়েকজন অংশীদারকে সাথে নিয়ে তিনি ‘ইউনাইটেড আর্টিস্ট'(United Artists) নামে এক নিজস্ব চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি তাঁর বাকি ছবিগুলি তৈরি করেন।

তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হল- দ্য ট্রাম্প (The Tramp), দি ইমিগ্র্যান্ট (The Immigrant), দ্য কিড(The Kid), দ্য গোল্ড রাশ(The Gold Rush), সিটি লাইট্‌স(City Lights), মডার্ন টাইমস(Modern Times), দ্য গ্রেট ডিক্টেটর(The Great Dictator)ইত্যাদি। তিনি মূলত কৌতুক অভিনেতা হলেও তাঁর চলচ্চিত্রে হাসির আড়ালে ট্র্যাজেডি, রোমান্স ইত্যাদিও নিপুণভাবে মিশে থাকত। তাঁর ‘লাইম লাইট'(Limelight) ছবিটির উদ্বোধন তিনি লন্ডনে করতে চেয়েছিলেন যেহেতু এই ছবিটি ছিল তাঁর নিজের জীবনকে কেন্দ্র করে।লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হলে আমেরিকা তাঁর ফিরে আসার ভিসা বাতিল করে। অপমানিত এবং ক্রুদ্ধ চ্যাপলিন সিদ্ধান্ত নেন তিনি আমেরিকার সাথে আর কোন সম্পর্ক রাখবেন না। তিনি এরপর ইউরোপেই বাস করতে শুরু করেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চোদ্দ হেক্টর জমি জুড়ে বাড়ি বানিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।বর্তমানে বাড়িটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

চলচ্চিত্রে আকাশচুম্বী খ্যাতি ও সুনামের অধিকারী হলেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল নানা অশান্তিতে ভরা। তিনি তিনবার বিয়ে করেন কিন্তু প্রতিবারই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়।এই নিয়ে তিনি নানা আইনি ঝামেলাতে জড়িয়ে পড়েন যার প্রভাব তাঁর শিল্পীসত্তার ওপরেও পড়েছিল। এছাড়া নারীঘটিত নানা সম্পর্ক ও নানা বিতর্কে তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন বিভিন্ন সময়। অবশেষে ১৯৪৩ সালে উনা ও’নিলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় যা তাঁকে শেষ পর্যন্ত সুখী করেছিল। তাঁর এই বিবাহিত জীবন তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় ১৮ বছর স্থায়ী হয়েছিল।

সারা জীবনে তাঁর কাজের জন্য তিনি অজস্র পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। ১৯৬২সালের জুলাই মাসে অক্সফোর্ড ও ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ‘ডক্টর অব লেটার্স’ ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৬৪ সালে তাঁর আত্মজীবনী ‘মাই অটোবায়োগ্রাফি'(My Autobiography) বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক বিক্রিত বই হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে “লেজিওঁ দি অনর'( Légion d’Honneur ) উপাধিতে ভূষিত হন ।পরের বছর তিনি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব থেকে বিশেষ ‘গোল্ডেন লায়ন’ পুরস্কারে সম্মানিত হন। ১৯৭২ সালে ‘অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস’ চ্যাপলিনকে সাম্মানিক পুরস্কারে ভূষিত করে।এই পুরস্কার গ্রহণের জন্য প্রায় কুড়ি বছর পর তিনি আমেরিকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। এই পুরস্কার বিতরণী সভায় উপস্থিত দর্শক প্রায় বারো মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানান। অ্যাকাডেমি পুরস্কারের ইতিহাসে এখনও অবধি যে রেকর্ড অক্ষত। ১৯৭৫ সালে ‘রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ’ চ্যাপলিনকে ব্রিটিশ সম্মানসূচক ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

 ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর ভোর বেলায় ঘুমের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে সুইজারল্যান্ডে নিজ বাড়িতে ৮৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

লতা মঙ্গেশকর



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।