জরাসন্ধ ছিলেন মগধের শক্তিশালী একজন রাজা, তিনি কংসের শ্বশুর ছিলেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল এক অলৌকিক উপায়ে। তাঁর মৃত্যু মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ তাঁর মৃত্যুতে মহাভারতের এক শক্তিশালী অধ্যায় শেষ হয়।
যযাতির বংশধরের মধ্যে জন্মায় রাজা কুরু। তাঁর বড়ছেলের বংশে জন্মায় রাজা উপরিচর বসু। ইনি যাদবদের চেদি রাজ্য দখল করে নিয়েছিলেন। একটি মত বলছে তাঁর ছেলে বৃহদ্রথের বংশে রাজা জরাসন্ধের জন্ম। আবার মহাভারতের মতে বৃহদ্রথেরই ছেলে রাজা জরাসন্ধ।
জরাসন্ধের জন্ম নিয়ে কাহিনী আছে। তার বাবা রাজা বৃহদ্রথের বিয়ে হয়েছিল কাশী রাজার দুই মেয়ের সাথে। বৃহদ্রথ দুইজন স্ত্রীকেই সমানভাবে ভালবাসতেন, কিন্তু তাঁর কোন সন্তান ছিল না। একবার ঋষি চণ্ডকৌশিক বৃহদ্রথের রাজ্যে আসেন। রাজার সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি রাজাকে সন্তান হবার একটি বর দান করেন এবং একটি আম দেন যেটা খেলে রানীর গর্ভে সন্তান আসবে। রাজা আম সমানভাবে দুই রানীর মধ্যেই ভাগ করে দিলেন। শীঘ্রই তার দুই স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে উঠল। কিন্তু ঋষির দেওয়া আম ভাগ করে খাওয়ার ফলে তাদের দুজনের গর্ভে একটি মানব দেহের অর্ধেক জন্ম নিল। এই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে রাজা সেই টুকরো দুটোকে ফেলে দেওয়ার আদেশ দিলেন। সেই টুকরো দুটো জরা নামে এক রাক্ষসী হাতে নিয়ে তার ইচ্ছায়, তার যাদুবলে জোড়া লাগিয়ে দেয়। তারপর জরারাক্ষসী মানবীর রূপ ধরে এসে রাজা বৃহদ্রথকে ছেলেটিকে রাজার হাতে তুলে দিল। রাজা অত্যন্ত খুশি হয়ে জরারাক্ষসীর পরিচয় জিজ্ঞেস করল। জরারাক্ষসী জানাল সে রাজার ঘরে পূজিত হয়ে এসেছে, তাই রাজার ওপর সে খুব সন্তুষ্ট। তাই রাজার পুত্রকে না খেয়ে সে জোড়া লাগিয়ে দিয়েছে। জরারাক্ষসী তার পুত্রকে জোড়া লাগিয়েছে বলে রাজা তার নাম রাখলেন জরাসন্ধ।
এরপর বড় হয়ে জরাসন্ধ খুব বড় রাজা হয়। তাকে কোন রাজাই পরাস্ত করতে পারছিল না। তবে মহাভারত থেকে জানা যায়, একবার কর্ণ বাহুবলে জরাসন্ধকে পরাজিত করেছিল। তারপর জরাসন্ধ তার সাথে সন্ধি করে। জরাসন্ধ তার আমলে মগধকে এক শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত করেন। জরাসন্ধের দুই মেয়ে অস্তি আর প্রাপ্তিকে বিয়ে করে কংস। মানে কংস হল জরাসন্ধের জামাই। তাই স্বাভাবিক ভাবেই কংসহত্যার পর কৃষ্ণের সাথে তার বিরোধ বাধে। কৃষ্ণের শত্রু রাজা শিশুপাল ছিলেন জরাসন্ধের । এছাড়াও জরাসন্ধের সাথে ছিলেন পৌণ্ড্রক বাসুদেব, দন্তবক্র, শাল্ব, এমনকি দুর্যোধন, কর্ণ এমনকি রুক্মিণীর বাবা ভীষ্মক। জরাসন্ধের চাপে কৃষ্ণ সদলবলে দ্বারকায় পালিয়ে আসেন।
যুধিষ্ঠির যখন রাজসূয় যজ্ঞ করার ইচ্ছায় কৃষ্ণকে দ্বারকা থেকে আমন্ত্রণ জানান, তখন কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বলেন যে জরাসন্ধ বেঁচে থাকতে এ যজ্ঞ করা যুধিষ্ঠিরের পক্ষে সম্ভব না। তখন কৃষ্ণেরা জরাসন্ধকে মারবার পরিকল্পনা করেন। যুদ্ধে কখনই জরাসন্ধকে হারানো সম্ভব নয় জেনে কৃষ্ণ অর্জুন আর ভীমকে সঙ্গে নিয়ে ব্রাহ্মণের বেশে জরাসন্ধের নগরে গেলেন। এবং জরাসন্ধের সাথে দেখা করতে রাজমহলের সম্মুখ দরজা দিয়ে না এসে পার্শ্ব দরজা দিয়ে এলেন। তাদের এই আচরণে এবং ক্ষত্রিয়ের মত বলিষ্ঠ চেহারা দেখেই জরাসন্ধের সন্দেহ হল। তারপর যখন জরাসন্ধের পূজা তারা গ্রহণ করলেন না, তখন জরাসন্ধ তাদের জিজ্ঞেস করলেন তারা কারা এবং কি অভিপ্রায়ে তারা এসেছেন। তখন কৃষ্ণ জানালেন তারা তার শত্রু বলেই সম্মুখ দরজা দিয়ে আসেননি, কেননা সম্মুখ দরজা দিয়ে বন্ধুরা আসেন, তারা তার শত্রু বলেই তার পূজা গ্রহণ করেননি। জরাসন্ধ জানতে চাইলেন কিভাবে তাদের সাথে তার শত্রুতা হয়েছে , কারণ তিনি কিছুই মনে করতে পারছেন না। কৃষ্ণ জানালেন তিনি অনেক রাজাদেরকে বন্দী করেছেন, তাই তিনি অপরাধী। এরপর নিজের আসল পরিচয় দিয়ে জরাসন্ধকে সম্মুখ যুদ্ধে আহ্বান করেলেন।
জরাসন্ধ নিজের পুত্র সহদেবকে সিংহাসনে অভিসিক্ত করে তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য তৈরি হলেন। কৃষ্ণ জিজ্ঞেস করলেন কার সাথে তিনি যুদ্ধ করতে চান! জরাসন্ধ সদর্পে ভীমকে বেছে নিলেন। তারপর দুজনে কুস্তি শুরু করলেন। আস্তে আস্তে জরাসন্ধ নিস্তেজ হয়ে পড়লে ভীম জরারাক্ষসীর সন্ধি ভেঙে ফেললে জরাসন্ধ মারা যান। তার মৃতদেহ রাজভবনের দরজায় রেখে, বন্দী রাজাদের মুক্ত করে কৃষ্ণরা ফিরে আসেন। এরপরে যুধিষ্ঠিরও রাজসূয় যজ্ঞের জন্য প্রস্তুত হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- “মহাভারতের একশোটি দুর্লভ মুহূর্ত”, আনন্দ পাবলিশার্স, পঞ্চম মুদ্রণ – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, অধ্যায়-২৭ জরারাক্ষসী , পৃষ্ঠাঃ ১৪১-১৪৯; অধ্যায়-২৮ জরাসন্ধ বধ পৃষ্ঠাঃ ১৫০-১৫৮
- “মহাভারতের ভারতযুদ্ধ ও কৃষ্ণ”, আনন্দ পাবলিশার্স, সপ্তম মুদ্রণ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, পৃষ্ঠাঃ ১৫৭-১৬৭
- https://en.wikipedia.org/wiki/Jarasandha


আপনার মতামত জানান