ইতিহাস

তুলসী লাহিড়ী

তুলসী লাহিড়ী

বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে বাংলা নাট্যসাহিত্য তথা নাট্য আন্দোলনের অন্যতম প্রবাদপুরুষ ছিলেন তুলসী লাহিড়ী (Tulsi Lahiri)। তাঁর নাটকগুলিতে জীবন্তভাবে ধরা দিয়েছে যুদ্ধ, মন্বন্তর এবং দেশভাগের নিদারুণ ছবি। চল্লিশের দশকে সমস্ত বাংলা জুড়ে যে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক টাল-মাটাল অবস্থা এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল তার আঁচ এসে পড়েছিল নাট্যকার তুলসী লাহিড়ীর মনেও। তাঁর লেখা ‘দুঃখীর ইমান’, ‘ছেঁড়া তার’, ‘মাটির ঘর’ ইত্যাদি নাটকগুলি আজও বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল সম্পদ। তিনি একাধারে একজন অভিনেতা, পরিচালক এবং নাট্যকার ছিলেন। পেশাদারি রঙ্গমঞ্চে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল। তারপরে হীরেন বসুর পরিচালনায় ‘চুপ’ নামের একটি নির্বাক ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। এছাড়াও ঠিকাদার, চোরাবালি, বিজয়িনী, সোনার সংসার, পরশমণি, মায়াকাজল ইত্যাদি ছবিতেও তিনি অভিনয় করেছেন। তাঁর লেখা নাটক অবলম্বনে ১৬টি ছায়াছবি নির্মিত হয়েছে। মোট ১৫টি পূর্ণাঙ্গ নাটক এবং ১৩টি একাঙ্ক নাটক রচনা করেছেন তুলসী লাহিড়ী।

১৮৯৭ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের রংপুর জেলার গাইবান্ধার অন্তর্গত নলডাঙার বিখ্যাত জমিদার বংশে তুলসী লাহিড়ীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম সুরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী এবং মায়ের নাম শৈলবালা দেবী। তাঁদের তিন পুত্র ও চার কন্যার মধ্যে তুলসী ছিলেন জ্যেষ্ঠপুত্র। তাঁর আসল নাম ছিল হেমেন্দ্রচন্দ্র। তাঁর বাবা সুরেন্দ্রনাথ পেশায় রংপুরের ডিমলা এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন এবং তার পাশাপাশি তিনি একজন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। কর্ণেট-বাদক হিসেবে তাঁর বেশ নামডাক ছিল। ১৯২০ সালে পাবনার মুরলীমোহন গোস্বামীর কন্যা শান্তি দেবীর সঙ্গে বিবাহ হয় তুলসী লাহিড়ীর।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

রংপুর ন্যাশনাল স্কুলে প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পন্ন হয় তুলসী লাহিড়ীর। এই সময় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বাংলা জুড়ে। তখন স্বদেশিদের সমর্থনে পিকেটিং করার অপরাধে স্কুল থেকে বিতাড়িত হন তিনি। আর সেই কারণেই তাঁকে ‘তুলসী’ নাম দিয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি করা হয়। কলকাতার সারদাচরণ ইনস্টিটিউশন থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তুলসী লাহিড়ী। অনেকে বলেন যেহেতু তাঁর প্রপিতামহ কাশীকান্ত লাহিড়ী কোচবিহারের রাজ এস্টেটে দেওয়ানি করার সুবাদেই কোচবিহার রাজ স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তুলসী লাহিড়ী। স্কুলের খাতায় তাঁর নাম ছিল তুলসীদাস লাহিড়ী। বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করে রংপুর কলেজে ভর্তি হন তিনি এবং সেই কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষাতেও পাশ করেন তিনি। এরপর কলকাতায় এসে একইসঙ্গে স্নাতকোত্তর এবং আইন পড়তে শুরু করেন তুলসী লাহিড়ী। অবশেষে রিপন কলেজ থেকে আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। কিন্তু স্নাতকোত্তরের পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি তাঁর। প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি ঠাকুরদাদা শিবচন্দ্র লাহিড়ীর মাধ্যমেই ছোটবেলায় রাজগায়িকা তারাবাঈয়ের কাছে সঙ্গীতশিক্ষার তালিম নেন তুলসী লাহিড়ী। পরে তারাবাঈয়ের প্রেরণায় এবং উৎসাহে তুলসী লাহিড়ী লক্ষ্ণৌয়ের মরিস কলেজ থেকে সঙ্গীতশিক্ষায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ওস্তাদ খেলাফত হোসেনের কাছ থেকেও তালিম নিয়েছিলেন তিনি। রংপুরেরই প্রখ্যাত অভিনেতা তারাপ্রসন্ন সান্যালের কাছে নাট্যাভিনয়ের হাতেখড়ি হয় তুলসীর।

১৯২৮ সালে কলকাতার আলিপুর কোর্টে আইন অভ্যাস শুরু করেন তুলসী লাহিড়ী। ওকালতি করলেও তাঁর আসল নেশা ছিল গান আর অভিনয়। ১৯২৯ সালে তুলসী লাহিড়ীর লেখা দুটি গান বিখ্যাত গায়ক জমিরুদ্দিন খাঁ এইচএমভি থেকে রেকর্ড করেছিলেন যা পরে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তাঁরই এক কাছের বন্ধু বিমল গুপ্ত তাঁকে পরামর্শ দেন আইন ব্যবসা ছেড়ে সম্পূর্ণ গানের জগতে মনোনিবেশ করতে। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এইচএমভি, কলম্বিয়া এবং মেগাফোন কোম্পানির সঙ্গীত পরিচালনাও করেছিলেন তিনি। এরই মাঝে ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত এইচএমভিতে তুলসী লাহিড়ীর লেখা গানই গেয়েছিলেন কমলা ঝরিয়া, রাজলক্ষ্মী, মাণিকমালা, আব্বাসউদ্দিন, জ্ঞানেন্দ্রমোহন গোস্বামী প্রমুখ বিখ্যাত সব সঙ্গীতজ্ঞরা। ১৯৩৪ সালেই এইচএমভি সংস্থার কাজ ছেড়ে তুলসী লাহিড়ী যোগ দেন কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানিতে। এই সময় রাধারাণী দেবী, উত্তরা দেবী, উমা দাশ প্রমুখরা তাঁরই পরিচালনায় গান গেয়েছিলেন। পেশাদার রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে তাঁর প্রথম কাজের সূত্রপাত হয় সঙ্গীত পরিচালনার মাধ্যমেই। ১৯৩০ সালে আর্ট থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের ‘চিরকুমার সভা’ নাটকে ‘রসিক’ চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সেই নাটকের প্রথম অভিনয়ের দিন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন। স্টার থিয়েটারের পরিচালক অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের অধীনে ‘স্বয়ম্বরা’ নাটকে সঙ্গীত পরিচালনার ভার পান তুলসী লাহিড়ী। এরপর ‘পোষ্যপুত্র’ এবং ‘মন্দির’ নাটকেও সুরারোপ করেন তিনি।

চলচ্চিত্র জগতেও বহু ছবিতে অভিনয় করেছেন তুলসী লাহিড়ী। হীরেন বসুর পরিচালনায় নির্বাক ছবি ‘চুপ’-এ প্রথম অভিনয় করেন তিনি। তারপর ‘যমুনা পুলিনে’ নামে একটি ছবির কাহিনিকার এবং সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন তিনি। তাঁরই কাহিনি অবলম্বনে প্রায় ১৬টিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে সে সময়ে। তুলসী লাহিড়ী নিজে মোট ১১টি ছবি পরিচালনা করেছেন। ‘ঠিকাদার’, ‘বেজায় রগড়’, ‘চোরাবালি’, ‘সোনার সংসার’, ‘বিজয়িনী’, ‘জীবনসঙ্গিনী’, ‘পরশমণি’, ‘অভিনয়’, ‘রিক্তা’, ‘পথিক’ ইত্যাদি ছবিগুলিতে কখনও সুরকার, গীতিকার আবার কখনও অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন তুলসী লাহিড়ী। ১৯৩৩ সালে ‘যমুনা পুলিনে’ ছবি নির্মিত হওয়ার পরে তিনি যোগ দেন কালী ফিল্মস স্টুডিওতে এবং সেখানে ‘মণিকাঞ্চন’ নামে একটি কমেডি ছবির সংলাপ ও চিত্রনাট্য লেখেন। তারপরে একে একে শ্রীভারতলক্ষ্মী ফিল্মস, ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্মস ইত্যাদি সংস্থায় কাজ করতে থাকেন তিনি। ‘সোনার সংসার’ ছবিটি এই ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্মস-এরই প্রযোজনা। সুশীল মজুমদারের পরিচালনায় ‘ফিল্ম কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড’-এর প্রযোজনায় তুলসী লাহিড়ীর বিখ্যাত নাটক ‘মায়ের দাবী’ অবলম্বনে ‘রিক্তা’ নামে একটি অসাধারণ চলচ্চিত্র তৈরি হয়। ১৯৩৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটি দর্শক আনুকূল্য পেয়েছিল বেশ ভালো। টানা ৪ সপ্তাহ চলেছিল এই ছবিটি, তার মধ্যে অনেকগুলি শো-তে দর্শকাসন পরিপূর্ণ হয়ে যায়। পরে ১৯৪৭ সালে আবার তুলসী লাহিড়ীর ‘দুঃখীর ইমান’ নাটকটি অবলম্বনে সুশীল মজুমদারের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘সর্বহারা’ নামের একটি ছবি।

এক তীব্র মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তিনি তাঁর নাটকগুলি রচনা করেছিলেন। সমকালীন যুদ্ধ, দাঙ্গা, অনাহার, দুর্ভিক্ষ তাঁর নাটকে রূপ পেয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অসাড়তা প্রমাণ করার এক সুপ্ত ইচ্ছা লক্ষ্য করা যায় তাঁর নাটকগুলির মধ্যে। গ্রাম বাংলার দরিদ্র মানুষগুলির জীবন যে কীভাবে পঞ্চাশের মন্বন্তরের করাল গ্রাসে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, তুলসী লাহিড়ীর লেখা ‘দুঃখীর ইমান’ নাটকটি যেন তাঁরই প্রমাণ। ১৯৪১ সালে দূর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম তুলসী লাহিড়ীর ‘মায়ের দাবী’ নাটকটি বাণিজ্যিক পেশাদারি মঞ্চে উপস্থাপন করেন। তার কয়েক বছর পরেই ১৯৪৬ সালে শিশির ভাদুড়ী মঞ্চস্থ করেন ‘দুঃখীর ইমান’ নাটকটি। ১৯৪৯ সালে ‘বহুরূপী’-র প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয় তাঁর ‘পথিক’ নাটকটি এবং সেই ‘বহুরূপী’ থেকেই শম্ভু মিত্রের পরিচালনায় ‘ছেঁড়া তার’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয় ১৯৫০ সালে। এছাড়া তুলসী লাহিড়ীর লেখা ‘বাংলার মাটি’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয় ১৯৫৬ সালে, সবিতাব্রত দত্তের প্রযোজনায়। তুলসী লাহিড়ী মোট ১৫টি পূর্ণাঙ্গ নাটক এবং ১৩টি একাঙ্ক নাটক লিখেছিলেন। এছাড়াও তাঁর লেখা দুটি বিখ্যাত গান হল ‘ভুলো না রেখো মনে বাঁচবে যত কাল’ এবং ‘কুল মজালি ঘর ছাড়ালি পর করালি আপনজনে’। ‘ঠিকাদার’, ‘গৃহপ্রবেশ’, ‘অন্তরীক্ষ’ ইত্যাদি ছবির কাহিনিও লিখেছিলেন তুলসী লাহিড়ী।

তুলসী লাহিড়ীর লেখা অন্যান্য বিখ্যাত পূর্ণাঙ্গ নাটকগুলি হল ‘লক্ষ্মীপ্রিয়ার সংসার’, ‘ভিত্তি’ এবং ‘পরীক্ষা’। এছাড়া ‘নাট্যকার’, ‘নববর্ষ’, ‘নায়ক’, ‘গ্রীনরুম’, ‘ওলট-পালট’, ‘চৌর্যানন্দ’, ‘দেবী’ ইত্যাদি তাঁর লেখা বিখ্যাত সব একাঙ্ক নাটক।

১৯৫৯ সালের ২২ জুন তুলসী লাহিড়ীর মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্র


  1. ড. সনাতন গোস্বামী (সম্পা:), 'তুলসী লাহিড়ীর নাট্য সমগ্র', প্রজ্ঞা বিকাশ, ২০১২, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১১-৩০
  2. ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য, 'বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস', ২য় সং, ১৯৬০, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৪৮৪-৪৯০
  3. https://en.wikipedia.org/
  4. https://www.roddure.com/
  5. http://onushilon.org/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন