ইতিহাস

অমর গোপাল বসু

অমর গোপাল বসু

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অডিও প্রযুক্তি সংস্থা ‘বোস কর্পোরেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান শব্দবিজ্ঞান-প্রযুক্তির এক খ্যাতনামা পথিকৃৎ অমর গোপাল বসু (Amar Gopal Bose)। শব্দ প্রক্ষেপণের প্রযুক্তির জগতে বাঙালি-আমেরিকান উদ্যোগপতি হিসেবে তিনি জগদ্বিখ্যাত। স্পিকার প্রযুক্তি ও সাইকো-অ্যাকোয়াস্টিক্স-এর কারণেই অমর গোপাল বসুর প্রতিষ্ঠিত ‘বোস কর্পোরেশন’ এক মাইলফলক হয়ে আছে সারা বিশ্বে। আজও অডিও সিস্টেমের জগতে ‘বোস’ কোম্পানির যে কোনো শব্দ-প্রক্ষেপক ব্যবস্থা অন্য সব কোম্পানিকে পিছনে ফেলে দেবে। তাঁরই প্রচেষ্টায় বিমানচালকদের জন্য ওয়েভ রেডিও ও শ্রুতিকটু আওয়াজমুক্ত একপ্রকার হেডফোন নির্মিত হয়। বোস সাউণ্ড সিস্টেমের মাধ্যমে যে কোনো কনসার্ট হলের প্রতিটি আসন থেকে দর্শক-শ্রোতারা সমান মাত্রার শব্দ শুনতে সক্ষম হন যা শব্দ-প্রক্ষেপণের দুনিয়ায় এক বিপ্লব বলা চলে। ২০০৭ সালে ‘ফোর্বস’ পত্রিকা তাঁকে বিশ্বের ২৭১তম ধনী ব্যক্তির মর্যাদা দেয়। ২০১১ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী দেখা যায়, তাঁর নীট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি’তে তিনি ২০০১ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছেন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে অমর গোপাল বসু তাঁর প্রতিষ্ঠিত বোস কর্পোরেশনের অধিকাংশ শেয়ার এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে যান। বাঙালি আমেরিকান উদ্যোগপতি এবং শব্দ-প্রকৌশলী হিসেবে তিনি আজও স্মরণীয়।

১৯২৯ সালের ২ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়া শহরে অমর গোপাল বসুর জন্ম হয়। তাঁর বাবা ননী গোপাল বসু একজন ব্রিটিশ-বিরোধী বাঙালি ছিলেন এবং তাঁর মা শার্লোট্রি ছিলেন আমেরিকার একজন স্কুলশিক্ষিকা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়ার সময় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য জেল খেটেছিলেন অমর গোপাল বসুর বাবা ননী গোপাল বসু। ছোটোবেলা থেকেই প্রবল মেধাবী অমর খুব সহজেই কোনো বিষয় বুঝে ফেলতে পারতেন। মাত্র ৭ বছর বয়স থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বেহালা বাজানো শিখেছেন। অমর গোপাল বসুর যখন মাত্র ১৩ বছর বয়স, বিশ্বের মানচিত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে তখন। সেই সময়েই প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়ে যায় তাঁর। পরবর্তীকালে প্রেমা বোসকে বিবাহ করেন তিনি কিন্তু তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। অমর গোপাল বসুর এক পুত্র ভানু ও এক কন্যা মায়া। ভানু বোস পরবর্তীকালে ‘ভানু আইএনসি’ নামক একটি সফটওয়্যার কোম্পানির সিইও পদে অধিষ্ঠিত হন।


বাংলায় শিখুন ওয়েব কন্টেন্ট রাইটিং ও আরও অনেক কিছু

ইন্টার্নশিপ

আগ্রহী হলে ছবিতে ক্লিক করে ফর্ম জমা করুন 


 

এবিংটন সিনিয়র হাই স্কুলে পড়াকালীন অমর ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু একত্রে একটি ‘হোম সার্ভিস’ দল গঠন করে। সেই দলের হয়ে অমর ও তাঁর বন্ধুরা বাড়িতে বাড়িতে নষ্ট হয়ে যাওয়া রেডিও, খেলনা ট্রেন কিছু মূল্যের বিনিময়ে ঠিক করে দিতেন। এভাবেই ইলেকট্রনিক্স বিষয়ের উপর আগ্রহী হন তিনি। বিশ্বযুদ্ধের প্রকোপে তাঁর বাবা ননী গোপালের ব্যবসা খারাপ হয়ে গেলে বাধ্য হয়ে অমরকে কাজে নামতে হয় অর্থ সংস্থানের আশায়। বাবা আর ছেলে মিলে নষ্ট রেডিও সারাইয়ের কাজ করতেন। স্কুলে পড়ার পাশাপাশি এই কাজটাই তাঁকে শব্দ-প্রকৌশলী দুনিয়ার পথিকৃৎ করে তোলে ভবিষ্যতে। একইসঙ্গে অর্থসংস্থানে সুবিধে হওয়ায় তাঁদের পরিবারও অভাবের হাত থেকে রক্ষা পায়। এই সময়েই অমর গোপাল বসু রেডার টিউব ও একটি ট্রান্সফর্মার দিয়ে টেলিভিশন বানিয়ে ফেলেন। ফিলাডেলফিয়াতে একটি ইলেকট্রিক পণ্য সারানোর দোকানে কাজও করতে শুরু করেন অমর গোপাল বসু।

১৯৪৭ সালে ননী গোপাল বসুর উৎসাহে ও প্রেরণায় ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি)-তে শব্দ প্রকৌশলী বিষয়ে পড়ার জন্য ভর্তি হন অমর গোপাল বসু। এই কারণে ননী গোপাল বসু বহু টাকা ঋণও করেছিলেন। এমআইটিতে পড়তে এসে তাঁর কাছে সবথেকে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়ালো ক্যালকুলাস, প্রকৌশলীবিদ্যা যা ছাড়া একেবারেই অচল। হাতে-কলমে ইলেক্ট্রনিক্সের জ্ঞান থাকলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে গবেষণা করা, সন্দর্ভ লেখা এবং ক্লাসে অধ্যাপকদের গুরুগম্ভীর বক্তব্য শুনতে শুনতে মোহিত হয়ে পড়েন তিনি এবং ক্রমেই জ্ঞানপিপাসু এক ছাত্রে পরিণত হন অমর গোপাল বসু। তড়িৎ প্রকৌশল অর্থাৎ ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে ইলেক্ট্রনিক্সে কাজ করার জন্য নেদারল্যাণ্ডসে। এই সময় উচ্চশিক্ষার সুবাদে ফুলব্রাইট বৃত্তি পান তিনি। নেদারল্যান্ডস থেকে আবার ভারতের নয়া দিল্লিতে চলে আসেন অমর গোপাল বসু এবং প্রায়োগিক শিক্ষার কাজ শেষ করে আবার ম্যাসাচুসেটস ফিরে যেতে হয় তাঁকে। বিজ্ঞানী নরবার্ট ওয়েনার এবং ওয়াইকে উইংলির তত্ত্বাবধানে গবেষণা শুরু করেন তিনি। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল নন-লিনিয়ার সিস্টেম। দীর্ঘ নয় বছর এমআইটি-তে পড়াশোনা করে এই শিক্ষাজীবনের পর্বে ইতি টানেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যাডমিন্টন এবং সাঁতারেও বেশ দক্ষ ছিলেন তিনি।

গবেষণা শেষ করার পরে এমআইটি-তেই অধ্যাপনা করার আহ্বান জানায় অমর গোপাল বসুকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শিক্ষকতা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা না থাকলেও এমআইটি-তে শিক্ষকতা করার এই সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেননি। ১৯৫৬ সালে এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার কাজে যোগ দিয়ে ২০০১ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন তিনি। দীর্ঘ ৪৫ বছরের অধ্যাপনার কাজে তিনি কখনোই ধরা-বাঁধা ফর্মুলা শেখাতে চাইতেন না। বরং নানা ধরনের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করার শিক্ষা দিতেন তিনি। সমস্যা সমাধানের জন্য কী কী পদ্ধতি অবলম্বন করা যায় তা বের করার শিক্ষা দিতেন তিনি। তাঁর ক্লাসে অন্য বহু বিভাগের শিক্ষার্থীরাও অংশ নিতেন। কোনো কোনো সময় শিক্ষকেরাও তাঁর ক্লাসে যোগ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। একবার বাজারের সবথেকে ভালো একটি স্পিকারের সাহায্যে পছন্দের ধ্রুপদী সঙ্গীত শোনার সময় তিনি উপলব্ধি করেন যে সামনে থেকে সেই শব্দ শুনতে যত আনন্দ হচ্ছে, তা একটু দূরে গেলেই আর সেভাবে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না। শব্দ প্রকৌশলী বিদ্যায় এই ঘটনার ফলেই তাঁর আগ্রহ উত্তরোত্তর আড়তেই থাকে। অমর গোপাল বসু পর্যবেক্ষণ করেন যে বিশাল এক হলঘরে মঞ্চ থেকে নির্গত মূল শব্দের মাত্র ২০ শতাংশ শুনতে পান একজন শ্রোতা আর বাকি ৮০ শতাংশই আসে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে। এই কারণেই ‘সাইকো-অ্যাকোয়াস্টিক’ শাখার জন্ম হয়। এই বিষয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করে অমর বসু একটি নতুন প্রযুক্তির স্পিকার নির্মাণ করেন। তাঁর নির্মিত ২২০১ স্পিকারই ছিল প্রথম ডিরেক্ট বা রিফ্লেক্টিং স্পিকার। অমর গোপাল বসুর গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক উইংলির পরামর্শে ১৯৬৪ সালে অমর গোপাল বসু বাণিজ্যিকভাবে এই নতুন প্রযুক্তির বিপণন করার জন্য নিজের একটি সংস্থা খোলেন ‘বোস কর্পোরেশন’ নামে। এই সংস্থা থেকে এমন এক স্পিকার তৈরি করেন বসু যাতে একইসঙ্গে একটি সক্রিয় ইকুয়ালাইজারের পাশাপাশি উফার ও টুইটার উপস্থিত ছিল যার ফলে দুটি স্পিকার ঘরের দুই কোনায় লাগিয়ে দিলে কনসার্ট হলের আমেজ পাওয়া যেতো। তারপর থেকেই ‘বোস কর্পোরেশন’ স্পিকার ও শব্দ-প্রক্ষেপক প্রযুক্তির দুনিয়ায় একমেবাদ্বিতীয়ম হয়ে ওঠে। বোস কর্পোরেশনের প্রথম কর্মচারী ছিলেন এমআইটি-তে পাঠরত অমর গোপাল বসুরই এক সুযোগ্য ছাত্র শেরউইন গ্রিনব্ল্যাট যিনি ১৯৮৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সংস্থার সভাপতি পদে আসীন ছিলেন। ১৯৬৮ সালে বাজারে আসা বোসের ৯০১ ডাইরেক্ট বা রিফ্লেক্টিং স্পিকার সিস্টেম বহু বছর যাবৎ আমেরিকার বাজারে জনপ্রিয় স্পিকারের জায়গায় ছিল। এটি ২২০১ স্পিকারের বিবর্তিত রূপ বলা চলে। পরবর্তীকালে ‘জ্যাকব’ নামে এক ছাত্রের তৈরি সফটওয়্যারের সাহায্যে তিনি তৈরি করেন ‘বোস অডিশনার প্রোগ্রাম’ যার দ্বারা হলের প্রতিটি প্রান্তের দর্শক-শ্রোতাকে একই মাত্রার শব্দ শোনানো যাবে। এই প্রযুক্তি গৃহীত হয়েছে লস এঞ্জেলস শহরের স্টেপলস শহরে, ভ্যাটিকান সিটির সিস্টিন চ্যাপেলে এবং সৌদি আরবের মক্কা নগরের অন্তর্ভুক্ত মসজিদ আল-হারামে। এছাড়াও বিমানচালকদের জন্য ওয়েভ রেডিও ও শ্রুতিকটু আওয়াজমুক্ত একপ্রকার হেডফোন নির্মিত হয় এই সংস্থার পক্ষ থেকে। ১৯৮২ সালে বিখ্যাত কিছু গাড়ি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে তিনি গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট করে একটি অডিও সিস্টেম বানান।

শুধুই শব্দ-প্রক্ষেপণ প্রযুক্তি নয়, গাড়ির মোটর ডিজাইনের ক্ষেত্রে অমর গোপাল বসু নির্মাণ করেন ‘বোস শক এবজরভার সিস্টেম’। বিখ্যাত দুটি গাড়ির কোম্পানি পোর্শে এবং মার্সিডিজে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। এই প্রযুক্তির সাহায্যে গাড়ির মধ্যে ঝাঁকুনির মাত্রা কমানো যায়। তাঁর কোম্পানি ‘বোস কর্পোরেশন’কে কোনোদিনই পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করেননি। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে এই কোম্পানির মালিকানা অংশের কয়েক অংশ তিনি দান করে যান এমআইটি-কে। তাঁর সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের একপাক্ষিক শর্ত ছিল এই যে, এমআইটি কেবলমাত্র কোম্পানির মুনাফার অংশীদার হবে। সমগ্র বিশ্ব জুড়েই বোস কর্পোরেশনের বহু শাখা খুলেছে। ২০০৭ সালে ‘ফোর্বস’ পত্রিকা তাঁকে বিশ্বের ২৭১তম ধনী ব্যক্তির মর্যাদা দেয়। ২০১১ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী দেখা যায়, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি মার্কিন ডলার।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


২০১৩ সালের ১২ জুলাই ৮৩ বছর বয়সে অমর গোপাল বসুর মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু আজও এক ঘনীভূত রহস্য



সেই রহস্য নিয়ে বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন