ভারতবর্ষে দীর্ঘকাল মুসলিম আধিপত্য ছিল এবং তারা নিজেদের উপাসনার জন্য এবং কখনও আরও নানা কারণে এই দেশের বিভিন্ন অংশে তৈরি করেছিল অসংখ্য মসজিদ। প্রাচীন সেইসব মসজিদের অনেকগুলি আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরোনো দিনের ইতিহাস বুকে ধারণ করে। মালদা জেলার পাণ্ডুয়াতে অবস্থিত আদিনা মসজিদ (Adina Mosque) তেমনই একটি প্রাচীন নিদর্শন। এই মসজিদটি ভারতীয় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ মসজিদ। মূলত বিজয়ের চিহ্নস্বরূপ এই মসজিদের নির্মাণ করা হয়েছিল। বাংলার ইলিয়াস শাহী বংশের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত হয়ে রয়েছে আদিনা মসজিদ। যে পান্ডুয়াতে মসজিদটি অবস্থিত, সেই জায়গাটিরও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। সুলতানী আমলে এই পান্ডুয়া অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী এক বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। এমনকি বাংলা সালতানাতের প্রাক্তন রাজধানীও ছিল এই পান্ডুয়া। এখানকার আদিনা মসজিদটি প্রাচীন বাংলার অনেক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
বাংলার ইলিয়াস শাহী বংশের শাসক ইলিয়াস শাহ ১৩৪২ সালে দিল্লি সালতানাতের থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং স্বাধীন বাংলা সালতানাতের প্রথম শাসক হন। ইলিয়াস শাহেরই পুত্র সিকান্দার শাহ ছিলেন এই বংশের দ্বিতীয় সুলতান। ১৩৫৩ সালে পিতা ও ১৩৫৯ সালে পুত্র দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের সামরিক অভিযানকে প্রতিরোধ করে বাংলার স্বাধীনতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। আমেরিকান ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটনের মতে, সিকান্দার শাহ সফলভাবে তাঁর রাজ্য রক্ষা করেন এবং তাঁর উত্তর ভারতীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা নির্মিত স্থাপত্যগুলির চেয়েও বড় একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে তিনি নিজের বিজয়ের চিহ্ন এবং ক্ষমতার দাবি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। সেই কারণেই সেসময়ের সর্ববৃহৎ মসজিদ এই আদিনা মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন সিকান্দার শাহ, যা ১৩৭৩ সালে শুরু হয়ে ১৩৭৫ সালে সম্পূর্ণ হয়েছিল। কেউ বলেন, ১৩৬৯ সালে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। মসজিদে প্রাপ্ত শিলালিপিতে সিকান্দার শাহকে ‘বিশ্বস্তদের খলিফা’, ‘উন্নত সুলতান’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মসজিদের ভিতরে থাকা সিকান্দার শাহের সমাধিটি মক্কার দিকে মুখ করে স্থাপিত।
আদিনা মসজিদ কিন্তু সাঁওতাল বিদ্রোহেরও সাক্ষী হয়ে রয়েছে। জিতু সাঁওতাল জমিদারদের অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সাঁওতালদের তার অধীনে জড়ো করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে জিতুর নেতৃত্বে সাঁওতালরা আদিনা মসজিদ আক্রমণ করেছিল। কিন্তু জমিদার খান চৌধুরীর সহায়তায় ব্রিটিশ সরকার নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমন করে। জিতু সাঁওতাল-সহ আরও অনেক সাঁওতাল সংঘর্ষে নিহত হয়। মসজিদে এখনও গুলির ছাপ পাওয়া যায়।
আদিনা মসজিদের নির্মাণকে ঘিরে দুটি কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। প্রথমত, মনে করা হয়, যে, সেইসময়ে ভেঙে যাওয়া বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিভিন্ন হিন্দু মন্দির থেকে পাথর এনে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই কারণে মসজিদের মধ্যে নানা জায়গায় হিন্দু নিদর্শন স্পষ্টতই লক্ষ করা যায়।
দ্বিতীয় কিংবদন্তি অনুসারে, এই মসজিদের জায়গায় নাকি ভগবান শিবের মন্দির ছিল, যা আদিনাথ মন্দির নামে পরিচিত ছিল। সেই মন্দির ভেঙে তার ওপরেই নাকি আদিনা মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল। সেই কারণেই অনেক হিন্দু নিদর্শন, যেমন পাথরের স্ল্যাবে গণেশ কিংবা নটরাজের মূর্তি ইত্যাদি দেখা যায় এখানে৷ এমনকি নানারকম পাথরের খোদাইকাজ থেকেও অনেকে অনুমান করেন এটি একটি মন্দির ছিল৷ অনেকে বলেন, আদিনা নামটি আসলে আদিনাথ থেকেই এসেছে। সম্প্রতি বিজেপির এক নেতাও এই মন্দিরের তত্ত্বটিকে সরবে তুলে এনেছেন। তবে যথাযথ ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাবে এই ধরনের দাবির সত্যতা নিয়ে সংশয় রয়েছে যথেষ্ট।
আদিনা মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল এর চোখধাঁধানো স্থাপত্যকর্ম। চতুর্ভুজাকৃতি এই স্থাপত্যটি উত্তর থেকে দক্ষিণে ৫১৬ ফুট এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে ৩১৩ ফুট প্রসারিত। চারদিকে চারটি স্তম্ভসহ পুরু ইঁটের দেওয়াল দ্বারা মসজিটি বেষ্টিত। বাংলা, আরবি, ফার্সি এবং বাইজেন্টাইন স্থাপত্যের সমন্বয় এই মসজিদে লক্ষ করা যায়। দামেস্কের গ্রেট মসজিদের মতো করেই অনেকটা আদিনা মসজিদের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মসজিদটির দেওয়ালগুলির নিম্নাংশ পাথর বাঁধানো তাই তার রঙ ধুসর এবং উপরের অংশগুলি লাল ইঁট দ্বারা নির্মিত। মসজিদের অভ্যন্তরে রয়েছে খোলা একটি প্রাঙ্গন। প্রাঙ্গনের উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণে তিনটি আইলযুক্ত ১২ মিটার চওড়া রিওয়াক এবং পাঁচটি আইলযুক্ত প্রার্থনা কক্ষ রয়েছে। এই প্রার্থনা হলের প্রস্থ ২৪ মিটার। প্রার্থনা কক্ষটিকে বিভক্ত করেছে একটি প্রশস্ত খিলানছাদ দ্বারা আচ্ছাদিত কেন্দ্রীয় ‘নেভ’। এটির আয়তন ২১১০ মিটার এবং এর উচ্চতা ছিল প্রায় ১৮ মিটার, তবে এটি ধ্বসে গিয়েছে। এমন ব্যারেল ভল্ট এই উপমহাদেশের কোন মসজিদে প্রথম নির্মিত হয়েছিল। কাবার দিকের দেওয়াল অর্থাৎ পশ্চিম দেওয়ালে প্রাক-ইসলামিক সাসানীয় স্থাপত্যের নিদর্শন চোখে পড়ে।
আদিনা মসজিদে মোট ২৬০টি স্তম্ভ এবং ৩০০টিরও বেশি গম্বুজ ছিল, যার মধ্যে অনেকগুলিই এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। কেন্দ্রীয় নেভ-এর উত্তরদিকে সাতটি মজবুত স্তম্ভের ওপর পাথরের একটি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে যা সুলতান ও তাঁর সঙ্গীদের প্রার্থনার স্থান হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। প্ল্যাটফর্মটির পশ্চিম দেয়ালের উত্তরদিকে সুলতান ও তাঁর সঙ্গীদের প্রবেশের জন্য দুটি দেউড়ি রয়েছে। মহিলাদের জন্য আবার পৃথক উঁচু একটি গ্যালারির মতো হলওয়ে নির্মিত হয়েছিল। সেখানকার কালো বেসাল্ট পাথরের তিনটি অলঙ্কৃত প্রার্থনা কুলুঙ্গি বা মিহরাব দেখার মতো জিনিস৷ এই কুলুঙ্গিগুলু তুঘরা শিলালিপি দ্বারা অলঙ্কৃত। কেন্দ্রীয় ‘নেভ‘-এর উত্তর পশ্চিম কোণ এবং প্রধান মিহরাবের ডানদিকে রয়েছে চাঁদোয়া শোভিত মিম্বর, যার ধাপগুলির মধ্যে আটটি বর্তমানে বিলুপ্ত। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেওয়ালগুলির সূক্ষ্ম কারুকাজ সেই সময়কার শিল্পীদের দক্ষতারই পরিচায়ক। বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দির নির্মাণের অনেক আগেই আদিনা মসজিদের অভ্যন্তরে টেরাকোটার কারুকাজ হয়েছিল। এছাড়াও বহু জটিল, বিচিত্র জ্যামিতিক নকশায় মসজিদটি অলঙ্কৃত। এমনকি অ-ইসলামীয় কিছু মূর্তি ও নকশার হদিশও পাওয়া যায় মসজিদের গাত্রের পাথরে খোদাই করা। অনেক মূর্তি হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর ছাঁচে গড়া বলেও মনে হয়। প্রবেশদ্বারে পদ্মফুলের মোটিফ দেখা যায় যা হিন্দুধর্মের সঙ্গেই মূলত জড়িত। সব মিলিয়ে আদিনা মসজিদে বিবিধ স্থাপত্যরীতির অপূর্ব এক মেলবন্ধন লক্ষ করা যাবে।
আদিনা মসজিদটি এখন ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত। এটি পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য একটি উৎকৃষ্ট স্থান নিঃসন্দেহে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান