ইতিহাস

এ ললিতা

ভারতের প্রথম নারী ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার হলেন এ ললিতা (A.Lalitha)। ভারতের প্রযুক্তিক্ষেত্রে ও সামগ্রিক নারীমুক্তির ক্ষেত্রে এ ললিতার অবদান অবিস্মরণীয়।

১৯১৯ সালের ২৭ আগস্ট ভারতের মাদ্রাজের একটি তেলেগুভাষী মধ্যবিত্ত পরিবারে এ. ললিতার জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম আয়ালাসোমায়াজুলা ললিতা।তাঁর বাবা পাপ্পু সুব্বা রাও ছিলেন ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অধ্যাপক। তিনি তাঁর বাবা-মায়ের পঞ্চম সন্তান ছিলেন। তাঁর সব ভাইয়েরাই ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর বোনেরা প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন।

১৯৩৪ সালে মাত্র পনেরো বছর বয়সে ললিতার বিয়ে হয়। বিয়ের তিন বছরের মাথায় তাঁর একমাত্র মেয়ে শ্যামলার জন্ম হয়। কিন্তু মেয়ের জন্মের মাত্র চার মাস পরেই ললিতার স্বামী মারা যান। একা মা হিসাবে ললিতা তাঁর মেয়েকে অত্যন্ত যত্নে বড় করেছিলেন। এই কাজে তাঁকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর বোন।

বিয়ের পর দশম শ্রেণীতে সেকেন্ডারি স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট পেয়ে তাঁর পড়াশোনা স্থগিত হয়। অল্প বয়সে স্বামীর মৃত্যু হলে সদ্যবিধবা ললিতা তাঁর শিশুসন্তানকে কোলে নিয়েই তাঁর পড়াশোনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তৎকালীন ভারত বিধবাদের পড়াশোনার পক্ষে অনুকূল ছিল না। তা সত্ত্বেও তিনি চেন্নাইয়ের ক্যুইন মেরি কলেজে ভর্তি হন ও সেখান থেকে প্রথম শ্রেণীতে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। এরপর তিনি ১৯৩৯ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করতে ভর্তি হন। এই প্রতিষ্ঠানে তিনিই ছিলেন প্রথম মহিলা ছাত্রী। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই অভূতপূর্ব ঘটনাটি ঘটার পিছনে ললিতার এই কলেজেরই অধ্যাপক বাবা তাঁকে সাহায্য করেন। তিনি কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ কে. সি. চাকোর অনুমতি নেন। জানা যায় তাঁকে ব্রিটিশ সরকারের অধীনস্থ অফিসার স্যার আর. এম. স্টেথামের থেকেও অনুমতি নিতে হয়েছিল। তাঁর জন্যে কলেজের ক্যাম্পাসে আলাদা হস্টেলের ব্যবস্থাও করা হয়। ১৯৪৩ সালে হাতে-কলমে শিক্ষালাভ করার জন্য তিনি জামালপুর রেলওয়ে কর্মশালায় একবছর শিক্ষানবিশি করেন। তিনি লন্ডনের ইনস্টিটিউট অফ ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারস থেকে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পরীক্ষাও দিয়েছিলেন।

১৯৪৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে স্নাতক হওয়ার পর ললিতা তাঁর বাবার সহকর্মী হিসাবে ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত অল্প সময়ের জন্য সিমলায় সেন্ট্রাল স্ট্যান্ডার্ড অর্গানাইজেশনে কাজ করার পর তিনি কলকাতায় অবস্থিত ব্রিটিশ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড ইলেকট্রিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে যোগদান করেন।

এই সংস্থায় তাঁর দ্বারা বহু কন্ট্রাক্ট রূপান্তরিত হয়। এখানে কর্মরত থাকাকালীন তিনি বহু সাবস্টেশন লেআউট তৈরি করেন এবং ট্রান্সমিশন লাইনের নক্সা বানান। হিমাচল প্রদেশের বিলাসপুরে শতদ্রু নদীর ওপর ভাকরা নাঙ্গাল বাঁধের বিদ্যুৎ উৎপাদক পরিকাঠামো তৈরিতে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।

১৯৫৩ সালে তিনি কাউন্সিল অফ ইনস্টিটিউশন অফ ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারসের সহকারী সদস্যপদ ও ১৯৬৬ সালে পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৬৪ সালের ১৫ই থেকে ২১শে জুন ভারতবর্ষ থেকে প্রথম ও একমাত্র মহিলা হিসাবে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত মহিলা ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানীদের প্রথম আন্তর্জাতিক অধিবেশনে যোগ দেন। ভারতে প্রত্যাবর্তনের পথে তিনি তিন সপ্তাহ ইংল্যান্ডে কাটান এবং ভারতে ফেরার পর ফেমিনা ও ইভ’স উইকলি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইঞ্জিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। ১৯৬৫ সালে তিনি উওমেনস ইঞ্জিনিয়ারিং অফ লন্ডনের পূর্ণ সদস্যপদ পান। ১৯৬৭ সালে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় মহিলা ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক অধিবেশনেও তিনি অংশগ্রহণ করেন।

প্রায় তিন দশক কাজ করার পর ১৯৭৭ সালে তিনি অবসর নেন। কলকাতায় তিনি তাঁর ভাইয়ের বাড়িতে থাকতেন এবং এখানেই তিনি তাঁর জীবনের প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর অতিবাহিত করেন।

ব্রেন অ্যানিউরিজমে (Brain aneurysm) আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৯ সালের ১২ অক্টোবর মাত্র ষাট বছর বয়সে এ ললিতার মৃত্যু হয়।

তাঁর জীবনী শুনতে হলে এখানে শুনতে পারেন

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন