ইতিহাস

বৈশালীর নগরবধূ আম্রপালী

বৈশালীর নগরবধূ আম্রপালী

আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে বৌদ্ধ জাতকের গল্পে পাওয়া যায় আম্রপালীর (Amrapali) নাম। বৈশালীর নগরবধূ আম্রপালী। অনেক জায়গায় তাঁকে ‘অম্বাপালী’ বা ‘অম্বাপালিকা’ নামেও বর্ণনা করা হয়েছে। যৌবনে যে আম্রপালী নগরবধূ হিসেবে বৈশালী নগরের সকল যুবকের কাম-পিপাসা মিটিয়েছেন, সেই আম্রপালীই একসময় জীবনমন্ত্র করে নেন বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি। প্রব্রজ্যা হিসেবে ভিক্ষুণীর বেশ ধারণ করেই বাকি জীবন অতিবাহিত করেছিলেন তিনি। আম্রপালীর রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সকল যুবক, তরুণই তাকে স্ত্রী হিসেবে পেতে চাইত আর গণরাজ্য বৈশালীতে এই নিয়ে ঘনিয়ে ওঠা সংঘাতের মীমাংসা হিসেবে কীভাবে আম্রপালী পরিণত হলেন নগরনটীতে, চলুন সেই ইতিহাস জেনে নেওয়া যাক।

ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে সর্বকালের সেরা নৃত্যশিল্পী হিসেবেই সুপরিচিত আম্রপালী। সভা-নটী হিসেবেই তাঁর খ্যাতি ছিল সুবিদিত। কিন্তু একদিন এই জীবন থেকে চিরতরে সরে এসে ব্রহ্মচর্যের কঠিন ব্রতে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন আম্রপালী। বৈশালীর বিখ্যাত নগরবধূ বা রাজকীয় গণিকা ছিলেন আম্রপালী। আনুমানিক ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভারতে অন্যতম বিখ্যাত মহাজনপদ ছিল বৈশালী। সেখানেই আম্রপালীর জন্ম হয়। তাঁর বাবা-মা, পরিবার কিংবা বাল্যজীবনের কোনও নথি পাওয়া যায়নি। মনে করা হয়, বৈশালীর রাজকীয় আমবাগানে একটি আমগাছের নিচে তাঁর জন্ম হয়েছিল বলে তাঁর এরূপ নামকরণ হয়েছে। ব্যুৎপত্তিগতভাবে ‘আম্র’ অর্থাৎ আম এবং ‘পল্লব’ অর্থাৎ ছোট কচি পাতা এই দুই শব্দ থেকেই তাঁর আম্রপালী নামটি সৃষ্টি হয়েছে। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে লেখা জাতকের গল্পে এই আম্রপালীর কাহিনি পাওয়া যায়। বাল্য বয়সেই আম্রপালীকে একদিন খুঁজে পান মহানমন নামের এক ব্যক্তি। তাঁর সৌন্দর্যে প্রলুব্ধ হয়ে মহানমন নিজের রাজ্যপাট ছেড়ে বৈশালীতেই আম্বারা নামে একটি ছোট গ্রামে থাকতে শুরু করেন। বৈশালী সেসময় লিচ্ছবি সাম্রাজ্যের একমাত্র রাজধানী ছিল। এই অঞ্চলের রীতি ছিল বৈশালীর সবথেকে সুন্দরী নারীরা কোনও একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির বদলে সকল পুরুষের ভোগ্যা হবেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর রূপ-লাবণ্যও বাড়তে থাকে। মাত্র ১১ বছর বয়সেই বৈশালীর সবথেকে সুন্দরী কন্যা হিসেবে তাঁকে ঘোষণা করা হয়। আম্রপালীকে পাওয়ার জন্য বহু রাজপুত্র, মন্ত্রী, যুবক ভিড় করত রোজ। বৈশালীর সেকালের রাজা মনুদেব তাঁর নাচ দেখে তাঁকে পাওয়ার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে ছিলেন এবং তাঁকে একপ্রকার অধিকার করতে চাইতেন। কিন্তু তখন পুষ্পকুমার নামে একজনকে ভালবাসতেন আম্রপালী, তিনি চেয়েছিলেন পুষ্পকুমারকেই বিবাহ করবেন। কিন্তু উদগ্র কামতাড়িত মনুদেব আম্রপালীর বিবাহের দিনই পুষ্পকুমারকে হত্যা করেন। সুন্দরী আম্রপালীকে অধিকারের জন্য যুবকদের মধ্যে যুদ্ধও বেধে যাচ্ছিল আর সেই যুদ্ধ-সংঘাত দমানোর জন্য গণরাজ্য বৈশালীতে স্থির হল আম্রপালী হবেন বহুভোগ্যা নগরনটী। তাঁকে বৈশালী জনপদের ‘কল্যাণী’র পদে অভিষিক্ত করা হয়। সাত বছর এই পদটি স্থায়ী হবে এমনটা বলা হয়েছিল এবং এই সময়ের মধ্যে আম্রপালী নিজে তাঁর উপযুক্ত প্রেমিককে নির্বাচন করার অধিকার পেয়েছিলেন। এমনকি কার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হবেন আম্রপালী, তাও নির্ধারণ করার অধিকার ছিল তাঁর। ক্রমে ক্রমে বৈশালীর দরবারী নর্তকী হয়ে ওঠেন আম্রপালী।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর সৌন্দর্য, রূপ-যৌবনের সংবাদ। একথা শোনেন মগধের রাজা বিম্বিসার। তড়িঘড়ি বৈশালীকে আক্রমণ করে বসেন তিনি। বিম্বিসার নিজেও একজন সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। ক্রমে আম্রপালী বিম্বিসারের প্রেমে পড়েন এবং আম্রপালী যখন তার আসল পরিচয় জানতে পারেন সেই সময় বিম্বিসারকে যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। প্রেমে মত্ত বিম্বিসার সেই মত যুদ্ধ বন্ধ করে দেন। পরবর্তীকালে আম্রপালী এবং বিম্বিসারের এক পুত্র সন্তান জন্ম নেয় বিমলা কোন্দনা নামে। জৈন ঐতিহ্য অনুসারে বিম্বিসার ও রানি চেল্লানার পুত্র ছিলেন অজাতশত্রু, আবার বৌদ্ধ উপকথা অনুসারে জানা যায় অজাতশত্রুর মায়ের নাম ছিল কোশলা। ভাইদের সঙ্গে বিবাদের কারণে অজাতশত্রু একবার বৈশালী আক্রমণ করেন। তিনিও আম্রপালীর রূপে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এদিকে আম্রপালীও অজাতশত্রুর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু বৈশালীর মানুষেরা আম্রপালী এবং অজাতশত্রুর প্রেম মেনে নিতে না পারায় আম্রপালীকে কারাবন্দী করে। তখন প্রেমোন্মত্ত অজাতশত্রু সমগ্র বৈশালী নগর জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। আম্রপালী ছাড়া সেই আগুনে বৈশালীর সকলেই মারা গিয়েছিল। কিন্তু মাতৃভূমির এই করুণ দশা দেখে আম্রপালী ঘৃণাভরে অজাতশত্রুকে ত্যাগ করেন।

বৌদ্ধ উপকথায় দেখা যায়, বুদ্ধের মৃত্যুর কিছু আগে বৈশালীতে তাঁর শেষ সফরের সময় তাঁকে খাবার পরিবেশনের সুযোগ পেয়েছিলেন বৈশালীর নগরবধূ আম্রপালী। কুশীনগর যাওয়ার পথে বৈশালীতে আম্রপালীর আমবাগানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন গৌতম বুদ্ধ। সঙ্ঘকে নিয়ে সেখানেই তাঁর আহারের বন্দোবস্ত করেছেন আম্রপালী। বাগান থেকে ফেরার পথে পুরুষেরা নানাভাবে তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করে। বুদ্ধকে খাবার পরিবেশনের কাজ থেকে বিরত থাকতে বললেও নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকেন আম্রপালী। এর পরদিনই বৈশালীর নগরবধূ আম্রপালী প্রব্রজ্যার ব্রত নিয়ে ভিক্ষুণীর জীবন শুরু করেন। তাঁর এই ভিক্ষুণী হওয়া নিয়েও একটি সুন্দর কাহিনি রয়েছে বৌদ্ধ জাতকে। সেখানে বলা হচ্ছে, গৌতম বুদ্ধের সঙ্ঘের এক তরুণ ভিক্ষুর প্রতি মোহাবিষ্ট হয়েছিলেন আম্রপালী এবং সেই ভিক্ষুটিকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করত আম্রপালী। বুদ্ধের কাছে সেই ভিক্ষু আবেদন করেন ৪ মাস আম্রপালীর গৃহে অধিষ্ঠান করবেন তিনি। বুদ্ধ সেই প্রস্তাবে রাজি হন। এই সংবাদে সঙ্ঘের অন্যান্য ভিক্ষুরা তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ৪ মাস পরে ভিক্ষু যখন সঙ্ঘে ফিরে আসেন, তখন তার সঙ্গে আসেন গেরুয়া বসন পরিহিতা প্রব্রজ্যাধারী আম্রপালী। পরে বুদ্ধের সঙ্ঘে যোগদান করতে চাইলে আম্রপালীকে গৌতম বুদ্ধ অনুমতি দেননি কারণ তাঁর মত ছিল সঙ্ঘে নারীর প্রবেশে ভিক্ষুদের ব্রহ্মচর্য নষ্ট হতে পারে। এর বিরোধিতা করেছিলেন আম্রপালী। ফলে একসময় বুদ্ধের অনুগত ভিক্ষুণী হন তিনি এবং ভিক্ষুণী সঙ্ঘের প্রধানও হন।

তাঁর জীবনকে কেন্দ্র করে বহু জীবনী-চিত্র মুক্তি পেয়েছে। ১৯৪৫, ১৯৫৯ এবং ১৯৬৬ সালে ‘আম্রপালী’ নামে তিনটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল। এর মধ্যে ১৯৫৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিতে আম্রপালীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন প্রখ্যাত বাঙালি অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবী এবং অজাতশত্রুর চরিত্রে অভিনয় করেন অসিতবরণ। অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের ছবিতে বৈজয়ন্তীমালা অভিনয় করেন আম্রপালীর ভূমিকায় আর সুনীল দত্তকে দেখা যায় অজাতশত্রুর চরিত্রে। ‘ওমেন অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি টেলিভিশন ধারাবাহিকে বিখ্যাত বলিউডের অভিনেত্রী হেমা মালিনীও আম্রপালীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ২০০২ সালে ডিডি ন্যাশনাল চ্যানেলে আম্রপালী নামে একটি টেলিভিশন ধারাবাহিকও সম্প্রচারিত হত। আম্রপালীকে নিয়ে হিন্দি ভাষায় বইও লেখা হয়েছে প্রচুর। আচার্য চতুর সেন ১৯৪৮ সালে তাঁর জীবন অবলম্বনে একটি উপন্যাস লেখেন ‘বৈশালী কি নগরবধূ’ নামে। আবার ১৯৬২ সালে ‘অম্বাপালী’ নামে একটি উপন্যাস লেখেন বিমল রায়না। বিখ্যাত সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যালের ‘আম্রপালী’ নামে একটি উপন্যাস আছে। সম্প্রতি ২০১২ সালে অনুরাগ আনন্দ ইংরেজিতে একটি উপন্যাস লেখেন ‘দ্য লেজেন্ড অফ আম্রপালী : অ্যান এনচ্যান্টিং সাগা বারিড উইদিন দ্য স্যান্ডস অফ টাইম’ নামে। নগরনটী থেকে ভিক্ষুণীর জীবনে এই রূপান্তরের জন্যেই আজও কাহিনিতে, উপকথায় স্মরণীয় বৈশালীর নগরবধূ আম্রপালী।       

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন