সববাংলায়

অনন্ত প্রসাদ শর্মা

ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এমন একেকজন ব্যক্তি আছেন, মানুষের মনে যাঁদের উপস্থিতি খুব উজ্জ্বল নয়, অথচ ভারতবর্ষের রাজনীতিতে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। অনন্ত প্রসাদ শর্মা (Ananta Prasad Sharma) তেমনই একজন রাজনীতিবিদ। একসময় স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বদল ঘটেছিল মূলত দেশ স্বাধীন হবার পরেই। ভারতীয় রেল ইউনিয়নের একজন নামজাদা নেতা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, রাজ্যপাল ইত্যাদি প্রশাসনিক স্তরের বিভিন্ন উচ্চপদের দায়িত্ব সামলেছেন দক্ষতার সঙ্গে। জওহরলাল নেহরুর আহ্বানে রাজনীতির বিরাট ক্ষেত্রে তাঁর উজ্জ্বল আবির্ভাব ঘটেছিল। ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস অনুসন্ধান করলেই তাঁর সুদক্ষ পরিচালন ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যাবে।

১৯১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিহারের শাহাবাদ জেলার (বর্তমানে ভোজপুর জেলা) শাহপুরের নিকটবর্তী গাওদাড় (Gaudarh) নামক একটি ছোট গ্রামে অনন্ত প্রসাদ শর্মার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রাম নরেশ শর্মা । একটি অত্যন্ত নম্র এবং বিনয়ী পরিবারে জন্ম হয় অনন্ত প্রসাদের। পরবর্তীকালে তারা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। তাঁদের দুই পুত্র এবং চারটি কন্যাসন্তান জন্মায়। অনন্ত প্রসাদের বড় ছেলে হৃদয় নারায়ণ শর্মা রেলের একজন উচ্চপদস্থ অফিসার। রাজীব গান্ধী ১৯৯০ সালে হৃদয় নারায়ণকে বিহার রাজ্যের সংসদীয় নির্বাচনে ডুমরাঁও থেকে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান করেছিলেন। হৃদয় নারায়ণ শর্মা এবং তাঁর পরিবার বর্তমানে দিল্লীতে বসবাস করেন।

আরার টাউন স্কুল, শাহপুরপট্টির গভর্নমেন্ট মিডল স্কুল এবং আসানসোলের ডি.এ.ভি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল (D.A.V HS School) থেকে বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা সমাপ্ত করেন অনন্ত প্রসাদ শর্মা। পরবর্তীকালে পাটনা জেলার বিহার ন্যাশনাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন স্নাতক স্তরের পড়াশুনা করে ডিগ্রি অর্জনের জন্য। কিন্তু কলেজে পড়াকালীন তিনি ভীষণ সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং তখন স্নাতকের পড়াশুনা মাঝপথেই ছেড়ে দেন। কলেজে থাকাকালীন তিনি সর্বভারতীয় ছাত্র ফেডারেশনের (All India Students Federation) বিহার ইউনিটের সহকারী সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়তে শুরু করেছিল। 

১৯৪৯ সাল থেকে অনন্ত প্রসাদ ন্যাশানাল ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান রেলওয়েমেনের (পূর্বে ছিল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ফেডারেশন) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কেবল মধ্যিখানে তিনবছর তিনি এই ফেডারেশনের সহ-সভাপতি এবং সহকারী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছিলেন। ১৯৫১ সাল থেকে তিনি পূর্ব রেলওয়েমেনস কংগ্রেস, দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়েমেনস কংগ্রেস, পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ে শাখার রেলওয়ে শ্রমিকদের ইউনিয়নের সভাপতির পদে বহাল ছিলেন। ১৯৫৪ সাল থেকে পূর্ব রেলওয়ে শাখার প্রেস ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতির পদও অলঙ্কৃত করেছেন অনন্ত প্রসাদ। ট্রেড ইউনিয়নের একজন প্রভাবশালী নেতা হওয়ার দরুন তাঁকে জওহরলাল নেহেরু বিহারের বক্সার অঞ্চল থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েই রাজনীতির বৃহৎ ক্ষেত্রে পদার্পণ করেছিলেন তিনি। সেই নির্বাচনে ১৯৬২ সালে এবং পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালে জয়লাভ করে অনন্ত প্রসাদ তৃতীয় এবং পঞ্চম লোকসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এছাড়াও মোট তিনবার অর্থাৎ ১৯৬৮-১৯৭১, ১৯৭৮-১৯৮৩ এবং ১৯৮৪-১৯৮৮ সময়কালে তিনি রাজ্যসভার সদস্যপদে বহাল ছিলেন। ১৯৬৬ সালের জুলাই মাসে তিনি বিহার প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির (Pradesh Congress Committee বা PCC) সভাপতির পদে বসেছিলেন। ১৯৭০ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত তিনি বিশেষ আমন্ত্রিত স্থায়ী সদস্য হিসেবে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রীত্বে অনন্ত প্রসাদ ভারত সরকারের শিল্প প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিলেন ১৯৭৪ সালে। পরবর্তীকালে তিনি ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়ে যোগাযোগ, পরিবহন, জাহাজ এবং বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়েরদায়িত্ব সামলেছিলেন দক্ষতার সঙ্গে। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি যোগাযোগ মন্ত্রীর পদে বহাল ছিলেন। ১৯৮৩ সালেই অনন্ত প্রসাদ শর্মা পাঞ্জাব এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বিতর্কিত রাজ্যপালদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তখন রাজ্যে বামশাসন। রাজনীতির অদ্ভুত একটা সময়ে এক স্বাধীনতা দিবসের দিন অনন্ত প্রসাদ নিজের রাজ্যপালের পদ থেকে ইস্তফা গ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৮৩ সালের ১০ই অক্টোবর থেকে ১৯৮৪ সালের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর পদত্যাগের পর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সতীশচন্দ্র ভারপ্রাপ্ত রাজ্যপাল হিসেবে বহাল হয়েছিলেন। বামরাজত্বে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল থাকাকালীন অনন্ত প্রসাদ চেষ্টা করেছিলেন রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বাম নেতৃত্বদের পছন্দমতো উপাচার্য নিয়োগের অবিরাম প্রচেষ্টাকে ক্রমাগত বাধা দিতে। অনন্ত প্রসাদের এই পদক্ষেপ তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের এক বিতর্কিত রাজ্যপালে পরিণত করেছিল। 

অনন্ত প্রসাদ শর্মা আরও অনেক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৬৫-৬৬ সালে তিনি সংসদে কংগ্রেস পার্টির কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। ১৯৭০ সালে পাটনার অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির (A.I.C.C) অভ্যর্থনা কমিটির সদস্য ছিলেন অনন্ত প্রসাদ। এছাড়াও ক্ষুদ্র সঞ্চয় জাতীয় কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা বোর্ড (Small Savings National Central Advisory Board), ভারতীয় জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের (INTUC) ওয়ার্কিং কমিটি, হুইটলি কাউন্সিল, পন্ডিচেরীর অরবিন্দ আশ্রম (সোসাইটি),  প্রভৃতি জায়গায় সদস্যপদ অলঙ্কৃত করেছেন তিনি। আরও যেসমস্ত প্রতিষ্ঠানের এবং কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছিলেন অনন্ত প্রসাদ, সেগুলি হল, অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল অব টেকনিক্যাল এডুকেশন (All India Council of Technical Education), রেলওয়ে বোর্ড কর্তৃক স্থাপিত চতুর্থ শ্রেণীর প্রচার কমিটি, তৃতীয় লোকসভা চলাকালীন সংসদের রেলওয়ে কনভেনশন কমিটি (১৯৬৪), ১৯৬৬ এর অ্যালার্ম চেইন পুলিং এবং টিকিটবিহীন ভ্রমণ প্রতিরোধ কমিটি, জাতীয় শ্রম কমিশনের পূর্ব শাখার স্টাডি গ্রুপ ফর ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস এবং সেই কমিশনেরই স্টাডি গ্রুপ অন রেল ট্রান্সপোর্ট ইত্যাদি। ১৯৭১ সালে তিনি পিটিশন সংক্রান্ত কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলেন। 

কর্মসূত্রে অনন্ত প্রসাদ বিদেশ ভ্রমণও করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে  জেনেভাতে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনে (International Labor Organization) ভারতীয় শ্রম এবং শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালের জুন মাসে এই সংস্থারই সুবর্ণ জয়ন্তীতে তিনি পুনরায় ভারতীয় শ্রমের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৭০ সালে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়াতে ভারতীয় সংসদীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৭০ সালেরই জুলাই মাসে বাগদাদে অনুষ্ঠিত ইরাকি বিপ্লবের বার্ষিক উদযাপনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন অনন্ত প্রসাদ। ১৯৭০ সালে জাতিসংঘের (U.N.O) রজত জয়ন্তীতে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির ছিলেন তিনি। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, লিবিয়ায় দুই সদস্যের গুডউইল মিশনের একজন সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালে সেরাজেভোতে দ্বিতীয় সেল্ফ ম্যানেজারস কংগ্রেস এবং  সর্বোচ্চ ট্রেড ইউনিয়নের গোল টেবিল কনফারেন্সে ভারতীয় জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের  (INTUC) প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন অনন্ত প্রসাদ শর্মা। এছাড়াও সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, জিব্রালটার, আদেন, আমেরিকা, জার্মানি, মিশরের মতো দেশেও তিনি পাড়ি দিয়েছেন কাজের সূত্রেই। 

ভারত সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদে বহাল থেকেও কখনও ট্রেড ইউনিয়নের কাজকর্মের প্রতি উদাসীন থাকেননি। সর্বদা ওই ক্ষেত্রে নিজের আগ্রহ দেখিয়েছেন। এরকম ব্যস্ত একজন রাজনীতিবিদ অনন্ত প্রসাদ শর্মার শখ ছিল মূলত বই পড়ার। ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত বইপত্র মূলত গান্ধীবাদী ট্রেড ইউনিয়নের ওপর লেখা বই তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এমনকি ব্যাডমিন্টন, ভলিবল এবং বাস্কেটবলের মতো খেলাধুলাতেও আগ্রহ কম ছিল না অনন্ত প্রসাদ শর্মার। মূলত প্রার্থনায় ডুবে থেকে এবং ধর্মীয় বক্তৃতা শুনে অবসর সময় কাটাতেন তিনি।

১৯৮৮ সালের অক্টোবর মাসে, ৬৮ বছর বয়সে এই সুদক্ষ, সুপরিচালক এবং প্রতিভাশালী ও একইসঙ্গে বিতর্কিত এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ত্ব অনন্ত প্রসাদ শর্মার মৃত্যু হয়। 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading