ইতিহাস

কমলা সোহনী

কমলা সোহনী (Kamala Sohonie) প্রথম ভারতীয় মহিলা যিনি  পিএইচডি (PhD) ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। তিনি পেশায় একজন বায়োকেমিস্ট এবং অধ্যাপিকা ছিলেন।

১৯১১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর জেলায় কমলা সোহনীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নারায়ণ রাও ভাগবত। তাঁর বাবা এবং কাকা দুজনেই রসায়নবিদ  ছিলেন এবং ব্যাঙ্গালোরের টাটা ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সেস (Tata Institute of Sciences) এর প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন যা পরে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (Indian Institute of Science) নামে খ্যাত হয়।

ছোটবেলা থেকেই  বিজ্ঞান বিষয়ে কমলার গভীর আগ্রহ ছিল। ১৯৩৩ সালে তাঁর পরিবারের ঐতিহ্য মেনে বম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি রসায়নে এবং পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হন। এরপরে তিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে যোগ দেওয়ার জন্য আবেদন জানান কিন্তু সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তৎকালীন প্রধান নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সি ভি রমন তাঁর আবেদন খারিজ করে দেন এই অজুহাতে যে মহিলারা তখনও সেই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে গবেষণা করার উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য কমলা সি ভি রমনের দপ্তরের সামনে ধর্নায় বসেন। আর তার ফলেই রমন তাঁকে ভর্তি নিতে বাধ্য হন। ভর্তির সময়ে কমলাকে তিনটি শর্ত দেওয়া হয়েছিল যার মধ্যে ছিল- এক, তাঁকে নিয়মিত ছাত্রী হিসেবে ভর্তি নেওয়া হবে না এবং তাঁর পড়াশোনার সাফল্যের ভিত্তিতেই সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর থাকা না থাকা বিচার্য হবে। দুই, তাঁর গবেষণার গাইডের (guide) আদেশ অনুযায়ী তাঁকে চলতে হবে এবং দরকার হলে রাত জেগেও কাজ করতে হবে। এবং তিন, তিনি ল্যাবরেটরির  পরিবেশ নষ্ট করতে পারবেন না (মূলত পুরুষ ছাত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে না)।

কমলা এসব অন্যায় আবদার মেনে নিয়েই এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি সি.ভি। রমনের এই অন্যায় আচরণের তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন এবং বলেছিলেন যদিও রমন বড় বিজ্ঞানী ছিলেন কিন্তু তিনি খুবই সংকীর্ণমনা ছিলেন। কমলার এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া আরও অনেক প্রতিভাবান ভারতীয় মহিলাদের কাছে উচ্চ শিক্ষার নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল এবং তার পর থেকেই আস্তে আস্তে আরও অনেক মহিলা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে থাকেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমলার পরামর্শদাতা ছিলেন শ্রী শ্রীনিবাসাইয়া। এখানে তিনি দুধ ডাল এবং শাপলায় প্রোটিনের পরিমান নিয়ে গবেষণা করেন। কমলার অসাধারণ কর্ম দক্ষতা রমনের মন বদল করতে সক্ষম হয় এবং তিনি এরপর থেকে মেয়েদের এই কলেজে ভর্তি হতে আর বাধা দেননি। ১৯৩৬ সালে তিনি ডিস্টিংশন (distinction) পেয়ে মাস্টার অফ সায়েন্স (Master of Science, MSc) ডিগ্রী লাভ করেন।

এরপর কমলাকে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ কলেজ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় সেখানে গিয়ে ডাক্তার ডেরেক রিখটারের তত্ত্বাবধানে ফ্রেডেরিক জি হপকিনস ল্যাবরেটরিতে (Frederick G. Hopkins Laboratory) গবেষণার কাজ করার জন্য। তিনি নিউনহাম কলেজে (Newnham College) বায়োলজিক্যাল ন্যাচারাল সায়েন্স (Biological Natural Sciences) নিয়ে কিছুদিন পড়াশুনা করেন । ডাক্তার ডেরেক রিখটার চলে যাওয়ার পর তিনি ডাক্তার রবিন হিলের তত্ত্বাবধানে গাছের কোষ সংক্রান্ত গবেষণা করেন। তিনি এই গবেষণার কাজটি মাত্র চোদ্দ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করেন এবং সেই সময়ে তাঁর গবেষণাটি খুবই গুরুত্ব লাভ করে। ১৯৩৯ সালে তিনি তাঁর পিএইচডি শেষ করে ভারতবর্ষে ফিরে আসেন।

কমলা মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর অবদান রাখতে চেয়েছিলেন। নতুন দিল্লিতে অবস্থিত লেডি হেরিটেজ মেডিকেল কলেজে তিনি অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। সেখানে তিনি বায়োকেমিস্ট্রির বিভাগীয় প্রধান পদে নিযুক্ত হন। পরে তিনি নিউট্রিশন রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে ভিটামিন নিয়ে গবেষণার কাজ করেন।

১৯৪৭ সালে কমলার সাথে এম ভি সোহনীর বিবাহ হয়। তাঁর স্বামী পেশায় একজন একচুয়ারি (actuary) ছিলেন। বিয়ের পর কমলা মুম্বাইয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি রয়্যাল ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে বায়োকেমিস্ট্রির অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। এখানে তিনি শাপলার পুষ্টিকর দিক নিয়ে কিছু কাজ করেন। তাছাড়াও এই সময় তিনি এবং তাঁর ছাত্ররা মিলে ভারতের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের পুষ্টি এবং খাওয়া-দাওয়া নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছিলেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডাক্তার রাজেন্দ্র প্রসাদের অনুরোধে তিনি “নীরা” (এক ধরনের পানীয় যা পাম গাছ থেকে, শাপলা থেকে এবং চালের গুঁড়ো থেকে  তৈরি হয়, Neera)  সম্পর্কিত একটি গবেষণার প্রকল্পেও অংশ নিয়েছিলেন। ডাক্তার রাজেন্দ্র প্রসাদ চাইছিলেন ভারতে হওয়া অসংখ্য পাম গাছকে মানুষের উপকারের জন্য ব্যবহার করতে আর তাই তিনি এ গবেষণায় আরও উৎসাহ দেন। পরে দেখা গেছিল যে আদিবাসী কিশোর এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের খাবারে সঠিক পরিমাণে নীরা থাকলে তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় কারণ এতে ভিটামিন সি (vitamin c) এবং আয়রন (iron) আছে। এই কাজের জন্য তাঁকে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়। তিনি কনজিউমার গাইডেন্স সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার (Consumer Guidance Society of India, CGSI) একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। একটা সময় তিনি বোম্বের আরে মিল্ক প্রজেক্ট ফ্যাক্টরির (Aaray Milk Project Factory) পরামর্শদাতা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন যেখানে তিনি দুধ কেটে ছানা হয়ে যাওয়া আটকানোর জন্য নতুন পথ বের করেছিলেন।

১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল অবধি তিনি এই সংস্থার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এই সময়ে তিনি এই সংস্থা থেকে প্রকাশিত হওয়া পত্রিকা ‘কিমত’-এ (Keemat) ক্রেতা সুরক্ষা সম্পর্কিত অনেক প্রবন্ধ লিখেছিলেন। একজন সফল শিক্ষিকা এবং বিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি তিনি বিজ্ঞান নিয়ে অনেক লেখালেখিও করেছিলেন। মারাঠি ভাষায় তিনি বিজ্ঞান নিয়ে তরুণ ছাত্র ছাত্রীদের জন্য বইও লিখেছিলেন।

নতুন দিল্লিতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (Indian Council of Medical Research, ICMR) দ্বারা আয়োজিত একটি সংবর্ধনা সভায় থাকাকালীন তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। কমলা সোহনীর ১৯৯৮ সালের ২৮ জুন পঁচাশি বছর বয়সে মৃত্যু হয়।

কমলা সোহনীর অবদান ভারতীয় বিজ্ঞান জগত চিরকাল গর্বের সঙ্গে মনে রাখবে এবং তাঁর দেখানো পথ আগামী প্রজন্মের পাথেয় হয়ে থাকবে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।