আলফ্রেড নোবেলের আক্ষেপভরা একটি চিঠি

আলফ্রেড নোবেলের আক্ষেপভরা একটি চিঠি

আলফ্রেড নোবেল। পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিস্ময়কর চরিত্র। প্রথম জীবনে ডায়নামাইট আবিষ্কার করে সারা বিশ্বকে ভয়াবহ বিস্ফোরকের যে সূত্র তিনি তুলে দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন সেই তিনিই শেষ জীবনে তাঁর স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি নোবেল কমিটিকে দান করে যান পাঁচটি বিষয়ে অসামান্য অবদানের জন্য পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের যে কোন ধর্মের মানুষকে পুরস্কৃত করার জন্য। এ অনেকটা দস্যু রত্নাকরের বাল্মীকিতে রূপান্তর কিংবা সম্রাট অশোকের চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোকে রূপান্তরের কথা মনে করায়। আলফ্রেড নোবেলের আক্ষেপভরা একটি চিঠি নিয়ে আজ বলবো।

১৮৯৬ সালের ২৫ অক্টোবর তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী এবং তাঁর উইলের কার্য সম্পাদক রাগনার সোহলমানকে আলফ্রেড নোবেল আক্ষেপভরা একটি চিঠি লেখেন। যেখানে তিনি লিখছেন –

রাগনার সোহলমানকে লেখা মূল চিঠি

চিঠিটি সুইডিশে লেখা। মূল লেখাটির ইংরেজি অনুবাদ পাওয়া যাবে রাগনার সোহলমানের বই ‘The legacy of Alfred Nobel : the story behind the Nobel prizes’, এর ৩৯ পৃষ্ঠায় –

“My heart trouble will keep me here in Paris for another few days at least, until my doctors are in complete agreement about my immediate treatment. Isn’t it the irony of fate that I have been prescribed N/G 1, to be taken internally! They call it Trinitrin, so as not to scare the chemist and the public.”

যার বাংলা করলে দাঁড়ায় – “ প্যারিসে আমাকে আরও কিছু দিন থাকতে হবে আমার হৃদরোগের কারণে। অন্তত যতদিন না চিকিৎসকরা আমার দ্রুত আরোগ্যের বিষয়ে সকলে একমত হতে পারছেন। ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস, যে আমার হৃদ্‌যন্ত্র সারাতে চিকিৎসকরা আমাকে নাইট্রোগ্লিসারিন (N/G 1) খেতে হবে বলেছেন। ওরা নামটা শুধু বদলে ট্রাইনাইট্রিন করে দিয়েছে, যাতে ওষুধ বিক্রেতা এবং সাধারণ মানুষ ভয় না পায়।”

এখন প্রশ্ন হচ্ছে নাইট্রোগ্লিসারিন খেতে গিয়ে এত বিলাপ এত আক্ষেপ কেন করছেন নোবেল ? কারণ নাইট্রোগ্লিসারিন একটি সাংঘাতিক শক্তিশালী বিস্ফোরক যেটিকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহারের নতুন দিক খুলে দিয়েছিলেন স্বয়ং নোবেল নিজেই। এই নাইট্রোগ্লিসারিন অবশ্য নোবেলের আবিষ্কার নয়। ১৮৪৭ সালে ইতালীয় রসায়নবিদ আস্কানিও সবরেরো (Ascanio Sobrero) প্রথম নাইট্রোগ্লিসারিন আবিষ্কার করেন। আবিষ্কার তো করলেন কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী একটি বিস্ফোরক ব্যতীত এর আর কোন উপযোগিতা উনি দেখতে পেলেন না। দেখতে পেলেন নোবেল। নোবেল এবার নাইট্রোগ্লিসারিন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। ১৮৬৪ তে স্টকহোমের হেলেনেবোর্গে নাইট্রোগ্লিসারিন প্রস্তুতির সময় প্রবল বিস্ফোরণে নোবেলের ভাই এমিলের অকাল মৃত্যু হয়। নোবেল কিন্তু নাইট্রোগ্লিসারিন নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন। বিস্ফোরক হিসেবে এই নাইট্রোগ্লিসারিন অত্যন্ত অস্থির প্রকৃতির। যেকোন মুহূর্তে সামান্য অসাবধানতার কারণে বিস্ফোরণ ঘটে যেত। গরম কোন কিছুর সংস্পর্শে এলে বা ধাক্কা লাগলেই নাইট্রোগ্লিসারিনে বিস্ফোরণ ঘটে যেত। এভাবে বহু খনি শ্রমিকের মৃত্যু ঘটত।  জার্মানির ক্রুমেলে এরকম একটি নাইট্রোগ্লিসারিন জনিত বিস্ফোরণের ফলে বহু খনি শ্রমিকের মৃত্যু হলে নোবেল সেখানে পৌঁছন পরিস্থিতি দেখতে। ক্রুমেলে পৌঁছে সেখানকার মাটিতে এক অদ্ভুত রকমের ছিদ্রযুক্ত বালি দেখতে পান তিনি যা স্থানীয়ভাবে কাইসেলগুর নামে পরিচিত। নোবেল ঠিক করলেন একটা পরীক্ষা করবেন। আদি প্রাণী ডায়াটমের দেহের অংশ বিশেষ এই কাইসেলগুর দিয়ে পুট্টি বানিয়ে তার মধ্যে নাইট্রোগ্লিসারিন ভরে দিলেন তিনি। এবার সেই কাইসেলগুরের আবরণের মধ্যে থাকা নাইট্রোগ্লিসারিনকে ধাক্কা মেরে এমনকি গরম করেও দেখলেন কোন বিস্ফোরণ হল না। একমাত্র নোবেল আবিষ্কৃত ব্লাস্টিং ক্যাপ দিয়ে ডিটোনেট করলেই সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে সেটা বিস্ফোরিত হচ্ছে। ১৮৬৭ সালে এই নতুন বিস্ফোরকের পেটেন্ট নিলেন আলফ্রেড। তখন রেওয়াজ নতুন কোন আবিষ্কারের নাম গ্রিক শব্দ দিয়ে রাখার। নোবেলও তার ব্যতিক্রম হলেন না। গ্রিক শব্দ ‘ডুনামিস’ যার অর্থ ‘প্রবল শক্তি’ সেই শব্দকে ভিত্তি করে তার নতুন আবিষ্কারের নাম রাখলেন ডায়নামাইট। ডায়নামাইট যেমন খনি বিস্ফোরণে, বাঁধ নির্মাণে বিপ্লব এনে দিল তেমনি যুদ্ধের মারণাস্ত্র হিসেবে ভয়ঙ্কর আকারে দেখা দিল। আমেরিকান সেনা বাহিনী নোবেলের এই আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে নিজস্ব অস্ত্র তৈরি করল। আর্টিলারি অফিসার এডমন্ড জালিনস্কির নামে প্রথম ডায়নামাইট বন্দুকটি পাঁচ হাজার গজ পর্যন্ত বোমা ছুঁড়তে পারত। ডায়নামাইটের মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার নোবেলকে ভেতর ভেতর ভীষণ অপরাধী করে তুলতে লাগলো।

শেষ জীবনে নোবেল হৃদরোগে ভুগতে শুরু করেন। আর ভাগ্যের কি নিদারুণ পরিহাস চিকিৎসকরা তাঁর বুকের ব্যাথা কমাতে কিনা প্রেসক্রিপশনে লিখলেন ট্রাইনাইট্রিন! রসায়নবিদ নোবেল খুব ভালো করে জানতেন এই ট্রাইনাইট্রিন আসলে মুখোশ আসলে এটি নাইট্রোগ্লিসারিন। নাইট্রোগ্লিসারিন কেবল বিস্ফোরক হিসেবে নয় চিকিৎসাশাস্ত্রে হৃদরোগের চিকিৎসাতেও এটির ব্যবহার আছেআর সেটিও ১৮৭৬ সাল থেকে চিকিৎসক উইলিয়াম মুরেলের হাত ধরে। তিনিই প্রথম অ্যাঞ্জাইনা পেকটোরিস বা চেস্ট পেইন (chest pain) যা ধমনীতে রক্ত প্রবাহ বাধা প্রাপ্ত হলে হয় তার চিকিৎসায় নাইট্রোগ্লিসারিন (NG1) ব্যবহার করেন। এই নাইট্রোগ্লিসারিন ভ্যাসোডাইলেটর (Vasodilator) অর্থাৎ ধমনীকে প্রসারিত করে রক্ত চলাচল অবিচ্ছিন্ন রাখতে সাহায্য করে।

যে নাইট্রোগ্লিসারিন তাঁকে খ্যাতির চূড়ায় বসিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে অগণিত মানুষের মৃত্যুর কারণ করে তুলেছিল জীবন সায়াহ্নে তাঁকে সেই নাইট্রোগ্লিসারিন গলাধঃকরণ করতে হল নিজের জীবন বাঁচাতে !

তথ্যসূত্র


  1. The legacy of Alfred Nobel : the story behind the Nobel prizes: Ragnar Sohlman, Publisher: The Bodley Head, Page - 39

  2. https://www.anandabazar.com/
  3. https://www.nobelprize.org/
  4. https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/
  5. https://en.wikipedia.org/
  6. https://www.popularmechanics.com/
  7. https://www.smithsonianmag.com/

2 comments

আপনার মতামত জানান