গৌতম বুদ্ধ

গৌতম বুদ্ধ

গৌতম বুদ্ধ (Gautam Buddha) পৃথিবীর এক অন্যতম মহান মনীষী যিনি বৌদ্ধধর্মের প্রচারক হিসেবেই বিখ্যাত। এই বৌদ্ধধর্ম পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় ধর্ম। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে তিনিই প্রকৃত ঈশ্বরের দূত। হিন্দুরা আবার গৌতম বুদ্ধকে বিষ্ণুর দশম অবতার বলে মনে করেন। কপিলাবস্তু নগরের রাজা শুদ্ধোধন ও রাণী মায়াদেবীর পুত্র সিদ্ধার্থই সন্ন্যাস গ্রহণ করে এবং দীর্ঘ তপস্যার পর বোধি লাভ করলে বুদ্ধদেব নামে অভিহিত হন। অধুনা বিহারের যে স্থানে তিনি বোধি প্রাপ্ত হয়েছিলেন সেই স্থানটি বুদ্ধগয়া এবং যে অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে সাধনা করেছিলেন গৌতম সেটি বোধিবৃক্ষ নামে পরিচিত। জগতের কষ্ট-দুঃখ দেখে এর থেকে মুক্তিলাভের উপায় খোঁজাই ছিল গৌতম বুদ্ধের সারা জীবনের সাধনা। তাঁর জন্মদিন বোধিলাভ এবং মৃত্যু একই পূর্ণিমা তিথিতে হওয়ার দরুন এই দিনটি বুদ্ধ পূর্ণিমা নামে পরিচিত।

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩ অব্দ মতান্তরে খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ অব্দে বৈশাখ মাসের পূর্ণিমার দিন বর্তমান নেপালের অন্তর্গত লুম্বিনীতে এক ক্ষত্রিয় রাজপরিবারে গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল শুদ্ধোধন এবং মায়ের নাম ছিল মায়াদেবী। শুদ্ধোধনের রাজধানী ছিল কপিলাবস্তু নগরে। গৌতম বুদ্ধের ছোটোবেলার নাম ছিল সিদ্ধার্থ। তাঁর জন্মের আগে রাণী মায়াদেবী স্বপ্ন দেখেছিলেন ছয়টি দাঁতবিশিষ্ট একটি বাচ্চা সাদা হাতি তাঁর শরীরের মধ্যে ঢুকছে। এই ঘটনার পরেই রাণী গর্ভবতী হন। রাজপরিবারের নিয়ম অনুসারে, মায়াদেবী কিছুদিন পর কপিলাবস্তু ছেড়ে নিজের বাড়ির দিকে যাত্রা করেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই লুম্বিনী নামে একটি জায়গায় একটি শাল গাছের নিচে সিদ্ধার্থের জন্ম হয়। জন্মের মাত্র সাতদিন পরেই তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। তারপর সিদ্ধার্থের মাসি গৌতমী তাঁকে লালন-পালন করেছিলেন আর এই কারণেই সিদ্ধার্থের আরেক নাম হয় ‘গৌতম’। জন্মের পরে পণ্ডিতেরা তাঁকে দেখে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, এই শিশু বড় হয়ে একজন মহাপুরুষ হবেন এবং সংসার ছেড়ে চলে যাবেন। এই কথা শুনে মহারাজ শুদ্ধোধন তাঁর ছেলেকে রাজকীয় বিলাস-ব্যসনের মধ্যে বড় করতে লাগলেন। কিন্তু সেই ভোগ-বিলাস সিদ্ধার্থকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে গোপা বা যশোধরা নামের এক সুন্দরী রাজকন্যার সঙ্গে সিদ্ধার্থের বিয়ে হয়। তাঁদের রাহুল নামে একটি পুত্রসন্তান জন্মায়। সংসারী হওয়ার পরও মানুষের জীবনের দুঃখ-কষ্ট, হতাশা, রোগ-শোক প্রভৃতির চিন্তা তাঁর মনকে আকুল করে তোলে।

কথিত আছে, একদিন রাজকুমার সিদ্ধার্থ রথে চেপে রাজপথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময় তিনি একটি বৃদ্ধ মানুষ, একজন রোগী এবং একটি মৃতদেহ দেখতে পান। তিনি তাঁর সারথি ছন্দককে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে ছন্দক বলে যে এগুলি সকল মানুষের নিয়তি। এরপর একই দিনে তিনি একজন সন্ন্যাসীকে দেখতে পান। তখন ছন্দক গৌতমকে জানায়। এই সন্ন্যাসী সংসার-ত্যাগ করেছেন দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। এই কথাগুলি শুনে সেই রাতেই সিদ্ধার্থ রাজকীয় ভোগ-বিলাস এবং নিজের স্ত্রী-সন্তানকে ছেড়ে সংসার ত্যাগ করে চলে যান। বৌদ্ধরা এই ঘটনাকে ‘মহাভিনিষ্ক্রমণ’ বলে অভিহিত করেন। অনামা নদীর কাছে এসে রাজবেশ ছেড়ে ফেলে গেরুয়া পোশাক পড়েন তিনি এবং নিজের চুল কেটে ফেলেন। প্রথমে তিনি আলার কালাম নামে এক সন্ন্যাসীর কাছে গিয়ে হিন্দু দর্শন শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেন, কিন্তু সেই সন্ন্যাসী তাঁর মনের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় সিদ্ধার্থ সেখান থেকে চলে যান। তারপর তিনি উদ্দক রামপুত্ত নামে অন্য একজন সন্ন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সাংখ্য ও যোগশিক্ষা করেন। কিন্তু এই সন্ন্যাসীও তার মনের সংশয় কাটাতে পারেন না। সেজন্য সিদ্ধার্থ রামপুত্তকে ছেড়ে বর্তমান বিহারের কাছে উরুবিল্ব নামে একটি জায়গায় চলে আসেন। সেখানে এসে সিদ্ধার্থ এবং আরো পাঁচজন সন্ন্যাসী কঠোর তপস্যা শুরু করেন। এই পাঁচজন সন্ন্যাসীর নাম ছিল কৌণ্ডিন্য, ভদ্রিক, অশ্বপতি, বাষ্প ও মহানাম। শরীরকে ভীষণ ভাবে কষ্ট দিলেই মুক্তিলাভ হয় এই বিশ্বাসে তাঁরা ছয়জন দীর্ঘ ছয় বছর ধরে অনশন ও কঠিন তপস্যা করেন। এর ফলে সিদ্ধার্থের শরীর কঙ্কালসার হয়ে পড়ে এবং তিনি ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েন। তখন সিদ্ধার্থ বুঝতে পারেন, শরীরকে কষ্ট দিয়ে মুক্তিলাভ করে যায় না। বৌদ্ধদের ধর্মশাস্ত্র অনুসারে, সিদ্ধার্থ বুঝতে পারেন যে অসংযত, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং কঠোর শারীরিক কষ্ট— এই দুই রাস্তার মাঝামাঝি কোনো পথ বা ‘মঝঝিম পন্থা’ অবলম্বন করেই ‘বুদ্ধত্ব’ বা জ্ঞানলাভ সম্ভব। তিনি তাই পুনরায় নিয়মমাফিক খাদ্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সুজাতা নামে স্থানীয় এক মহিলার কাছ থেকে এক বাটি পায়েস গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে বাকি পাঁচজন সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থকে ছেড়ে চলে যান। এই ঘটনার পর তিনি একটি অশ্বত্থ গাছের নিচে ধ্যানে বসেন এবং সিদ্ধিলাভ করে তবেই স্থানত্যাগ করার প্রতিজ্ঞা করেন। টানা ৪৯ দিন তপস্যা করার পর সিদ্ধার্থ ‘বুদ্ধত্ব’ লাভ করেন এবং তখন থেকেই তিনি ‘বুদ্ধদেব’ নামে খ্যাত হন। যে জায়গায় তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন সেই জায়গার বর্তমান নাম ‘বুদ্ধগয়া’ এবং সেই অশ্বত্থ গাছটি বর্তমানে ‘বোধিবৃক্ষ’ নামে পরিচিত। সিদ্ধিলাভ করার পর বুদ্ধদেব ঠিক করেন যে তিনি তাঁর গুরু আলার কালাম ও উদ্দক রামপুত্ত এবং তাঁকে ছেড়ে যাওয়া পাঁচজন সন্ন্যাসীকে জ্ঞান দান করবেন। কিন্তু ততদিনে আলার কালাম এবং উদ্দক রামপুত্তের মৃত্যু হয়েছে। তাই বুদ্ধদেব সবার আগে সেই পাঁচজন সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করে তাঁদের দীক্ষা দেন। এই ঘটনা বৌদ্ধশাস্ত্রে ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন’ নামে খ্যাত। এইভাবে এই পাঁচজন সন্ন্যাসীকে নিয়ে বিশ্বের প্রথম বৌদ্ধধর্মসংঘ গঠিত হয়। এরপর মহাকশ্যপ নামে এক অগ্নি-উপাসক ব্রাহ্মণ ও তার অনুগামীরা বৌদ্ধধর্মসংঘে যোগদান করেন। গৌতম বুদ্ধ সম্রাট বিম্বিসারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিমতো বুদ্ধত্ব লাভের পরে রাজগৃহ যাত্রা করলে সঞ্জয় বেলাঢ়্বিপুত্তের দুই শিষ্য সারিপুত্ত ও মৌদ্গল্যায়ন সংঘে আসেন। বুদ্ধত্ব লাভের এক বছর পরে শুদ্ধোধন তাঁর ছেলেকে কপিলাবস্তু শহরে আমন্ত্রণ জানান। একদিন গৌতম যে নগরের রাজপুত্র ছিলেন, সেখানেই তিনি সংঘের সঙ্গে ভিক্ষা করে খাদ্য সংগ্রহ করেন। কপিলাবস্তুতে তাঁর ছেলে রাহুলও গৌতমের কাছ থেকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন এবং শ্রমণ বা ভিক্ষুক হয়ে সংঘের অনুসারী হন। এছাড়াও আনন্দ ও অনুরুদ্ধ নামক তাঁর দুইজন আত্মীয় গৌতমের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মহাকশ্যপ, সারিপুত্ত, মৌদ্গল্যায়ন, আনন্দ, অনুরুদ্ধ ও রাহুল ছাড়াও উপলি, মহাকাত্যায়ন, পুণ্ণ ও সুভূতি প্রমুখ বুদ্ধের দশজন প্রধান শিষ্য ছিলেন।

এর বছর তিনেক পরে রোহিণী নদীর জলের অংশ নিয়ে শাক্য আর কোলীয়দের বিবাদ গৌতম বুদ্ধই মীমাংসা করেন। এর কয়েকদিনের মধ্যে মহারাজ শুদ্ধোধন মৃত্যুবরণ করলে গৌতম বুদ্ধের বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমী সংঘে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। গৌতম বুদ্ধ প্রথমে নারীদের সংঘে যোগদানের ব্যাপারে অমত প্রকাশ করলেও তাঁর শিষ্য আনন্দের উৎসাহে তিনি সংঘ গঠনের পাঁচ বছর পরে সংঘে নারীদের ভিক্ষুণী হিসেবে প্রবেশের অনুমতি দেন। এরপর দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে তিনি উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন স্থানে তাঁর ধর্মমত প্রচার করেন। মগধের রাজা বিম্বিসার ও অজাতশত্রু, কোশল-রাজ প্রসেনজিৎ ও তাঁর স্ত্রী মল্লিকা, পণ্ডিত সারিপুত্ত, ব্যবসায়ী অনাথপিণ্ডক, পতিতা আম্রপালি, নাপিত উপালি প্রমুখ বহু মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। গৌতম বুদ্ধ প্রচারিত বৌদ্ধধর্মের মূল নীতিগুলি হল – ‘চতুরার্য সত্য’, ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’, পঞ্চশীল নীতি। অষ্টাঙ্গিক মার্গ বলতে বোঝায় সৎ বাক্য, সৎ কার্য, সৎ জীবন, সৎ চিন্তা, সৎ চেষ্টা, সৎ চেতনা, সৎ সংকল্প এবং সম্যক সমাধি। আবার পঞ্চশীল নীতিগুলি হল অহিংসা, চুরি না করা, ব্যভিচারী না হওয়া, মিথ্যা না বলা এবং মাদক দ্রব্য সেবন না করা। গৌতম বুদ্ধের বাণীগুলি লিপিবদ্ধ আছে পালি ভাষায় রচিত ‘ত্রিপিটক’ নামের গ্রন্থে। এই গ্রন্থের তিনটি ভাগ হল ‘বিনয় পিটক’, ‘সূত্ত পিটক’ ও ‘অভিধর্ম পিটক’।

গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর ঘটনাকে বৌদ্ধশাস্ত্রে ‘মহাপরিনির্বাণ’ নামে অভিহিত করা হয়। ‘মহাপরিনিব্বাণ সুত্ত’ অনুসারে গৌতম বুদ্ধের বয়স যখন আশি বছর, তখন তিনি তাঁর আসন্ন মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেন। পওয়া নামক একটি জায়গায় থাকার  সময় চণ্ড নামে এক কামার তাঁকে ভাত ও শূকরমদ্দভ (শূকরের নরম মাংস) ইত্যাদি খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। এই খাবার খাওয়ার পরে গৌতম আমাশয় রোগে আক্রান্ত হন। বুদ্ধদেব তাঁর শিষ্য আনন্দকে নির্দেশ দেন যে, আনন্দ যেন চণ্ডকে বোঝান যে তার দেওয়া খাবার কোনোভাবেই বুদ্ধের মৃত্যুর কারণ নয়। এরপর আনন্দের আপত্তি সত্ত্বেও অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় তিনি কুশীনগর যাত্রা করেন। কুশীনগরে পৌঁছে তিনি আনন্দকে নির্দেশ দেন যাতে দুইটি শাল গাছের মধ্যের একটি জমিতে একটি কাপড় বিছিয়ে তাঁকে যেন শুইয়ে দেওয়া হয়। সেই জায়গায় শুয়ে বুদ্ধদেব সেখানে উপস্থিত  ভিক্ষু ও সাধারণ মানুষকে তার শেষ উপদেশ প্রদান করেন। তার অন্তিম বাণী ছিল – ‘জাগতিক বস্তুর বিনাশ আছে। অধ্যবসায়ের সাথে আপনার মুক্তির জন্য সংগ্রাম কর।’ বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন, রাজকুমার সিদ্ধার্থ রূপে জন্ম নেওয়ার আগেও বহুবার বিভিন্ন রূপে বুদ্ধদেবের জন্ম হয়েছে। বুদ্ধদেব বা ‘বোধিসত্ত্ব’-এর এই পূর্বজন্মের কাহিনীগুলি ‘জাতকের কাহিনী’ নামে পরিচিত।

গৌতম বুদ্ধের জন্মতিথি অর্থাৎ বৈশাখ মাসের পূর্ণিমার দিনটি বৌদ্ধদের একটি পবিত্র দিন হিসেবে পালিত হয়। এই দিনটিকে বলা হয় ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’। এই দিনটিতে স্নান করে নতুন পোশাক পরে মন্দিরে বুদ্ধের পূজা করেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা। ভক্তরা মন্দিরে মন্দিরে প্রদীপ জ্বালিয়ে, মন্দির সুসজ্জিত করে বুদ্ধের আরাধনায় নিমগ্ন হন। পাশাপাশি পঞ্চশীল, অষ্টশীল, সূত্রপাঠ, সূত্রশ্রবণ, সমবেত প্রার্থনার মতো ধর্মীয় আচার পালন করে থাকেন ভক্তরা। ভারতের নানান জায়গায় বুদ্ধদেবের মন্দির আছে। তেমনই কয়েকটি বিখ্যাত মন্দির হল- বুদ্ধগয়ার মহাবোধি মন্দির, কুশীনগরের ওয়াট থাই মন্দির ও মহাপরিনির্বাণ মন্দির, বারাণসীর সারনাথ মন্দির, অরুণাচল প্রদেশের গোল্ডেন প্যাগোডা ইত্যাদি।

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৩ অব্দ মতান্তরে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দে ৮০ বছর বয়সে গৌতম বুদ্ধের মৃত্যু হয়।

2 comments

আপনার মতামত জানান