সববাংলায়

এক জীবন্ত অগ্নিস্নাত সন্ন্যাসী

১৯৬৩ সালের ১১ জুন। ভিয়েতনামের রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে গাড়ি চড়ে এসে নামলেন এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। তাঁকে অনুসরণ করে আরো কয়েকজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ভিড় করে দাঁড়ালেন রাস্তায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই মুণ্ডিত মস্তক সাধুর গায়ে দাহ্য তরল ঢেলে দিল তাঁর অনুগামীরা। বোঝা যাচ্ছে একটা ভয়ানক কিছু ঘটতে চলেছে। ক্যামেরা নিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব দাঁড়িয়ে রইলেন চিত্র-সাংবাদিক ম্যালকম ব্রাউনি। মুহূর্তের মধ্যে নিজের গায়েই আগুন ধরিয়ে দিলেন সেই সন্ন্যাসী। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো তাঁর পুরো শরীর জুড়ে। রাস্তায় মানুষজন ভয়ে-আতঙ্কে থরহরিকম্প, বৌদ্ধ অনুগামীরা নীরব। সেই সন্ন্যাসী জ্বলন্ত আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে শান্ত, সমাহিত। আর এই ছবিই ক্যামেরাবন্দী করে ফেললেন ম্যালকম। পত্রিকার পাতায় ছাপা হল সেই ছবি আর শতাব্দীর ইতিহাসে এক আত্মধ্বংসী প্রতিবাদ হিসেবে লেখা হয়ে গেল ম্যালকম ব্রাউনির ক্যামেরায় তোলা এক জীবন্ত অগ্নিস্নাত সন্ন্যাসীর (a burning monk) সাদা-কালো ছবি।

এক জীবন্ত অগ্নিস্নাত সন্ন্যাসী | সববাংলায়

কেন এরকমভাবে প্রতিবাদ করতে হল সেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে? আর শুধু বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাই বা কেন এই প্রতিবাদের মূলে? তাঁদের ক্ষোভের কারণ ঠিক কী ছিল? জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে সেই ১৯৬৩ সালের ৮ মে দিনটিতে। স্থান ভিয়েতনামের হিউ শহর। একটি বিশেষ উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো শহর জুড়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষরা আনন্দে মেতেছে, সকলে একজোট হয়েছে উৎসব পালনের জন্য। সেদিনটা ছিল ‘ফাত্‌-দন্’ অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধের জন্মদিন। স্বাভাবিকভাবেই এই দিনটি প্রত্যেক বৌদ্ধদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরের সর্বত্র লোকে-লোকারণ্য। ভিয়েতনামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অগণিত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ এসেছেন উৎসবে সামিল হতে। আর এই উৎসবে সামিল প্রত্যেকের হাতেই উড়ছে বৌদ্ধ পতাকা। এখানেই সমস্যার সূত্রপাত। ভিয়েতনামে তখন কোনোপ্রকার ধর্মীয় পতাকা ওড়ানো একেবারে বন্ধ। অবাক হলেন? হ্যাঁ এই আইনটাই বলবৎ করেছিলেন তৎকালীন ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট নিগো দিন দিয়েম। পশ্চিমি প্রেরণায় দেশকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে ক্যাথলিক দিন দিয়েমের এই আইন রুষ্ট করেছিল বহু বৌদ্ধকে। কারণ ভিয়েতনামের মোট জনসংখ্যার নব্বই শতাংশ মানুষই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। অন্যান্য দেশের মতোই ভিয়েতনামেও ধর্মের একটা জোরালো প্রভাব ছিলই আর সেটাই খণ্ডন করতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট দিন দিয়েম। ফলে ধর্মে আঘাত হানলে সেটা যে কেউই ভালোভাবে মেনে নেবে না এটাই স্বাভাবিক। তাই প্রতিবাদ দানা বাঁধতে শুরু করলো।

এই উৎসবের মধ্যেই একদিন হঠাৎ ভিয়েতনামের আর্মি-পরিচালিত সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ঢুকে পড়ে উৎসবের জমায়েতে দিন দিয়েমের নির্দেশে। পুলিশের উপস্থিতি সমস্ত উৎসব প্রাঙ্গণকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী প্রত্যেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, অস্থিরতা চরমে ওঠে। একসময় ধৈর্য হারিয়ে পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করে নৃশংসভাবে। আর সেইসঙ্গে জনসমাবেশের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়। ফলে দিনের শেষে একশো জন গুরুতর আহত হয় আর নয় জন মারা যায়। এই নয় জনের মধ্যে দুজন শিশু গাড়ি চাপা পড়ে মারা গিয়েছিল। ১৯১৯ সালের ভারতে জালিয়ানওয়ালাবাগের কথা খানিকটা মনে পড়ছে তাই না? শাসকের শ্রেণি-চরিত্র সবক্ষেত্রেই এক, তার মুখ ও মুখোশ সব দেশেই একই ধাঁচের। মানুষ কিন্তু চুপ করে থাকেনি। সমগ্র ভিয়েতনাম সেদিন গর্জে উঠেছিল রাগে-ক্ষোভে। বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ দেখা দিচ্ছিল। এইসবের পাশে নির্জন ভিয়েতনামের পাহাড়ে বুদ্ধ-আরাধনা এবং পড়াশোনায় নিমগ্ন ছিলেন বৌদ্ধ সন্ত থিচ্‌ কোয়াং দুক্‌। বিগত তিন বছর ধরে পাহাড়ের উপরে সেই বৌদ্ধ মন্দিরেই সম্পূর্ণ জন-বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি দিন কাটাচ্ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে সুরক্ষিত করতে কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নিলেন কোয়াং দুক্‌।

ইতিমধ্যে ১৯৬৩ সালের ১০ জুন ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’ সংবাদপত্রের সাইগন ব্যুরোর মুখ্য অধিকর্তা ম্যালকম ব্রাউনি একটি খবর পান যে পরেরদিনই কম্বোডিয়ান দূতাবাসের সামনে কিছু একটা ভয়ানক ঘটনা ঘটবে। এই সংবাদে বিশ্বাস করে ম্যালকম ব্রাউনি পরেরদিন কম্বোডিয়ান দূতাবাসের সামনে পৌঁছে দেখেন প্রায় সাড়ে তিনশো বৌদ্ধ সন্ন্যাসী সেখানে জড়ো হয়েছেন প্রতিবাদ জানাবেন বলে। ম্যালকমকে স্বাগত জানান বৌদ্ধ সন্ন্যাসী থিচ্‌ কোয়াং দুক্‌। কিন্তু তখনো ম্যালকম বুঝতে পারেননি ঠিক কি ঘটতে চলেছে এরপরে? একটি কুশন নিয়ে রাস্তার মাঝখানে সেটি রেখে কোয়াং দুক্‌ ধ্যানভঙ্গিতে উপবিষ্ট হলেন এবং অন্যান্য বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা দুকের গাড়ি থেকে পাঁচ গ্যালন পেট্রোলিয়ামের ক্যানেস্তারা নিয়ে এসে তাঁর গায়ে ঢেলে দেয়। সারা শরীরে দাহ্য তরলস্নাত কোয়াং দুক্‌ ধীরে ধীরে বুদ্ধের উদ্দেশে শেষ প্রার্থনাটুকু সেরে নিলেন। ম্যালকম বুঝে গিয়েছেন এতক্ষণে ঠিক কী হতে চলেছে। তিনি তাঁর ক্যামেরা তাক করে থাকলেন প্রতিটি মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করবেন বলে। কোয়াং দুক্‌ দেশলাই জ্বালানো মাত্র দাউ দাউ করে অগ্নিশিখা গ্রাস করে ফেলে তাঁকে। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ভিড় থেকে আতঙ্ক আর ভয়ের চিৎকার শোনা যায়। ভিয়েতনামের রাস্তায় এ কী ঘটছে! প্রতিবাদের এ কোন অভিনব ভাষা? কম্বোডিয়ান দূতাবাসের সামনে শত শত সন্ন্যাসীর ভিড় ঘিরে রেখেছে সেই জীবন্ত অগ্নিস্নাত সন্ন্যাসীকে – থিচ্‌ কোয়াং দুক্‌।

সকলের আতঙ্কিত চিৎকারের মাঝে শান্ত-সমাহিত দুক্‌ স্থির-পাথরের মতো নিশ্চল, যেন জ্বালা-যন্ত্রণার সামান্যতম অনুভূতিও তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি। মাত্র দশ মিনিট সেই ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিতে থাকার পরে তাঁর শরীর ঢলে পড়ে, মারা যান থিচ্‌ কোয়াং দুক্‌।

আগুন নিভে গেলে সন্ন্যাসীরা তাঁর মৃতদেহ নিয়ে যান প্যাগোডায় সমাধিস্থ করার জন্য। ততক্ষণে ম্যালকম সেই ছবি সহ একটি চিঠি লিখে পাঠিয়ে দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যা পরেরদিন সব সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশ পায়। সাদা-কালো সেই ছবিতে দেখা যায় রাস্তার মাঝে অগণিত সন্ন্যাসীদের মাঝে জীবন্ত আগুনে পুড়ছেন থিচ্‌ কোয়াং দুক্‌ আর তাঁর পিছনে তাঁর নিজেরই গাড়ি, ইঞ্জিনের হুডটা খোলা। গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয় এই একটা ছবি। বিশ্বের অন্য সমস্ত দেশ এরপর ভিয়েতনামের সরকারকে চাপ দিতে থাকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের স্বার্থে পূর্বের আইন পরিবর্তন করার জন্য। এই চূড়ান্ত প্রতিবাদ বুঝিয়ে দেয় যে পৃথিবীতে কোনো কিছুই প্রবল আত্মত্যাগ ছাড়া পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কোয়াং দুকের মৃতদেহ সমাধি দেওয়ার সময় দ্বিতীয়বার পোড়ানো হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও অনেক বৌদ্ধ আজও বিশ্বাস করেন যে তাঁর হৃদ্‌পিণ্ডটি পোড়েনি সেদিন, আজও নাকি সেটি অক্ষত আছে। জা-লোল-প্যাগোডায় একটি কাঁচের পাত্রে সেই হৃদ্‌পিণ্ডটি রাখা আছে বলে অনেকের বিশ্বাস যা বৌদ্ধদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি প্রতীক। আর আশ্চর্যজনকভাবে এক জীবন্ত অগ্নিস্নাত সন্ন্যাসীর ছবির জন্য পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত হন ম্যালকম ব্রাউনি। একটা বাস্তব প্রতিবাদ আর তার প্রত্যক্ষ ছবি সেদিন গোটা দুনিয়াকেই আলোড়িত করেছিল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading