সববাংলায়

তানসেন

ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের এক ঐতিহাসিক কিংবদন্তী ছিলেন তানসেন (Tansen)। মোগল সম্রাট আকবরের দরবারে তিনি অন্যতম দরবারি সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। আকবর তাঁর নবরত্ন সভার অন্যতম সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তানসেনকে এবং তাঁকে মিয়াঁ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। একাধারে সুরকার, গীতিকার এবং কণ্ঠশিল্পী ছিলেন তানসেন। হিন্দুস্তানি ঘরানার অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী তিনি। ষোড়শ শতকের ভারতে সঙ্গীতের ধারার এক নতুন দিশা দেখাতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি। কথিত আছে, মেঘমল্লার রাগে গান গেয়ে তানসেন নাকি আকাশ থেকে বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারতেন। এমনই নানাবিধ কিংবদন্তী, জনশ্রুতি ছড়িয়ে রয়েছে তাঁকে ঘিরে।

আনুমানিক ১৫০০ সালে অধুনা মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রে এক হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে তানসেনের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম ছিল সম্ভবত রামতনু পাণ্ডে। তাঁর বাবা মুকুন্দ পাণ্ডে (মতান্তরে মুকুন্দ মিশ্র) অত্যন্ত স্বচ্ছল এবং বিত্তবান কবি ছিলেন। শোনা যায় মুকুন্দ পাণ্ডে এবং তাঁর স্ত্রীর অনেক সন্তান জন্মের সময়েই মারা যাওয়ায় তাঁরা এর প্রতিকার খুঁজতে গোয়ালিয়রের এক সিদ্ধপুরুষ মহম্মদ গাউসের দ্বারস্থ হন। তাঁর দেওয়া তাবিজ এবং মন্ত্রের মাধ্যমে আশ্চর্যভাবে কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের ঘরে জন্ম হয় তানসেনের। ছোটবেলায় তানসেন নানারকম পশু-পাখির ডাক নকল করতে পারতেন নিখুঁতভাবে। অনেক বলেন, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া বহু পুরোহিত এবং সাধারণ পথচারীকে ভয় দেখানোর জন্য তিনি নাকি মাঝেমধ্যেই বাঘের ডাক নকল করে শোনাতেন। একদিন নাকি এরকমভাবেই বাঘের ডাক নকল করার সময় স্বামী হরিদাস তানসেনকে লক্ষ্য করেন। হরিদাস ছিলেন সেই সময়কার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, সঙ্গীতশিল্পী এবং সন্ত। তানসেনের দক্ষতা লক্ষ্য করে হরিদাস তাঁকে নিজের শিষ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেন। অনেকে বলেন, হুসেইনি নামের এক মহিলাকে বিবাহ করেছিলেন তানসেন। তবে এই তথ্যের কোনও পাথুরে প্রমাণ মেলেনি। আবার অন্য মতানুসারে, আকবরের কন্যা মেহেরুন্নিসা নাকি তানসেনের প্রেমে পড়েছিলেন এবং সেই কারণেই নাকি তানসেনকে নিজের দরবারে নিযুক্ত করেছিলেন আকবর। আবার এও বলা হয় যে, আকবরের কন্যা মেহেরুন্নিসাকে বিবাহ করার পরের দিনই তানসেন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।  

স্বামী হরিদাসের শিষ্য হিসেবেই তানসেনের সঙ্গীতশিক্ষা শুরু হয়। তারপর দীর্ঘ ১০ বছর ধরে স্বামী হরিদাসের কাছেই সঙ্গীতচর্চা করেন তিনি। হরিদাস নিজেই একজন বিখ্যাত ধ্রুপদ শিল্পী ছিলেন, ফলে তাঁর প্রভাবে তানসেনও ধ্রুপদের প্রতি আকৃষ্ট হন। বলা হয় যে গুরু হরিদাসের কাছে সঙ্গীতশিক্ষা সম্পন্ন করার পরে সেকালের ভারতে তানসেনের সমকক্ষ সঙ্গীতজ্ঞ আর কেউ ছিলেন না। এমনকি গুরু হরিদাসের থেকেও অসাধারণ ধ্রুপদ গাইতেন তিনি। গুরুর কাছ থেকে এবার তিনি নিজের গ্রাম বিহাটে ফিরে আসেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বাবার মৃত্যু হলে অত্যন্ত হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন তানসেন। ক্রমে বাহ্য জগত থেকে তিনি সরে আসতে থাকেন। শিবের মন্দিরে গান গেয়ে গেয়েই সেই সময় দিন কাটাতেন তিনি। ইতিমধ্যে সুফি সন্ত মহম্মদ গাউস তাঁর জীবনকে এক অন্য দিশায় চালিত করেন। অনেকে বলে থাকে মহম্মদ গাউসের কাছেও কিছুদিন গান শিখেছিলেন তানসেন। যদিও এই মন্তব্য নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তবে মহম্মদ গাউস তানসেনকে সুফি ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলেছিলেন। পরবর্তী জীবনে তানসেন সুফি ধর্মেরই একজন অন্যতম পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন।

রেওয়া রাজ্যের রাজা রামচাঁদের দরবারে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তানসেন। তাঁর সাঙ্গীতিক দক্ষতা এত দিগন্তবিস্তারি ছিল যে তা আশেপাশের রাজ্যগুলিতে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। শীঘ্রই আকবর তানসেনের সম্পর্কে জানতে পারেন এবং তাঁর প্রতিভার কথা শুনে নিজের দরবারে তাঁকে নিযুক্ত করেন। ক্রমে ক্রমে তানসেনই আকবরের অন্যতম প্রিয় সঙ্গীতশিল্পী হয়ে ওঠেন। ফলে আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন হয়ে ওঠেন তানসেন। বলা হয় যে, আকবরের দরবারে প্রথমবার সঙ্গীত পরিবেশনের পরে আকবর তাঁকে এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিয়েছিলেন। এটাও বলা হয় যে, অন্যান্য সঙ্গীতশিল্পীরা তানসেনের প্রতি ঈর্ষান্বিত হতেন কারণ আকবর তাঁকে অত্যন্ত বেশিই পছন্দ করতেন। আকবর তাঁকে মিয়াঁ উপাধিতেও সম্মানিত করেছিলেন। তারপর থেকেই তিনি মিয়াঁ তানসেন নামেই পরিচিত হন সকলের কাছে।

জনশ্রুতি আছে যে, কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী তানসেন সঙ্গীতের সাহায্যে বহু আশ্চর্য ঘটনা ঘটাতেন। একবার আকবরের অন্যান্য মন্ত্রীরা ঠিক করেন তানসেনকে অপমান করবেন। ফলে আকবরের সভায় গিয়ে তাঁরা সকলে মিলে তানসেনকে দীপক রাগ গাইতে বলেন। বিশ্বাস করা হত এই দীপক রাগ গাইলে নাকি আগুন জ্বলে ওঠে। আকবরও এই আশ্চর্য ঘটনা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলেন। তিনি তাঁর চাকর-বাকরদের বলেন যে দরবারে বেশ কিছু বাতি এনে বসাতে এবং তানসেনকে গান গেয়ে সেই বাতিগুলি প্রজ্জ্বলিত করতে বলেন আকবর। তানসেন দীপক রাগ গেয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সত্য সত্যই নাকি সেই সব বাতিগুলিতে অগ্নিশিখা জ্বলে উঠেছিল। আবার মেঘমল্লার রাগ গেয়ে আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরিয়েছিলেন তানসেন, এমনও শোনা যায়। দীপক রাগ গাওয়ার পরেই তানসেন মেঘমল্লার গাইতেন যাতে সমস্ত পরিবেশ আগুনের উত্তাপ থেকে পুনরায় শীতল হতে পারে। যদিও সময়ের বিবর্তনের দীপক রাগটি লুপ্তই হয়ে গিয়েছে। তানসেন পশু-পাখিদের সঙ্গেও সঙ্গীতের সাহায্যে সংযোগস্থাপন করতে পারতেন। একবার আকবরের রাজসভায় নাকি একটি মত্ত হাতিকে নিয়ে আসা হয়েছিল। কেউই তাকে পোষ মানাতে পারছিল না। সকলেই তানসেনের সাঙ্গীতিক জাদুর উপর আস্থা রেখেছিলেন। তানসেন সেই সময় শুধু যে হাতিটিকে শান্ত করলেন তাই নয়, আকবরকে তাঁর পিঠে চাপতেও উৎসাহিত করেন এবং আকবরও সফলভাবে হাতির পিঠে চড়তে পারেন।

তানসেনের বেশিরভাগ সুর-সংযোজনের মূল ভিত্তি ছিল হিন্দু পুরাণ। ধ্রুপদ ঘরানার সঙ্গীতের সাহায্যে প্রায়ই তিনি শিব, বিষ্ণু ও গণেশের উপাসনা করতেন। তাঁর নিজের গ্রামের একটি শিব মন্দিরেই তিনি নিজের তৈরি করা সমস্ত ধরনের সুরে গান গাইতেন। তানসেনের সুরগুলি অত্যন্ত জটিল ছিল প্রকৃতিগতভাবে এবং সাধারণ যন্ত্রশিল্পীদের পক্ষে তা বোঝা সহজসাধ্য ছিল না। পরবর্তী জীবনে আকবর এবং তাঁর সভাসদদের স্তুতিমূলক সঙ্গীত রচনা করতেন তানসেন। ভৈরব, দরবারি তোড়ি, দরবারি কানাড়া, মল্লার, সারং এবং রাগেশ্বরী ইত্যাদি বহু রাগের জন্ম দিয়েছেন তানসেন। তানসেনকে হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী সঙ্গীত ঘরানার জনক বলা হয়। একথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমান ভারতে প্রচলিত সব রকম সঙ্গীত ঘরানার উৎসমূলেই তানসেনের অবদান রয়েছে। এও বলা হয় যে, ধ্রুপদী রাগগুলিকে সহজবোধ্য করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন তানসেন।

তানসেনের স্মরণে প্রতি বছর গোয়ালিয়রে সঙ্গীতের এক বিশাল সম্মেলন আয়োজিত হয় ‘তানসেন সমারোহ’ নামে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতিতে শ্রেষ্ঠ হিন্দুস্তানি ধ্রুপদ সঙ্গীতের শিল্পীদের ‘তানসেন সম্মান’ প্রদান করা হয়। তাঁর জীবন অবলম্বনে বহু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ‘তানসেন’ (১৯৪৩), ‘সঙ্গীত সম্রাট তানসেন’ (১৯৬২), ‘বৈজু বাওরা’ (১৯৫২) ইত্যাদি চলচ্চিত্রগুলি এর মধ্যে অত্যন্ত বিখ্যাত। ‘রাগমালা’ ও ‘সঙ্গীতসার’ নামে তানসেন দুটি বইও লিখেছিলেন বলে জানা যায়।  

১৫৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল তানসেনের মৃত্যু হয়। অনেকে বলেন দীপক রাগে গান গাইবার সময় আগুনে ভস্মীভূত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর সুফি গুরু মহম্মদ গাউসের সমাধির পাশেই তানসেনের মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হয়েছিল।   


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading