সববাংলায়

মীনাক্ষী মন্দির

বিভাগঃ ,

তামিলনাড়ু রাজ্যের সাংস্কৃতিক রাজধানী মাদুরাই ভারতের প্রাচীনতম এবং পবিত্র শহরগুলির মধ্যে একটি। এই অঞ্চলের ভাইগাই নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত বিখ্যাত হিন্দু মন্দির হল মীনাক্ষী মন্দির (Meenakshi Temple), যা আরুলমিগু মীনাক্ষী সুন্দরেশ্বর মন্দির বা আরুলমিগু মীনাক্ষী আম্মান তিরুক্কোভিল বা মীনাক্ষী আম্মান মন্দির নামেও পরিচিত। এই মন্দিরের প্রধান দেবী মীনাক্ষীকে পার্বতীর স্বরূপ বলে মনে করা হয় আর তাঁর স্বামী ভগবান শিব এখানে সুন্দরেশ্বর নামে বিরাজিত। এছাড়া এই মন্দিরে ভগবান বিষ্ণুকে দেবীর ভাই হিসাবে পূজা করা হয়। দুর্গা, শিব এবং বিষ্ণু একই সাথে এই মন্দিরে পূজিত হওয়ায় এই মন্দিরটি হিন্দুধর্মের শৈব, শাক্ত এবং বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সঙ্গমস্থলে পরিণত হয়েছে। এছাড়া এই মন্দিরটি ভগবান শিবের পবিত্র পাদল পেত্র স্থলগুলির মধ্যে একটি। এছাড়া তামিল সঙ্গম সাহিত্যেও মীনাক্ষী মন্দিরের উল্লেখ আছে।

মীনাক্ষী শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘মীন’ ও ‘অক্ষি’ থেকে এসেছে, এখানে মীন শব্দের অর্থ মাছ আর অক্ষি শব্দের অর্থ হল চোখ, অর্থাৎ মাছের মত সুন্দর চোখ যার। আবার মীনাক্ষী বলতে অনেক সময় ‘মাছের শাসন’কে বোঝায়। জাতি, ধর্ম এবং লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলে মীনাক্ষী মন্দিরে প্রবেশ করতে পারলেও দেবী মীনাক্ষী ও ভগবান শিবের মূল মন্দিরে কেবলমাত্র হিন্দুরাই প্রবেশ করতে পারে। ১৯৪৯ সালে তামিলনাড়ু সরকার এই মন্দিরের পশ্চিম মিনারটিকে ওই রাজ্যের প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করেছে। ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর এই মন্দিরটিকে স্বচ্ছ ভারত অভিযানের অধীনে ভারতের সেরা ‘স্বচ্ছ আইকনিক প্লেস’ (Swachh Iconic Place) নির্বাচিত হয়েছিল।

তামিল গ্রন্থ তিরুভিলাইয়াতারপুরাণম (Tiruvilaiyatarpurana) অনুসারে রাজা মলয়দ্বাজ পাণ্ড্য (Malayadwaja Pandya) এবং তাঁর স্ত্রী কাঞ্চনমালাই (Kanchanamalai) পুত্র লাভের জন্য একটি যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন, কিন্তু সেই যজ্ঞের আগুন থেকে পুত্রের পরিবর্তে তিন বছরের একটি কন্যার আবির্ভাব হয়। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ওই কন্যার তিনটি স্তন ছিল, যা দেখে চিন্তিত রাজা ও রানিকে ভগবান শিব আশ্বস্ত করেন যে, এই কন্যা যখন তাঁর স্বামীর সাথে দেখা করবে, তখন সে তাঁর তৃতীয় স্তন হারাবে। এছাড়া শিব আরও বলেছিলেন যে এই কন্যা খুব সাহসী হবে, আর তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে ওই কন্যাকে যেন পুত্রের মত লালন পালন করা হয়। এরপর মলয়দ্বাজ পাণ্ড্য ও তাঁর স্ত্রী কন্যার মাছের মত বড় ও সুঠাম চোখ দেখে তাঁর নাম দেন মীনাক্ষী। তাঁরা শিবের কথা অনুসারে মীনাক্ষীকে বড় করে তোলেন এবং পরবর্তীকালে রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসাবে তাঁকে রাজমুকুট পরিয়ে দেন। রাজকন্যা মীনাক্ষী সমগ্র বিশ্ব শাসন করতে চেয়েছিলেন আর তাই তিনি অনেক রাজা ও দেবতাকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। এরপর মীনাক্ষী একদিন তাঁর বিজয়রথ চড়ে একটি জঙ্গলে গিয়ে সেখানে একজন যুবক সন্ন্যাসীর দেখা পান এবং তারপরেই আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর তৃতীয় স্তনটি অদৃশ্য হয়ে যায়। স্তন অদৃশ্য হওয়ার সাথে সাথে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে শিবের কথা অনুসারে এই সন্ন্যাসীই তাঁর উপযুক্ত স্বামী। ওই সন্ন্যাসী সুন্দরেশ্বর দেব নামে নিজের পরিচয় দিলেও আসলে ওই সন্ন্যাসী ছিলেন স্বয়ং ভগবান শিব। এরপর মীনাক্ষী দেবী ওই সন্ন্যাসীকে নিয়ে মাদুরাই ফিরে আসেন এবং সেখানে জাঁকজমকভাবে তাঁদের বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জনশ্রুতি আছে যে, এই বিবাহের সময় ভগবান বিষ্ণু মীনাক্ষীর ভাই হিসেবে তাঁর কন্যাদান করেছিলেন।

এছাড়া অন্যান্য কিছু কিংবদন্তি অনুসারে মনে করা হয় যে, নিজের অপকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য ইন্দ্রদেব মীনাক্ষী দেবী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দিরটি ভগবান শিবের ঐশ্বরিক নির্দেশ অনুসারে পাণ্ড্য বংশের রাজা সম্রাট প্রথম সদয়বর্মণ কুলশেখরন (Sadayavarman Kulasekaran I) নির্মাণ করেছিলেন। তবে ১৪ শতকের গোড়ার দিকে দিল্লির সুলতানি যুগের সেনাপতি মালিক কাফুর (Malik Kafur) এই মন্দিরটি ধ্বংস করে মন্দিরের মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করেন। পরবর্তীকালে নায়ক রাজবংশের শাসক বিশ্বনাথ নায়ক (Vishwanath Nayak) শিল্প শাস্ত্রে বর্ণিত নীতি অনুসারে এই মন্দিরটি সংস্কার করেছিলেন। এরপর তিরুমালা নায়ক (Tirumala Nayaka) এই মন্দিরটি আধুনিকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক এবং প্রকৌশলীদের সহযোগিতায় ১৯৯৫ সালে মীনাক্ষী মন্দিরের পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের কাজ সম্পন্ন হয়।

মীনাক্ষী মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী বিশ্ব বিখ্যাত। এই মন্দিরের প্রতিটি স্থাপত্য ভক্তি, দক্ষতা এবং শৈল্পিক প্রতিভার উন্নত নিদর্শন। দ্রাবিড় যুগের স্থাপত্যশৈলী বিদ্যমান রয়েছে এই মন্দিরে। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন যে এই মীনাক্ষী মন্দিরটি আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। এই মন্দিরে রয়েছে ১৪টি রাজকীয়, ঐশ্বরিক বিশাল গোপুরম বা প্রবেশদ্বার, তবে তার মধ্যে চারটি প্রধান গোপুরম রয়েছে। এই গোপুরমগুলির মধ্যে দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথটির উচ্চতা সবচেয়ে বেশি, এই গোপুরমের উচ্চতা প্রায় ১৭০ ফুট। তবে পূর্ব দিকের প্রবেশপথটিকেই এই মন্দিরের প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে মনে করা হয়। এই মন্দিরটি প্রায় ১৪ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। উদীয়মান সূর্য দেবতাকে স্বাগত জানানোর জন্য মন্দিরটিকে পূর্বমুখী করে নির্মাণ করা হয়েছিল। মীনাক্ষী দেবী মন্দিরের মূল কাঠামো প্রধানত গ্রানাইট পাথর দিয়ে তৈরি হলেও গোপুরমগুলি চুনাপাথর সহ অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়। বহুতল কাঠামোর এই গোপুরমগুলি হল নানা রকম জটিল ভাস্কর্য, দেবতা, দেবী, দিব্য প্রাণী, শাস্ত্রীয় চিত্রকর্ম, মহিলা সঙ্গীতজ্ঞ, পরিচারিকা, সাধু বা পণ্ডিতদের মূর্তি, বিকৃত নানা অসুর ও রাক্ষসের প্রতিকৃত, নানা রকম শিলালিপির এক আশ্চর্যজনক সমাহার। সমগ্র মন্দির প্রায় ত্রিশ হাজারের বেশি ভাস্কর্য দ্বারা সজ্জিত রয়েছে বলে মনে করা হয়। এখানে প্রতিটি গোপুরমে উজ্জ্বল ও বিভিন্ন রঙের ব্যবহার করা হয়েছে। মন্দিরের মীনাক্ষী এবং সুন্দরেশ্বরের গর্ভগৃহের উপরের বিমানগুলি সোনায় মোড়া। এছাড়া এই মন্দিরটি প্রাচীর ঘেরা উঁচু বেষ্টনীর মধ্যে অবস্থিত।

মীনাক্ষী মন্দিরের গর্ভগৃহের আশেপাশে বেশ কিছু মন্দির রয়েছে। তাছাড়া তীর্থযাত্রীদের স্নানের জন্য পোর্থামারাই কুলাম নামে একটি সোনালী পদ্মের পবিত্র পুকুর, একটি হাজার স্তম্ভের হলঘর আছে যদিও তাতে ৯৮৫টি স্তম্ভ রয়েছে। এইগুলি ছাড়া মন্দির চত্বরে সঙ্গীতকক্ষ, দেবতাদের শয়নের জন্য বিশেষ শয়নকক্ষ, শিল্প জাদুঘর, কল্যাণ মণ্ডপ বা বিবাহের হল রয়েছে। এই মন্দিরে মীনাক্ষী দেবী ছাড়াও নটরাজের রূপে ভগবান শিবের একটি বিশাল মূর্তি রয়েছে। এছাড়া এই মন্দিরে গনেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী, বাঁশিবাদক কৃষ্ণ, রুক্মিণী, ব্রহ্মার পুজো করা হয়।

মীনাক্ষী মন্দিরের মীনাক্ষীর মূর্তিটি সবুজ পাথর দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছিল, এই পাথরটিকে পান্না পাথর বলে মনে করা হয়। মন্দিরে দেবী বাঁকানো পায়ের ভঙ্গিতে দন্ডায়মান অবস্থায় আছেন এবং দেবীর চোখের অভিব্যক্তি দিনভর নানাভাবে পরিবর্তিত হয় বলে বিশ্বাস করা হয়, এই চোখের ভঙ্গিমার জন্যই দেবীর জীবন্ত উপস্থিতি উপলব্ধি করা যায়। এখানে মীনাক্ষী দেবীর ডান হাতে একটি পদ্ম রয়েছে, যার উপরে একটি সবুজ তোতাপাখি বসে আছে, আর বাম হাতটি নিচের দিকে ঝোলানো। এই মূর্তিটি একটি বর্গাকার গর্ভগৃহের মধ্যে রয়েছে।

মীনাক্ষী মন্দিরে সারা বছর ধরে অনেক উৎসব পালন করা হয়, যার মধ্যে প্রধান হল মীনাক্ষী থিরুকল্যাণম উৎসব। মীনাক্ষী ও সুন্দরেশ্বরের বিবাহ-সম্পর্কিত এই উৎসব প্রায় বারো দিন ধরে চলে, এপ্রিল মাসে আয়োজিত এই উৎসবে প্রায় দশ লক্ষের বেশি লোকের সমাগম হয়। এছাড়া এই মন্দিরের অন্যান্য উৎসবের মধ্যে রয়েছে বসন্তম উৎসব, শিবরাত্রি এবং নবরাত্রি উৎসব। এই নবরাত্রি উৎসবে আলো এবং রঙিন সজ্জা দ্বারা মন্দিরটিকে সুন্দরভাবে সাজানো হয় এবং এই সময় নানা সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করা হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হলগুলিতে পুতুল ব্যবহার করে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ থেকে নানা পৌরাণিক দৃশ্য প্রদর্শিত করা হয়, যা শিশুদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading