কমলা সোহনী (Kamala Sohonie) প্রথম ভারতীয় মহিলা যিনি বিজ্ঞানের কোনও শাখায় পিএইচডি (PhD) ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। তিনি পেশায় একজন বায়োকেমিস্ট এবং অধ্যাপিকা ছিলেন।
১৯১১ সালের ১৮ জুন ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর জেলায় কমলা সোহনীর (জন্মসূত্রে ভাগবত) জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নারায়ণরাও ভাগবত। তাঁর বাবা নারায়ণরাও ভাগবত এবং কাকা মাধবরাও ভাগবত দুজনেই রসায়নবিদ ছিলেন।
ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান বিষয়ে কমলার গভীর আগ্রহ ছিল। ১৯৩৩ সালে তাঁর পরিবারের ঐতিহ্য মেনে বম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি রসায়ন (প্রধান বিষয়) এবং পদার্থবিদ্যায় (সহযোগী বিষয়) স্নাতক হন। এরপরে তিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে যোগ দেওয়ার জন্য আবেদন করেন কিন্তু সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন প্রধান নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সি ভি রামন তাঁর আবেদন খারিজ করে দেন এই অজুহাতে যে মহিলারা তখনও সেই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে গবেষণা করার উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য কমলা সোহনী সি ভি রামনের দপ্তরের সামনে ধর্নায় বসেন। আর তার ফলেই রামন তাঁকে ভর্তি নিতে বাধ্য হন। ভর্তির সময়ে কমলাকে কয়েকটি শর্ত দেওয়া হয়েছিল যার মধ্যে ছিল – (১) তাঁকে নিয়মিত ছাত্রী হিসেবে ভর্তি না নিয়ে প্রবেশনারী (probationary) ছাত্রী হিসেবে ভর্তি নেওয়া হবে এবং তাঁর প্রথম বছরের পড়াশোনার সাফল্যের ভিত্তিতে সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর থাকা না থাকা বিচার্য হবে। (২) তাঁর গবেষণার গাইডের (guide) আদেশ অনুযায়ী তাঁকে চলতে হবে এবং দরকার হলে রাত জেগেও কাজ করতে হবে। (৩) তিনি ল্যাবরেটরির পরিবেশ নষ্ট করতে পারবেন না (মূলত পুরুষ ছাত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে না)।
কমলা এইসব অপমানজনক শর্ত মেনে নিয়েই এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি সি.ভি. রামনের এই অন্যায় আচরণের তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন এবং বলেছিলেন রামন নোবেলজয়ী বিখ্যাত বিজ্ঞানী হলেও তিনি খুবই সংকীর্ণমনা ছিলেন। কমলার এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া আরও অনেক প্রতিভাবান ভারতীয় মহিলাদের কাছে উচ্চ শিক্ষার নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল এবং তার পর থেকেই আস্তে আস্তে আরও অনেক মহিলা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে থাকেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমলার পরামর্শদাতা ছিলেন শ্রী শ্রীনিবাসাইয়া। এখানে তিনি দুধ, ডাল এবং শুঁটিতে প্রোটিনের পরিমান নিয়ে গবেষণা করেন। কমলার অসাধারণ কর্ম দক্ষতা রামনের মত বদল করতে সক্ষম হয় এবং তিনি এরপর থেকে মেয়েদের এই কলেজে ভর্তি হতে আর বাধা দেননি। ১৯৩৬ সালে তিনি ডিস্টিংশন (distinction) পেয়ে মাস্টার অফ সায়েন্স (Master of Science, MSc) ডিগ্রি লাভ করেন।
এরপর কমলা সোহনী ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ পান এবং সেখানে গিয়ে ডাক্তার ডেরেক রিখটারের তত্ত্বাবধানে ফ্রেডেরিক জি হপকিনস ল্যাবরেটরিতে (Frederick G. Hopkins Laboratory) গবেষণার কাজ করেন। তিনি নিউনহাম কলেজে (Newnham College) বায়োলজিক্যাল ন্যাচারাল সায়েন্স (Biological Natural Sciences) নিয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেন। ডাক্তার ডেরেক রিখটার চলে যাওয়ার পর তিনি ডাক্তার রবিন হিলের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করেন। আলুর উপর করা তাঁর গবেষণা থেকে তিনি ‘সাইটোক্রোম সি’ (Cytochrome C) নামের একটি এনজাইম আবিষ্কার করেন। এই এনজাইমটি ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইন-এ (electron transport chain) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে — যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবদেহে শক্তি উৎপন্ন হয়। এই এনজাইমটি উদ্ভিদ, মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর কোষে পাওয়া যায়। তিনি এই গবেষণার কাজটি মাত্র চোদ্দ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করেন এবং সেই সময়ে তাঁর গবেষণাটি খুবই গুরুত্ব লাভ করে। ১৯৩৯ সালে তিনি তাঁর পিএইচডি শেষ করে ভারতবর্ষে ফিরে আসেন।
কমলা সোহনী মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর অবদান রাখতে চেয়েছিলেন। নতুন দিল্লিতে অবস্থিত লেডি হেরিটেজ মেডিকেল কলেজে তিনি অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। সেখানে তিনি বায়োকেমিস্ট্রির বিভাগীয় প্রধান পদে নিযুক্ত হন। পরে তিনি নিউট্রিশন রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে ভিটামিন নিয়ে গবেষণার কাজ করেন।
১৯৪৭ সালে কমলার সাথে এম ভি সোহনীর বিবাহ হয়। তাঁর স্বামী পেশায় একজন একচুয়ারি (actuary) ছিলেন। বিয়ের পর কমলা মুম্বাইয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি রয়্যাল ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে বায়োকেমিস্ট্রির অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (director) হন। এখানে তিনি শিম্বগোত্রীয় খাদ্যের পুষ্টিকর দিক নিয়ে কিছু কাজ করেন। তাছাড়াও এই সময় তিনি এবং তাঁর ছাত্ররা মিলে ভারতের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের পুষ্টি এবং খাওয়া-দাওয়া নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছিলেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডাক্তার রাজেন্দ্র প্রসাদের অনুরোধে তিনি “নীরা” (এক ধরনের পানীয় যা তাল বা পাম গাছ থেকে তৈরি হয়, Neera) সম্পর্কিত একটি গবেষণার প্রকল্পেও অংশ নিয়েছিলেন। ডাক্তার রাজেন্দ্র প্রসাদ চাইছিলেন ভারতে হওয়া অসংখ্য তাল গাছকে মানুষের উপকারের জন্য ব্যবহার করতে আর তাই তিনি এই গবেষণায় আরও উৎসাহ দেন। পরে দেখা গেছিল যে আদিবাসী কিশোর এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের খাবারে সঠিক পরিমাণে নীরা থাকলে তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় কারণ এতে ভিটামিন সি (vitamin c) এবং আয়রন (iron) আছে। এই কাজের জন্য তাঁকে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়। তিনি কনজিউমার গাইডেন্স সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার (Consumer Guidance Society of India, CGSI) একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। একটা সময় তিনি বোম্বের আরে মিল্ক প্রজেক্ট ফ্যাক্টরির (Aaray Milk Project Factory) পরামর্শদাতা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন যেখানে তিনি দুধ কেটে ছানা হয়ে যাওয়া আটকানোর জন্য নতুন পথ বের করেছিলেন।
১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল অবধি তিনি এই সংস্থার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এই সময়ে তিনি এই সংস্থা থেকে প্রকাশিত হওয়া পত্রিকা ‘কিমত’-এ (Keemat) ক্রেতা সুরক্ষা সম্পর্কিত অনেক প্রবন্ধ লিখেছিলেন। একজন সফল শিক্ষিকা এবং বিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি তিনি বিজ্ঞান নিয়ে অনেক লেখালেখিও করেছিলেন। মারাঠি ভাষায় তিনি বিজ্ঞান নিয়ে তরুণ ছাত্র ছাত্রীদের জন্য বইও লিখেছিলেন।
নতুন দিল্লিতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (Indian Council of Medical Research, ICMR) দ্বারা আয়োজিত একটি সংবর্ধনা সভায় থাকাকালীন তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। কমলা সোহনীর ১৯৯৮ সালের ২৮ জুন পঁচাশি বছর বয়সে মৃত্যু হয়।
২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি কমলা সোহনীর জন্মদিনে গুগল ‘ডুডল’ এর মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানায়। কমলা সোহনীর অবদান ভারতীয় বিজ্ঞান জগত চিরকাল গর্বের সঙ্গে মনে রাখবে এবং তাঁর দেখানো পথ আগামী প্রজন্মের পাথেয় হয়ে থাকবে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান