সববাংলায়

চুয়াড় বিদ্রোহ

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনকালের শুরুর দিকে বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে নিম্নবর্গীয় ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষরা চুয়াড় বিদ্রোহ (Chuar Rebellion) সংঘটিত করে। এই বিদ্রোহ ছিল পূর্ব ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সংগঠিত অন্যতম শক্তিশালী আদিবাসী বা উপজাতি বিদ্রোহ। ‘চুয়াড়’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ বর্বর বা ডাকাত। ব্রিটিশ শাসনকালে জঙ্গলমহল এলাকার ভূমিপুত্রদের বোঝাতে অপমানজনক ‘চুয়াড়’ শব্দটি ব্যবহার করা হত। প্রথমদিকে ইংরেজরা ‘চুয়াড়’ বলতে এমন এক জনজাতিকে বুঝত যারা নাকি গবাদি পশু বা শস্য লুঠ করত, কিন্তু পরে মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমান, বীরভূম প্রভৃতি অঞ্চলে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে অরাজকতা সৃষ্টিকারী যে কোনও দলকে তারা ‘চুয়াড়’ আখ্যা দিতে শুরু করে।

অনেক ব্রিটিশ ঐতিহাসিক তাঁদের রিপোর্টে চুয়াড়দের বহিরাগত বলে দাবি করেন যারা জঙ্গলমহল দখল করতে এসেছিল। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে, চুয়াড়রা মূলত ভুমিজ, মুন্ডা, সাঁওতাল, কোল প্রভৃতি আদিবাসী গোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিল, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওই অঞ্চলের প্রকৃতি, জমি ও অরণ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই তাদেরকে বহিরাগত বলা ঐতিহাসিক সত্য নয়। এই বিদ্রোহকে অনেকে ‘জঙ্গলমহল বিদ্রোহ’ নামেও উল্লেখ করেছেন।

চুয়াড় বিদ্রোহের সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। কেউ মনে করেন ১৭৬৬ থেকে ১৮৩৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্রোহ হয়েছে। আবার অনেকের মতে ১৭৭১ থেকে ১৮০৯ সালের মধ্যে বিদ্রোহ ঘনীভূত হয়। তবে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে ১৭৯৮ সাল থেকে ১৭৯৯ সালের মধ্যে এই বিদ্রোহ সর্বোচ্চ তীব্রতা লাভ করেছিল। চুয়াড়দের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা কেন্দ্র করে এই আন্দোলন শুরু হলেও পরবর্তীতে জমিদার, পাইক ও কৃষকেরা এর সঙ্গে যুক্ত হয়, ফলে আন্দোলন গণআন্দোলনের রূপ নেয়।

চুয়াড়রা সাধারণত মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া জেলার জঙ্গলমহল এলাকার অধিবাসী ছিল। তাদের প্রধান পেশা ছিল পশুপাখি শিকার, কৃষিকাজ এবং বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল জীবনযাপন। কিছু চুয়াড় স্থানীয় জমিদারের পাইক হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছিল। পাইকের কাজের জন্য তারা বেতনের পরিবর্তে পেত ‘নিষ্কর’ বা ‘পাইকান জমি’, জমিদারের কাজের পাশাপাশি সেই জমিতে তারা কৃষি ও পশুপালনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। এভাবে জমিদার ও চুয়াড়দের মধ্যে একধরনের সুদৃঢ় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে কোম্পানি নতুন ও কঠোর রাজস্বনীতি প্রবর্তন করে এবং তারা রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেয় আমিলদারদের। চুয়াড়দের নিষ্কর বা পাইকান জমিতেও কর বসানো হয়, বহু চাষির জমি কেড়ে নেওয়া হয়, এমনকি পাইকের কাজ থেকেও অনেক চুয়াড়কে বরখাস্ত করা হয়। একদিকে কোম্পানি জমিদারদের দুর্গ ভাঙার নির্দেশ দেয়, অন্যদিকে বনজ সম্পদের উপর থেকেও চুয়াড়দের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে কৃষিজীবী ও অরণ্যনির্ভর জীবনধারা বিপন্ন হয়ে ওঠে। এই অবস্থার মধ্যেই জমিদার ও কৃষক উভয়ের মধ্যে কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জন্ম নেয়, যা শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহের রূপ নেয়।

চুয়াড় বিদ্রোহ প্রধানত দুটি পর্যায়ে সংঘটিত হয়েছিল। চুয়াড় বিদ্রোহ প্রথমবার বড় আকারে দেখা দেয় ১৭৬৮ সালে। ধলভূম বা ঘাটশিলার শাসক জগন্নাথ সিং (Jagannath Singh)-এর নেতৃত্বে ছাতনা, বরাভূম প্রভৃতি অঞ্চলের জমিদাররা কোম্পানিকে রাজস্ব দিতে অস্বীকার করেন। এই পর্যায়ে বিদ্রোহ খুব তীব্র না হলেও ১৭৬৯ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আন্দোলনের গতি ত্বরান্বিত করে এবং বিদ্রোহ ধীরে ধীরে হিংসাত্মক রূপ নিতে থাকে।

১৭৯৮ সালে দ্বিতীয় পর্যায়ে এই বিদ্রোহ শুরু হয় প্রধানত মেদিনীপুর অঞ্চলে। রায়পুরের দুর্জন সিং (Durjan Singh), লাল সিং (Lal Singh) ও মোহন সিং (Mohan Singh)-এর নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা একের পর এক গ্রাম দখল করে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করে। মানভূম, ঘাটশিলা ও বরাভূমের পাহাড়ি অঞ্চল বিদ্রোহীদের জন্য প্রাকৃতিক দুর্গে পরিণত হয়।

রায়পুর, বলরামপুর, তমলুক, শালবনীসহ মেদিনীপুর ও বাঁকুড়ার বহু অঞ্চল বিদ্রোহীরা মুক্তাঞ্চলে পরিণত করে। কর্ণগড় দুর্গের শাসক রানি শিরোমণি বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁকে পরবর্তীকালে ‘মেদিনীপুরের লক্ষ্মীবাঈ’ উপাধি দেওয়া হয়। রানি শিরোমণি বিদ্রোহীদের অর্থ সাহায্য দেন এবং সরাসরি নেতৃত্বও নেন। প্রায় ৪০০ চুয়াড়কে নিয়ে তিনি ইংরেজদের অফিস ও গুদাম লুঠ করেন।

এই সময় অন্য নেতাদের মধ্যে ছিলেন সুবল সিং (Subal Singh), জঙ্গলমহলের বৈদ্যনাথ সিং (Baidyanath Singh), রঘুনাথ সিং (Raghunath Singh) প্রমুখ। অনেকে গোপনে বিদ্রোহীদের আশ্রয় দিতেন ও অর্থসাহায্য করতেন। ধীরে ধীরে আন্দোলন মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া ছাড়িয়ে বীরভূম, মানভূম, বিষ্ণুপুর এবং বর্তমান ঝাড়খণ্ডের কিছু অংশেও ছড়িয়ে পড়ে।

চুয়াড় বিদ্রোহের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল গেরিলা যুদ্ধপদ্ধতি। পাহাড় ও জঙ্গল থেকে হঠাৎ আক্রমণ চালিয়ে তারা ব্রিটিশ সেনাদের বিপাকে ফেলত। কোম্পানির সেনারা অচেনা দুর্গম অরণ্যে খাদ্যাভাব, রোগব্যাধি ও পরিবেশজনিত সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ত। বিদ্রোহীরা রায়পুর অঞ্চলে প্রায় ১৫০০ কাছারি ও বাজার জ্বালিয়ে দেয়।

বিদ্রোহের অধিকাংশ নেতা ছিলেন দক্ষ সামরিক কৌশলী। তারা গ্রামীণ কৃষকদের রক্ষা করতেন, আবার প্রয়োজনে তাদের নিয়ে সংগঠিত দল তৈরি করে ইংরেজদের উপর আক্রমণ করতেন। প্রাকৃতিক পরিবেশ, পাহাড়ি দুর্গ ও ঘন বন বিদ্রোহীদের অন্যতম আশ্রয়স্থল ছিল।

দ্বিতীয় পর্যায়ে চুয়াড় বিদ্রোহ চরম উদ্যম নিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়। ১৭৯৯ সালের পর থেকে ইংরেজরা নির্মম দমননীতি অবলম্বন করে। রানি শিরোমণি ও দুর্জন সিংকে গ্রেপ্তার করা হয়, প্রায় ২০০ বিদ্রোহীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

চুয়াড় বিদ্রোহের ফলে ইংরেজ ও বিদ্রোহী উভয়পক্ষেরই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এই আন্দোলনের ফলে বিদ্রোহীদের দাবীগুলি পূরণ না হলেও পরবর্তীকালে ইংরেজ সরকার চুয়াড়দের অভিযোগগুলির যথার্থতা অনুভব করে। এই বিদ্রোহের পর আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে নতুন ভূমি ও রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করতে বাধ্য হয় এবং আদিবাসীদের স্বার্থের দিকে নজর দিতে শুরু করে। এছাড়া  উনিশ শতকের প্রথম দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অরণ্য ও আদিবাসীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ১৮০৫ সালে অষ্টাদশ রেগুলেশন (‘Regulation XVIII, 1805’) নামে একটি আইনের খসড়া তৈরি করে। ওই আইন অনুসারে ২৩টি পরগনা নিয়ে জঙ্গলমহল জেলা তৈরি হয়। তবে তা সত্ত্বেও ইংরেজরা ওই অঞ্চলকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় আর তাই ১৮৩৩ সালে পঞ্চম রেগুলেশন (‘Section V Regulation, 1833’) আইন পাশ করে ওই জঙ্গলমহল জেলা ভেঙে দিয়ে মানভূম, বাঁকুড়া, বীরভূম প্রভৃতি আলাদা জেলা গঠন হয়।।

চুয়াড় বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের প্রথম দিকের বৃহৎ বিদ্রোহগুলির একটি। এর মাধ্যমে নিম্নবর্গীয় কৃষক, আদিবাসী ও কিছু জমিদারের মধ্যে এক বিরল মৈত্রী গড়ে ওঠে।

এই বিদ্রোহ প্রমাণ করেছিল যে, পশ্চাৎপদ ও বঞ্চিত মানুষরাও সংগঠিত হলে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। পরবর্তীকালে সাঁওতাল বিদ্রোহ বা অন্যান্য আদিবাসী বিদ্রোহে চুয়াড়দের সংগ্রামের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading