ইতিহাস

সফিউদ্দীন আহমেদ

বাংলাদেশের অন্যতম খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী হলেন সফিউদ্দীন আহমেদ (Safiuddin Ahmed)। তিনি শিল্পজগতে তাঁর অবদানের জন্য ‘শিল্পগুরু’ উপাধি পেয়েছেন। তাঁর শিল্প দেশের চৌহদ্দি পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে সমাদৃত হয়েছে।

১৯২২ সালের ২৩ জুন কলকাতা শহরের ভবানীপুরের নন্দন রোডে পৈতৃক বাড়িতে তাঁর জন্ম। তাঁর পুরো নাম শেখ সফিউদ্দীন আহমেদ । বাবার নাম শেখ মহিউদ্দিন এবং মায়ের নাম ছিল বিবি জমিলা খাতুন। তাঁর একমাত্র দিদি ছিলেন নূরজাহান বেগম। সফিউদ্দীনের বাবা ছিলেন ভূমি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার। স্বচ্ছল ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে বড় হয়ে উঠেছিলেন সফিউদ্দীন।

সফিউদ্দীন আহমেদ কলকাতার পদ্মপুকুর হাই স্কুলে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরবর্তীকালে ১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে তিনি কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। এই সময় তিনি কলকাতা ও শহরতলির বিভিন্ন ছবি আঁকা শুরু করেন। এমনকি কলকাতার বাইরের বিভিন্ন অঞ্চলের চিত্রও তাঁর ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। ১৯৩৬-৪১ সালে তিনি বিহারের বিভিন্ন অঞ্চল মধুপুর, দেওঘর, যসিডি, গিরিডি, চাইবাসা প্রভৃতি  ঘুরে বেড়ান। এরপর ১৯৪২, ১৯৪৪, ১৯৪৫ সালে সাঁওতাল পরগনার দুমকা অঞ্চলে তিনি চিত্র শিল্পের উপাদান খুঁজতে বেরোন। এই অঞ্চলের দৃশ্যপট এবং সাঁওতাল মানুষজন তাঁর ছবিতে উঠে এসেছে নিপুণ ভাবে।

১৯৪২ সালে সফিউদ্দীন আহমেদ আর্ট কলেজের স্নাতক কোর্স শেষ করেন ও ১৯৪৬ সালে প্রথম শ্রেণীতে শিক্ষকতার ডিগ্রী লাভ করেন। এই পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল প্রিন্টিং বিভাগের উড এনগ্রেভিং, লিথোগ্রাফি ও মুরাল পেইন্টিং। ১৯৪৭ সালের ১৪  আগস্ট তিনি ঢাকায় আসে এবং পরের দিন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে আঁকার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে ঢাকায় আর্ট স্কুল গড়ার আন্দোলনে তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সহযোগী হিসেবে আন্দোলনে যোগদান করেন। এই আন্দোলনের ফলে ঢাকায় ‘গর্ভমেন্ট ইনস্টিটিউট অফ আর্টস, ঢাকা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রিন্টিং বিভাগের লেকচারার ও প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৬৩ সালে এটি সরকারি আর্ট কলেজে রূপান্তরিত হয়। ১৯৫৬ সালে‌‌ তিনি প্রিন্টিংয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য লন্ডনে যান। সেখানে ‘সেন্ট্রাল স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস’ (Central School of Arts and Crafts) – এ ভর্তি হয়ে এচিং ও কপার এনগ্রেভিং – এর ওপর ১৯৫৮ সালে ডিস্টিংশনসহ ডিপ্লোমা অর্জন করেন। এই সময় তিনি লন্ডন, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, বেলজিয়াম, হল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ডের  বিভিন্ন মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন। ১৯৮৮ – ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি ‘ঢাকা সরকারি আর্ট কলেজে’র প্রিন্টিং বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত শিক্ষক হিসেবে এবং ১৯৯৪ – ২০০১ সাল পর্যন্ত পার্ট টাইম শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।

১৯৫২ সালের আগস্ট মাসে তিনি আঞ্জুমান আরাকে বিবাহ করেন। তাঁদের তিনটি সন্তান।সফিউদ্দীন আহমেদ ব্যক্তি মানুষ হিসেবে প্রচার বিমুখ এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুরাগী ছিলেন। তিনি ছিলেন উদারমনস্ক, নিরহংকার, বিনয়ী ও প্রখর‌ নীতিবোধসম্পন্ন। শিল্প ছিল তাঁর কাছে গভীর সাধনার বিষয়। 

‘জলের নিনাদ’ (১৯৮৫) তাঁর অন্যতম সার্থক শিল্পকর্ম। তিনি সেতার বাজাতে জানতেন। এমনকি খেলাধুলায়ও যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। শিল্পকর্মের জন্য তিনি প্রিন্টিংয়ের সবগুলো মাধ্যমকে একসঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর এই শিল্পকর্মের ধারণা এসেছিল অর্কেস্ট্রা থেকে। অর্কেস্ট্রার ক্ষেত্রে সুরের ওঠানামা এবং বিভিন্ন যন্ত্রের মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন ঘটে। ঠিক সেই ভাবনা নিয়ে তিনি প্রিন্টিংয়ের সবকটি মাধ্যমকে ব্যবহার করে এক অপরূপ শিল্পকর্ম তৈরি করেছিলেন।

কালো রংয়ের প্রতি তাঁর  দুর্বলতা ছিল। কালো রং-কে তিনি মনে করতেন ‘রংয়ের রাজা’। এই রঙের ওপর তিনি বহুদিন অনুশীলন করেছেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি তিন বছরেরও অধিক সময় নিরবিচ্ছিন্নভাবে কালো রঙের ব্যবহারে নানা চিত্র সৃষ্টি করেছিলেন। চিত্রে কালো রং এর বিভিন্ন ব্যবহার তুলে ধরেছেন তাঁর ‘ব্ল্যাক সিরিজ’ বা ‘কালো চিত্রমালা’য়।

প্রতিনিয়ত তিনি তাঁর শিল্পকর্মের ওপর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। তাঁর সৃজনশীলতার ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর চিত্রকলা। চোখের মোটিফ ব্যবহার করে সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ কিছু চিত্র। এক্ষেত্রে চোখ তাঁর ছবিতে বিশেষ প্রতীক হিসেবে উঠে আসে। এক মাধ্যমের বৈশিষ্ট্যকে  অন্য মাধ্যমে সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছেন সফিউদ্দীন । তাঁর বিখ্যাত শিল্পকর্ম গুলির মধ্যে রয়েছে ‘বিক্ষুব্ধ মাছ’ (১৯৬৪), ‘কান্না’ (১৯৮০), ‘একুশে স্মরণে’ (১৯৮৭) ‘একাত্তরের স্মৃতি’ (১৯৮৮) ‘একাত্তরের স্মরণে’ (২০০২) ‘শান্তিনিকেতনের দৃশ্যপট’ (১০৪৫), ইত্যাদি। জলরং,  তেলরং ও রেখাচিত্র ছাড়াও তিনি অন্যান্য যে সমস্ত মাধ্যমে কাজ করতেন সেগুলো – উড এনগ্রেভিং, ড্রাই পয়েন্ট,  লিথোগ্রাফি,  এচিং, কপার এনগ্রেভিং, আ্যকুয়াটিন্ট প্রভৃতি। তিনি দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও পাশ্চাত্য কলাকৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। উড এনগ্রেভিংয়ের মাধ্যমে তাঁর উল্লেখযোগ্য চিত্রগুলো হল ‘ঘরে ফেরা’ ‘সাঁওতাল মেয়ে’, ‘মেলার পথে’ ইত্যাদি।চিত্রগুলোর ব্যঞ্জনা, গভীরতা শিল্পীর সৃষ্টিকে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে।

১৯৪৫ সালে কলকাতার ‘অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ এর আয়োজিত সর্বভারতীয় বার্ষিক প্রদর্শনীতে ‘পারাবত’ (তেলরং) চিত্রটির জন্য তিনি আ্যকাডেমির ‘প্রেসিডেন্ট স্বর্ণ পদক’ পান। ১৯৪৬ সালে তিনি বিহারের পাটনা শিল্পকলা পরিষদের ‘বিহার হেরাল্ড স্বর্ণপদক’  লাভ করেন। ওই একই বছর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমকালীন চারুকলা প্রদর্শনীতে ‘সাঁওতাল মেয়ে’ (উড এনগ্রেভিং) চিত্রের জন্য পাশ্চাত্য ধারার ‘সাদাকালো’ বিভাগে প্রথম পুরস্কার পান। ১৯৪৭ সালে তিনি পাটনা শিল্পকলা পরিষদ আয়োজিত প্রদর্শনীতে ‘দ্বারভাঙ্গা মহারাজার স্বর্ণপদক’ এবং ‘শিল্পকলা পরিষদ স্বর্ণপদক’ লাভ করেন। এছাড়াও ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান সরকারের ‘প্রেসিডেন্ট স্বর্ণপদক’, ১৯৭৮ সালে ‘একুশে পদক’ ও ১৯৮৪ সালে ‘বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদের  সম্মাননা’ লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে বাংলা আ্যকাডেমির সম্মানসূচক ‘ফেলো’ মনোনীত হন। ১৯৯৬ সালে ‘স্বাধীনতা দিবস’ পুরস্কার পান। ওয়াশিংটন, বেলগ্রেড, জাপান, ঢাকার জাদুঘর ও শিল্প আ্যকাডেমিসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে তাঁর শিল্পকর্ম সংগৃহীত রয়েছে। তবে অধিকাংশ চিত্রকর্মই রয়েছে তাঁর পারিবারিক সংগ্রহে। তিনি বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। ঢাকায় তাঁর একক প্রদর্শনীও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

২০১২ সালে ২০ মে ঢাকার স্কোয়ার হাসপাতালে এই শিল্পীর মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।