ইতিহাস

আফগান গার্ল

সাল ১৯৮৫। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকার প্রচ্ছদে দেখা গেল জ্বলন্ত চাহনিতে তাকানো এক আফগান কিশোরীকে। বয়ঃসন্ধির পর্যায়ে আসা ঐ কিশোরীর মাথায় লাল স্কার্ফ, সবুজাভ চোখের মণি যেন প্রবল ক্ষুধা আর ক্রোধে ক্যামেরার দিকে নিবিষ্ট। কিছুদিনের মধ্যেই সেই প্রচ্ছদের কিশোরী জনপ্রিয় হয়ে উঠলো বিশ্বের দরবারে ‘আফগান গার্ল’ (Afghan girl) নামে। পাকিস্তানের নাসিরবাগ উদ্বাস্তু শিবিরের সেই পশ্‌তু কিশোরীর নাম শরবত গুলা ওরফে শরবত বিবি। আমেরিকান চিত্রগ্রাহক স্টিভ ম্যাককুরির ক্যামেরায় তোলা সেই ছবিই হয়ে উঠেছিল চর্চার মূল বিষয়। পত্রিকার প্রচ্ছদে ছবি প্রকাশের পর থেকেই চিত্রগ্রাহক এবং সেই কিশোরী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ছবির আড়ালে থাকা উদ্বাস্তুর ভয়, আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতা যেন এক ইতিহাসকে ধরে রেখেছে শুধু ঐ দুটি সবুজ জ্বলন্ত চোখে।

১৯৮৪ সাল নাগাদ আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আক্রমণের ফলে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ বাধে। এই যুদ্ধের আগে থেকেই ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ সংস্থায় চিত্রসাংবাদিক হিসেবে কাজ পান স্টিভ ম্যাককুরি। যুদ্ধের সময়েই পাকিস্তানের উদ্বাস্তু শিবিরের একটি ইসলামি বিদ্যালয় থেকে শরবত গুলার এই বিখ্যাত ছবিটি তোলেন তিনি। বলা হয় এই ছবিটাই চিত্রসাংবাদিক হিসেবে তার তোলা প্রথম ছবি আর ম্যাককুরির কর্মজীবনে এই ছবিই তাঁকে প্রভূত খ্যাতি এনে দেয়। ছবিটি প্রকাশ পায় ১৯৮৫তে আর তার সতেরো বছর পর ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক টেলিভিশন অ্যাণ্ড ফিল্ম-এর সদস্য হয়ে সেই স্টিভ ম্যাককুরি খুঁজতে বেরোন তাঁর ক্যামেরায় তোলা ‘আফগান গার্ল’কে। ২০০২ সালের এপ্রিল মাসে আবার খুঁজে পাওয়া যায় সেই শবরত গুলাকে, তখন তাঁর তিরিশ বছর বয়স। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় আবার একটি প্রচ্ছদ-কাহিনি বেরোয় ‘এ লাইফ রিভিল্ড’ নামে আর সেই লেখাতেই জানা যায় ১৯৮৫তে প্রকাশিত ‘আফগান গার্ল’ ছবির আসল রহস্য।

মাত্র ছয় বছর বয়সেই অনাথ হন শরবত গুলা। আফগানিস্তানে বোমা বিস্ফোরণেই তাঁর মা-বাবা মারা যান এমন একটি তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল যা একেবারেই ভুল। ২০০২ সালের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে শরবত গুলা জানাচ্ছেন, তাঁর মা অ্যাপেণ্ডিসাইটিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে মারা গিয়েছেন এবং পাকিস্তানে অভিবাসিত হওয়ার সময় তাঁর বাবা বেঁচেছিলেন। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় কিশোরী তাঁর ভাইবোন এবং ঠাকুমাকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসেন পাকিস্তানে। একজন আফগান নারী কীভাবে এক আগন্তুক চিত্রগ্রাহকের সামনে তার অবগুণ্ঠন খুলে ছবি তুলতে সম্মত হলেন? সাধারণত কোনো আফগান নারীই এটা করেন না। শরবত গুলা জানাচ্ছেন, প্রাচীনপন্থী পশতু সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হওয়ায় তাঁর পক্ষে একজন পরিবার-বহির্ভূত আগন্তুকের সামনে ছবি তোলা একপ্রকার অসম্ভব ছিল। ছবিটা তোলা হয়েছিল একটি ইসলামি বিদ্যালয়ে। স্টিভ ম্যাককুরি তাঁর শিক্ষককে অনুরোধ করেন শরবত যাতে ছবি তোলায় সহায়তা করেন সে ব্যাপারটি দেখতে আর শিক্ষকের অনুরোধেই স্কার্ফটা মুখ থেকে সরিয়ে একেবারে ক্যামেরার সোজাসুজি তাকিয়ে ছবি তোলেন শরবত গুলা। তারপর সতেরো বছর কেটে গেছে। তার মধ্যে একবারের জন্যেও ‘ আফগান গার্ল ’ হিসেবে তাঁর জনপ্রিয় ছবির ব্যাপারে কোনো তথ্যই তিনি জানতে পারেননি। প্রায় আঠারো হাজার ডলারে তাঁর সেই ২০x২৪ ইঞ্চি আকারের ছবি স্টিভ ম্যাককুরি এবং ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বিক্রি করেছে, আরেকটু বড়ো আকারের ছবি হলে নিলামে তার দাম উঠেছে আকাশছোঁয়া। অথচ সেই টাকার কণামাত্রও পৌঁছায়নি শরবত গুলার কাছে। আর অন্যদিকে নিজের বাড়ি হারিয়ে, আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের সীমানায় ঘুরে ঘুরে বেরিয়েছেন শরবত গুলা সামান্য একটু আশ্রয়ের জন্য। আফগানিস্তান থেকে উৎখাত হয়ে পাকিস্তানে আসার পর বহুদিন যাবৎ ঘর পাননি তিনি।

এই সেই শরবত গুলা যার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আফগান যুদ্ধের সময় উৎখাত হওয়া প্রায় দশ লক্ষ উদ্বাস্তুর কাহিনী। ২০১৬ সালে তাদের মধ্যে তিন লক্ষ সত্তর হাজার উদ্বাস্তু পাকিস্তান থেকে নিজের দেশ আফগানিস্তানে ফিরে আসে। আফগানিস্তান সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে অধ্যক্ষ নাজিব্‌ নান্‌গ্যাল তাঁদের আশ্রয় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই উদ্বাস্তুর ভিড়ের মধ্যে দিয়ে শরবত গুলাও ফিরেছেন তাঁর নিজের দেশে। প্রায় তিরিশটা বছর পাকিস্তানে উদ্বাস্তুর মতো কাটিয়ে দেশে ফিরে প্রায় তিন হাজার বর্গফুটের একটি বাড়ি এবং মাসিক সাতশো ডলার বৃত্তির সহায়ে থিতু হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে দু সপ্তাহ ধরে পুলিশি জেরায় ডিটেনশন ক্যাম্পেও থাকতে হয়েছে তাঁকে। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন আর তাঁর উদ্বাস্তু জীবনের এটাই মোড় ঘোরানো গল্প। ২০১৬ সালের শেষ দিকে ভুয়ো পাকিস্তানি পরিচয়পত্র থাকার অপরাধে পাকিস্তানি পুলিশ গ্রেপ্তার করে তাঁকে। তখনই জানা যায়, শরবত গুলা একা নন, তাঁর মতো আরো দশ লক্ষ আফগানি উদ্বাস্তু ঠিক এভাবেই পাকিস্তানে বৈধ আইনবিধি না মেনে থাকে। আর ঠিক এই ঘটনাতেই নড়ে চড়ে বসে আফগান সরকার এবং সমস্ত আফগানি উদ্বাস্তুদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে থাকে।

অবশেষে ফিরে আসেন শরবত গুলা। স্থিতিশীল জীবনে দুই কন্যাকে অনেক দূর পড়াশোনা করার ইচ্ছা নিয়ে এগোচ্ছেন তিনি, আফগান মেয়েদের কম বয়সেই বাধ্যতামূলকভাবে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হোক চান না তিনি। বয়স বেড়েছে, পঞ্চাশের কোঠায় এসে আজও ভুখা মানুষের কান্নায়, উদ্বাস্তু মিছিলের আর্তনাদে তাঁর ঐ দুই সবুজ চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে, আফগান রমণীর ছবির সেই জ্বলন্ত চাহনিতে লেখা হয়ে থাকে এক করুণ ইতিহাস।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।