যুদ্ধের সময় বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপনাস্ত্র বা মিসাইলের ব্যবহার হয় আর যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন দেশ সারা বছরই মিসাইলের পরীক্ষা চালিয়ে যায়। যুদ্ধ হোক বা মিসাইলের পরীক্ষা – এইসব মিসাইল নিয়ে চর্চাও হয় খুব। মিসাইল হয়ও বিভিন্ন ধরনের যেমন ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল ইত্যাদি। আমরা এখানে ব্যালিস্টিক মিসাইল (Ballistic Missile) নিয়ে আলোচনা করব। ভারতের পৃথ্বী বা অগ্নি সিরিজের ক্ষেপনাস্ত্রগুলি ব্যালিস্টিক মিসাইল। এই ব্যালিস্টিক মিসাইল কাজ করে কীভাবে তাই হল আমাদের আলোচ্য বিষয়।
ব্যালিস্টিক মিসাইল এমন এক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র যা প্রথমে রকেট ইঞ্জিনের সাহায্যে উচ্চতা ও গতি অর্জন করে এবং পরে অভিকর্ষজ বলের অধীনে নির্ধারিত লক্ষ্যে গিয়ে আঘাত করে। এই সমগ্র যাত্রাপথে এটি প্রজেক্টাইল মোশন ব্যবহার করে। এই ধরনের ক্ষেপনাস্ত্রগুলি স্বল্প দূরত্ব থেকে বহুদূরের লক্ষ্যে আঘাত করতে সক্ষম, এর পাল্লা এতই বেশি হওয়া সম্ভব যে ক্ষেত্র বিশেষে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশেও আঘাত করতে পারে। এগুলি পারমাণবিক, জৈব-রাসায়নিক অথবা প্রচলিত অস্ত্রবাহী হতে পারে এবং বর্তমান সময়ে সামরিক ক্ষেত্রে এগুলোর তাৎপর্য অপরিসীম।
ব্যালিস্টিক মিসাইলের কার্যপ্রণালী খুবই জটিল, তবে এখানে সহজভাবে ব্যালিস্টিক মিসাইল কাজ করে কীভাবে তার ব্যাখ্যা করা হল। এই ক্ষেপনাস্ত্রগুলির নিক্ষেপ করলে প্রধানত তিনটি পর্যায় থাকে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে কার্যপ্রণালী বিভিন্ন হয়।
১. বুস্ট ফেজ (Boost Phase) বা উৎক্ষেপণ পর্যায়
এটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এই পর্যায়ে, ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তিশালী রকেট ইঞ্জিন চালু হয় এবং এটি প্রচুর ধাক্কা (thrust) তৈরি করে। এই ধাক্কার ফলেই ক্ষেপণাস্ত্র ভূমি থেকে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে। এই পর্যায়টি ১-৫ মিনিট স্থায়ী হয়।
- ইঞ্জিন চালু: ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি (প্রপেলান্ট) ইঞ্জিনে পুড়ে প্রচণ্ড উত্তপ্ত গ্যাস তৈরি করে। এই গ্যাস একটি ফানেলের মাধ্যমে দ্রুত বেগে বাইরে বেরিয়ে আসে, যা নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র অনুসারে ক্ষেপণাস্ত্রকে বিপরীত দিকে ঠেলে দেয়।
- গতি ও উচ্চতা অর্জন: এই ধাপে ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত গতি অর্জন করে এবং বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে, এমনকি মহাকাশে প্রবেশ করতে শুরু করে। দীর্ঘ পাল্লার মিসাইল (যেমন ICBM) এই পর্যায়ে বায়ুমণ্ডলের বাইরে চলে যায়। এই সময়কাল কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে। এই গতি ও উচ্চতার জন্য নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্রের ব্যবহারিক প্রয়োগ করা হয়। মিসাইলের ওজন ও প্রযোজ্য বলের উপর ভিত্তি করে তার ত্বরণ নির্ধারিত হয়। রকেট ইঞ্জিন যত বেশি শক্তি উৎপন্ন করে, তত বেশি গতি মিসাইল অর্জন করে।
- গতিপথ নির্ধারণ: বুস্ট ফেজ চলাকালীন ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ নির্দিষ্ট করা হয় এবং একবার নির্ধারিত হয়ে গেলে সাধারণত এটি আর পরিবর্তন করা যায় না। প্রোজেক্টাইল মোশনের সূত্র মেনে সাধারণত গতিপথ নির্ধারিত হয়। বুস্ট ফেজের শেষে ইঞ্জিনটি বন্ধ হয়ে যায়।
২. মিডকোর্স ফেজ (Midcourse Phase) বা মধ্যবর্তী পর্যায়
এই পর্যায়টি ক্ষেপণাস্ত্রের যাত্রাপথের দীর্ঘতম অংশ। বুস্ট ফেজ শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, ক্ষেপণাস্ত্র আর নতুন করে কোনও ধাক্কা তৈরি করে না।
লক্ষ্যের দিকে ধাবমান: এই পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্রের ভিতরের কম্পিউটার সিস্টেম পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুর দিকে এর গতিপথ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
মাধ্যাকর্ষণ ও জড়তা: এই ধাপে ক্ষেপণাস্ত্র তার অর্জিত গতিবেগের কারণে অনেকটা কৃত্রিম উপগ্রহের মতো মহাকাশের মধ্য দিয়ে বা বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর নতুন কোন থ্রাস্ট না থাকায় এই সময়ে ক্ষেপণাস্ত্রের উপর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব কাজ করতে শুরু করে, যা এটিকে ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে টানতে থাকে।
সর্বোচ্চ উচ্চতা: এই ধাপেই ক্ষেপণাস্ত্র তার সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছায়। কিছু দীর্ঘ পাল্লার মিসাইল হাজার হাজার কিলোমিটার মহাকাশে পাড়ি দিতে পারে।

৩. টার্মিনাল ফেজ (Terminal Phase)
এই পর্যায়ে ওয়ারহেড বা মূল বোমাটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এবং তার লক্ষ্যবস্তুর দিকে আঘাত করবার জন্য নেমে আসে।
- বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ: ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি নির্দিষ্ট কোণে (সাধারণত ২২ থেকে ৪৫ ডিগ্রী) বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। ভুল কোণে প্রবেশ করলে এটি বায়ুমণ্ডলেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
- গতি বৃদ্ধি: বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে ক্ষেপণাস্ত্রের গতি আরও বেড়ে যায়, যা একে প্রচণ্ড গতিতে (Mach ২০ বা তারও বেশি) লক্ষ্যবস্তুর দিকে নিয়ে যায়।
- লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত: সবশেষে, ক্ষেপণাস্ত্র তার পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে ও বিস্ফোরণ ঘটে। ব্যালিস্টিক মিসাইল সাধারণত শেষ মুহূর্তে তার লক্ষ্য পরিবর্তন করতে পারে না; নিক্ষেপের সময়ই এর লক্ষ্য ও গতিপথ ঠিক করে দেওয়া হয়।
জাইরোস্কোপ ও এক্সিলারোমিটার ব্যবহার করে অবস্থান ও গতি নির্ণয় করে যা ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম (Inertial Navigation System) নামে পরিচিত। তবে আধুনিক ব্যালিস্টিক মিসাইলে GPS বা উপগ্রহ নির্ভর নির্দেশনা ব্যবহৃত হয়। অনেক মিসাইলে MIRV (Multiple Independently-targetable Reentry Vehicle) থাকে, যা একাধিক লক্ষ্যে একসঙ্গে আঘাত হানতে পারে।
ক্ষেপনাস্ত্রের উপর গবেষণা নিয়মিত হয়ে চলেছে এবং প্রতিনিয়ত এর উন্নতি হয়ে চলেছে। এখানে খুব সহজভাবে ব্যালিস্টিক মিসাইল কাজ করে কীভাবে তাই ব্যাখ্যা করা হল। ক্রুজ মিসাইল কাজ করে কীভাবে জানতে এখানে দেখুন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান