হিরোসিমা আর নাগাসাকির পরমাণু বিস্ফোরণের ঘটনা আজও ইতিহাস ভোলেনি। বলা হয় সেই বিস্ফোরণের সময় নিউক্লীয় বিভাজন বিক্রিয়ার সাহায্যে তৈরি সেই ‘লিটল বয়’ আর ‘ফ্যাট বয়’ নামের দুটি পরমাণু বোমা এক বিধ্বংসী প্রভাব বিস্তার করে যার ফলে দুটি শহরই একেবারে ছত্রখান হয়ে যায়। এর ফলে বোমার তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে বংশ পরম্পরায় বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়েছে জাপানের সেই দুটি শহরে। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, কী এই তেজস্ক্রিয়তা? পরমাণু বিস্ফোরণের সঙ্গেই বা এর সম্পর্ক কী? তাহলে চলুন আর দেরি না করে জেনে নিই তেজস্ক্রিয়তা বা রেডিও অ্যাক্টিভিটি (Radio-activity) সম্পর্কে।
সহজভাবে বললে প্রকৃতিতে এমন কিছু কিছু মৌল আছে যাদের পরমাণুর ভর অত্যন্ত বেশি, সেই সব মৌলের নিউক্লিয়াসকে উচ্চগতির নিউট্রন দিয়ে আঘাত করলে তা থেকে এক বিশেষ ধরনের অদৃশ্য রশ্মি নির্গত হয় এবং তার ফলে ধীরে ধীরে সেই মৌলের পারমাণবিক ভর বদলে গিয়ে তা একটি নতুন মৌলে পরিণত হয়। তবে সবক্ষেত্রে যে নিউট্রনের আঘাতেই অদৃশ্য রশ্মি বিকিরণ হয় তা নয়, স্বাভাবিক ও স্বতস্ফূর্তভাবেও কিছু কিছু মৌল থেকে সেইরকম রশ্মি নির্গত হয়ে থাকে, তাদের আবার প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় মৌল বলা হয়। বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা হিসেবে বলতে হয়, যে নিউক্লীয় ঘটনায় উচ্চ পারমাণবিক সংখ্যা বিশিষ্ট মৌলের নিউক্লিয়াস থেকে সর্বদা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিশেষ প্রকার অদৃশ্য রশ্মি বিকিরিত হয় এবং চাপ, তাপ, আলো, তড়িৎক্ষেত্র, চৌম্বকক্ষেত্র বা মৌলের রাসায়নিক বন্ধন কোনও বাহ্যিক উদ্দীপকের দ্বারাই এই বিকিরণ প্রভাবিত হয় না। মৌলের এই ধর্মকেই বলা হয় তেজস্ক্রিয়তা। যে সব পদার্থ বা মৌল থেকে এই ধরনের রশ্মি বিকিরিত হয়, তাদের তেজস্ক্রিয় পদার্থ বা তেজস্ক্রিয় মৌল (Radio-active Element) বলা হয়। যেমন – ইউরেনিয়াম (U), থোরিয়াম (Th), পোলোনিয়াম (Po), রেডিয়াম (Ra) ইত্যাদি মৌলগুলিকে তেজস্ক্রিয় মৌল বলা হয়।
তেজস্ক্রিয়তার আবিষ্কারক হিসেবে বিজ্ঞানী হেনরি বেকারেলের নামই সর্বাগ্রে উল্লেখ করা হয়। ১৮৯৬ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী বেকারেল লক্ষ করেন যে ইউরেনিয়ামের একটি লবণ পটাশিয়াম ইউরেনিল সালফেট প্রতিপ্রভ বস্তু (Fluroscent Substance) হওয়ার কারণে তা অন্ধকারেও ফটোগ্রাফিক প্লেটের উপর কাজ করে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি বুঝতে পারেন যে এই পদার্থ থেকে একপ্রকার অদৃশ্য কণা বা রশ্মি নির্গত হয় যা কোনওভাবে বন্ধ করা যায় না। প্রাথমিকভাবে এই রশ্মির নাম তিনি দিয়েছিলেন বেকারেল রশ্মি। পরে মাদাম কুরি ও পিয়ের কুরি এই তেজস্ক্রিয়তা সম্পর্কে বিশদে গবেষণার সময় এই রশ্মিকে তেজস্ক্রিয় রশ্মি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। মাদাম কুরি লক্ষ করেছিলেন থোরিয়াম মৌলের মধ্যেও এই একই ধর্ম রয়েছে। পরবর্তীকালে বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড সিদ্ধান্তে আসেন যে এই তেজস্ক্রিয়তার কারণেই তেজস্ক্রিয় মৌলের বা পদার্থের ক্ষয় হয় যা কিনা গাণিতিক সূচকীয় সূত্রানুসারে ঘটে থাকে। ক্রমানুসারে রাদারফোর্ডের ছাত্র ফ্রেডারিক সোডি এবং তাঁর সহ-গবেষক বিজ্ঞানী ফাজান একত্রে গবেষণা করে আলফা ও বিটা ক্ষয়ের প্রসঙ্গে প্রবর্তন করেন ফাজান ও সোডির ‘তেজস্ক্রিয় স্থানচ্যুতির সূত্র’ (Radio-active Displacement Law)। হেনরি বেকারেলের গবেষণার পরে মারি কুরি এবং পিয়ের কুরিই প্রথম তেজস্ক্রিয়তা বা রেডিও অ্যাক্টিভিটি শব্দবন্ধটি প্রবর্তন করেন। প্রশ্ন হতে পারে যে, এই ধরনের ঘটনার কারণ কী? কেন সর্বদা একটি তেজস্ক্রিয় মৌল থেকে অদৃশ্য রশ্মি বিকিরিত হবে?
যে কোনও মৌলের নিউক্লিয়াসে নিউট্রন ও প্রোটন সংখ্যার অনুপাত যদি ১.৫-এর বেশি হয়ে যায়, তখন প্রোটনগুলির মধ্যে পারস্পরিক বিকর্ষণধর্মী বল অত্যধিক বেড়ে যায়, এর ফলে তুলনায় দুর্বল নিউক্লীয় বল আর তখন নিউট্রন ও প্রোটনগুলিকে একত্রে ধরে রাখতে পারে না। এর ফলেই মৌলের নিউক্লিয়াস অস্থায়ী হয়ে পড়ে এবং তখন স্বতস্ফূর্তভাবে মৌল থেকে তেজস্ক্রিয় রশ্মি বিকিরিত হয়। যে সকল মৌলের ভরসংখ্যা ২১০ বা তার বেশি, তাদের ক্ষেত্রেই এই তেজস্ক্রিয়তা ধর্ম দেখা যায়। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ফলে মৌলের নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউট্রনের অনুপাত যখন ১.৫ বা তার কাছাকাছি চলে আসে, সেই সময় নিউক্লিয়াসটি সুস্থিত হয়। ফলে একটা বিষয় স্পষ্ট যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কারণ লুকিয়ে আছে মৌলের নিউক্লিয়াসের মধ্যেই।
নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ কোনও মৌলের তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ এবং ঐ একই সময়ে ঐ একই পরিমাণ মৌল থেকে উৎপন্ন যৌগের তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ একই হয়। কারণ কোনও তেজস্ক্রিয় মৌলকে তার যৌগে রূপান্তর করলে শুধুমাত্র রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। আবার রাসায়নিক পরিবর্তনে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের বাইরের ইলেকট্রন অংশ নেয় বলে পরমাণুর ইলেকট্রনের কাঠামো বদলে যায়। কিন্তু নিউক্লিয়াস একইভাবে অপরিবর্তিত থাকে। যেহেতু তেজস্ক্রিয় মৌল থেকে উৎপন্ন যৌগেরও তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ একই থাকে, তাই বলা হয় তেজস্ক্রিয়তা হল তেজস্ক্রিয় মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ধর্ম। তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপের নির্দিষ্ট একক আছে। S.I পদ্ধতিতে তেজস্ক্রিয়তার একক হল বেকারেল (Bq)।
বিজ্ঞানীরা এই তেজস্ক্রিয়তার যে সকল বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করেছেন সেগুলি হল –
১. তেজস্ক্রিয়তা সম্পূর্ণরূপে একটি নিউক্লীয় ঘটনা। নিউক্লিয়াস বহির্ভূত ইলেকট্রনের সঙ্গে এর কোনও যোগ নেই।
২. তেজস্ক্রিয় পরমাণুর নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয় বলে এক মৌলের পরমাণু নতুন ধর্মবিশিষ্ট অন্য মৌলের পরমাণুতে পরিণত হয়। যেমন – রেডিয়াম (Ra) থেকে স্বতঃস্ফূর্ত তেজস্ক্রিয়তার ফলে রেডন (Rd) উৎপন্ন হয়।
৩. যে সকল মৌলের নিউট্রন ও প্রোটন সংখ্যার অনুপাত ১.৫-এর বেশি, কেবলমাত্র তারাই স্বাভাবিক তেজস্ক্রিয়তা দেখায়। এইসব মৌলগুলির ভরসংখ্যা ২১০ বা তার বেশি হয়ে থাকে।
৪. তেজস্ক্রিয় পদার্থমাত্রেই উচ্চ ভেদনক্ষমতা সম্পন্ন রশ্মি নির্গত হয় যা কিনা অস্বচ্ছ কাগজ, পাতলা ধাতব পাতকে ভেদ করে অনায়াসে চলে যেতে পারে।
৫. তেজস্ক্রিয়তা একটি স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত ও অবিরাম ঘটনা। চাপ, তাপ, তড়িৎক্ষেত্র বা চৌম্বকক্ষেত্র ইত্যাদি কোনও প্রকার বাহ্যিক উদ্দীপকের দ্বারা তেজস্ক্রিয়তা প্রভাবিত হয় না।
এই তেজস্ক্রিয়তার আলোচনায় আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাকে বলা হয় তেজস্ক্রিয় পদার্থের ‘অর্ধায়ু’ (Half Life)। যে সময়ে কোনও তেজস্ক্রিয় পদার্থের প্রারম্ভিক সমস্ত পরমাণুর অর্ধেক সংখ্যক পরমাণু ভেঙে যায়, তাকেই অর্ধায়ু বলা হয়। ঠিক এভাবেই কোনও প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন থেকে কার্বনের একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের অর্ধায়ু বিচার করে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সেই প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শনটি ঠিক কত বছরের পুরনো তা নির্ধারণ করতে পারেন, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় রেডিও কার্বন ডেটিং বলা হয়। আবার তেজস্ক্রিয় মৌলের সব পরমাণু একসঙ্গে ভাঙে না। এই পরমাণুগুলির স্বাভাবিক আয়ু শূন্য থেকে অসীম পর্যন্ত হতে পারে। ফলে বিজ্ঞানীদের মতে কোনও তেজস্ক্রিয় পদার্থে উপস্থিত সমস্ত পরমাণুর মোট আয়ু এবং ঐ পরমাণুর সংখ্যার অনুপাতকেই তেজস্ক্রিয় পদার্থের গড় আয়ু বলে। গড় আয়ু আর অর্ধায়ুর মধ্যে সম্পর্কটি হল নিম্নরূপ –
গড় আয়ু = অর্ধায়ু / (০.৬৯৩)
যে কোনও তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে মূলত তিন ধরনের রশ্মি নির্গত হয়ে থাকে –
ক. আলফা রশ্মি (Alpha Ray, α)
খ. বিটা রশ্মি (Beta Ray, β)
গ. গামা রশ্মি (Gamma Ray, )
এই রশ্মিগুলি বা কণাগুলি পদার্থ থেকে নির্গত হওয়ার কারণেই কিন্তু মৌলের ভর বদলে যায় এবং তা একটি নতুন মৌলে পরিণত হয়। এই কারণে তেজস্ক্রিয় পদার্থের ক্ষয়কে এই রশ্মিগুলির নামে তিনভাবে ভাগ করা হয়েছে। যথা – আলফা ক্ষয় (Alpha Decay), বিটা ক্ষয় (Beta Decay) এবং গামা ক্ষয় (Gamma Decay)।
যে কোনও পদার্থের নির্দিষ্ট পারমাণবিক সংখ্যা এবং ভরসংখ্যা আছে। তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে একটি আলফা কণা বেরিয়ে গেলে তার পারমাণবিক সংখ্যা ২ একক কমে যায় এবং ভরসংখ্যা ৪ একক কমে যায়, অর্থাৎ একে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস ধরা যেতে পারে। বিটা কনা হল ইলেকট্রন কনার স্রোত এবং বিটা কনা নিঃসৃত হলে পদার্থের পারমাণবিক সংখ্যা ১ একক বেড়ে যায় – এক্ষেত্রে নিউট্রন থেকে একটি ইলেকট্রন বেড়িয়ে সেটি প্রোটনে পরিণত হয় তাই পারমানবিক সংখ্যার বৃদ্ধি হয়। তবে পজিট্রন বা ধনাত্মক বিটা কনা নিঃসৃত হলে এর উল্টো ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে গামা রশ্মি নির্গত হলে পদার্থের ভরসংখ্যা বা পারমাণবিক সংখ্যার মধ্যে কোনও পরিবর্তন ঘটে না, গামা রশ্মি আসলে ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক তরঙ্গ। সহজে বুঝতে গেলে, আলফা কণার ভর একটি প্রোটনের ভরের ৪ গুণ এবং তার আধান একটি প্রোটনের ভরের ২ গুণ হওয়ায় আলফা নিঃসরণের পর পদার্থের ভরসংখ্যা ৪ একক এবং পারমাণবিক সংখ্যা ২ একক কমে যায়। কোন মৌলের পরমাণু থেকে আলফা ও বিটা রশ্মি নির্গমনের পরে নিউক্লিয়াস উত্তেজিত অবস্থায় থাকে যা গামা ক্ষয়ের মাধ্যমে সুস্থিত অবস্থায় পরিণত হয়। গামা ক্ষয়ের সময় কেবলমাত্র প্রোটন বা নিউট্রনের শক্তিস্তর (Energy State) পরিবর্তন হয়। তেজস্ক্রিয়তা সাধারণভাবে একটি বিপজ্জনক বিষয়। পারমাণবিক চুল্লি থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থ, চিকিৎসায় বা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপগুলি প্রকৃতিতে তেজস্ক্রিয় দূষণ ঘটাতে পারে। এই তেজস্ক্রিয়তার ফলে মানুষের দেহকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় যার ফলে নানা প্রকার বিকৃতিও দেখা যেতে পারে। সেই কারণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করার সময় সিসার প্রলেপযুক্ত বিশেষ পোশাক পরিধান করে থাকেন বিজ্ঞানীরা।
বেশ কিছু মৌলের তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। রেডিয়াম-২২৩, কোবাল্ট-৬০ কিংবা আয়োডিন-১৩১ এই তেজস্ক্রিয় আইসোটোপগুলি যথাক্রমে প্রস্টেট ক্যান্সার, লিউকোমিয়া এবং থাইরয়েড গ্রন্থির ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাছাড়া বিভিন্ন পারমাণবিক চুল্লিতে তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম আইসোটোপ থেকে নিউক্লীয় বিভাজন কিংবা সংযোজন প্রক্রিয়ার সাহায্যে প্রভূত শক্তি উৎপাদন করা হয় যা বিদ্যুৎশক্তির বিকল্প হিসেবে অনেকক্ষেত্রে কাজে লাগানো হচ্ছে। তাছাড়া বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে অন্ধকারেও দৃশ্যমান ঘড়ি বানাতে ঘড়ির কাঁটায় থোরিয়ামের সঙ্গে জিঙ্ক সালফাইডের প্রলেপ লাগানো হয়। এতেই শেষ নয়, সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে মানবকল্যাণের নানা ক্ষেত্রে ব্যবহারের প্রয়াস ক্রম অগ্রসরমান।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান