সববাংলায়

আন্দ্রে আগাসি

একজন বিখ্যাত আমেরিকান পেশাদার টেনিস খেলোয়াড় আন্দ্রে আগাসি (Andre Agassi) আটটি গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম পুরস্কার প্রাপক হিসেবেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া জগতে বিখ্যাত। ১৯৯৬ সালে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয় করেছেন তিনি। তিনিই প্রথম চারবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন সিঙ্গেলসে জয়লাভ করেন। তিনটি পৃথক পৃথক সমতলের টেনিস খেলায় আগাসিই প্রথম চারটি প্রধান সিঙ্গেলসেই জয়লাভ করেন। প্রথম আমেরিকান টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে ফ্রেঞ্চ ওপেনে জয়লাভের কৃতিত্বও রয়েছে তাঁর মুকুটে। ১৯৯৫ সালে প্রথম বার আন্দ্রে আগাসি বিশ্বের ১ নং খেলোয়াড়ের মর্যাদায় ভূষিত হন। কিন্তু ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার কারণে এই খ্যাতি ধরে রাখতে না পারলেও ১৯৯৯ সালে পুনরায় একই শিরোপা অর্জন করেন তিনি। ‘দ্য পানিশার’ নামেই ক্রীড়া জগতে সমধিক পরিচিত তিনি। ২০০৬ সালে ক্রীড়া জগত থেকে অবসর নেওয়ার পরে আগাসি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আন্দ্রে আগাসি চ্যারিটেবল ফাউণ্ডেশন’ আর এই সংস্থার উদ্যোগেই ২০০১ সালে লাস ভেগাসে স্থাপিত হয় ‘আন্দ্রে আগাসি কলেজ প্রিপারেটরি অ্যাকাডেমি’।

১৯৭০ সালের ২৯ এপ্রিল লাস ভেগাসের নেভাদা শহরে আন্দ্রে আগাসির জন্ম হয়। তাঁর বাবা ইমানুয়েল মাইক আগাসি ইরানের প্রাক্তন অলিম্পিক কুস্তিগির ছিলেন এবং তাঁর মা এলিজাবেথ বেটি আগাসি ছিলেন একজন আমেরিকান। তাঁর ঠাকুরদা ডেভিড তাঁদের মূল পদবি আগাসিয়ান থেকে বদলে ‘আগাসি’ রাখেন। আন্দ্রে আগাসির পুরো নাম ছিল আন্দ্রে কির্ক আগাসি। বলা হয় ১৯৬৩ সালে তাঁর বাবা যখন লাস ভেগাসের একটি হোটেলে বেয়ারার কাজ করতেন, সেই সময় আর্মেনীয়-আমেরিকান খেলোয়াড় কির্ক কের্কোরিয়ানের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। ইমানুয়েল কির্কের নামানুসারেই তাঁর সন্তান আন্দ্রে আগাসির নামের মধ্যনাম হিসেবে জুড়ে দিয়েছিলেন ‘কির্ক’ কথাটি। আগাসি ছাড়াও ইমানুয়েল এবং এলিজাবেথের আরও তিন সন্তান ছিল – রিটা, ফিলিপ এবং টামি। ১২ বছর বয়সে আগাসি এবং তাঁর ক্রীড়াসঙ্গী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু রোডি পার্ক্স ১৯৮২ সালে একত্রে শিকাগোর ন্যাশনাল ইনডোর বয়েজ ফর্টিন্স ডাবলস চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। ১৩ বছর বয়সে তাঁকে ফ্লোরিডার নিক বলিটেরির টেনিস অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে দেওয়া হয়। মাত্র তিন মাসই তিনি সেখানে থাকতে পেরেছিলেন, তাঁর বাবার এর থেকে বেশি অর্থ সংস্থানের সামর্থ্য ছিল না। মাত্র তিরিশ মিনিট আগাসির খেলা দেখেই বলিটেরি অত্যন্ত মুগ্ধ হন। সেই বছরই নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে স্কুল ত্যাগ করে পূর্ণ সময়ের জন্য টেনিস খেলতে শুরু করেন আন্দ্রে আগাসি। পরবর্তীকালে ১৯৯৭ সালে ব্রুক শিল্ডসকে বিয়ে করেন আগাসি কিন্তু ১৯৯৯ সালেই সে বিয়ে ভেঙে গেলে ২০০১ সালে তিনি স্টেফি গ্রাফকে বিয়ে করেন পুনর্বার। স্টেফি এবং আগাসির দুই সন্তান যথাক্রমে জ্যাডেন গিল এবং জ্যাজ এলি।

মাত্র ১৬ বছর বয়স থেকেই পেশাদার টেনিস খেলার জগতে পা রাখেন আগাসি এবং ক্যালিফোর্ণিয়ার লা কুইন্তায় প্রথম টুর্নামেন্ট খেল জয়লাভ করেন। ১৯৮৬ সালের শেষ দিকে আগাসি ৯১ র‍্যাঙ্ক করেন এবং ১৯৮৭ সালে সুল আমেরিকান ওপেনেও জয়লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে ছয়টি অতিরিক্ত টুর্নামেন্ট জয়ের খেতাব অর্জন করেন আগাসি। ঐ বছরই ডিসেম্বর মাসের শেষে মোট ৪৩টি টুর্নামেন্ট খেলা শেষ করে তাঁর ক্রীড়াজীবনে প্রথম পুরস্কার মূল্য হিসেবে দশ লক্ষ ডলার অর্জন করতে সক্ষম হন। তাঁর মতো এত দ্রুত এতগুলি টুর্নামেন্ট খেলার কৃতিত্ব ইতিহাসে কারও নেই। ১৯৮৮ সালের শেষ দিকে তিনি ৩ নং র‍্যাঙ্কে ছিলেন এবং ঐ বছরের ‘টেনিস’ পত্রিকা তাঁকে সবথেকে দ্রুত উন্নতির চূড়ায় উঠে আসা খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচন করে। ক্রীড়া জীবনের প্রথম আট বছর তিনি অস্ট্রেলিয়ান ওপেন খেলেননি শুধুমাত্র তাঁদের বাধ্যতামূলক সাদা পোশাকের কারণে। ১৯৮৮ সালেই ফ্রেঞ্চ ওপেন এবং ইউএস ওপেনের সেমি-ফাইনালে জয়লাভ করেন আগাসি। ১৯৯০ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেনে তিনি প্রথম গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম জেতেন এবং ঐ বছরই ইউএস ওপেনে দ্বিতীয় গ্র্যাণ্ড স্ল্যামের খেতাব জয় করেন আগাসি। কিন্তু ইউএস ওপেনে সাম্প্র্যাসের কাছে ফাইনালে পরাজিত হন তিনি। পরবর্তী দশ বছর টেনিসের জগতে সাম্প্র্যাস এবং আগাসির যুযুধান বিরোধিতার সাক্ষী থেকেছে আপামর টেনিস দর্শক। ১৯৯০ সালে আমেরিকার হয়ে প্রথম ডেভিস কাপ জেতেন আগাসি এবং টেনিস মাস্টার্স কাপও জিতে নেন তিনি ঐ খেলাতেই। ১৯৯১ সালে দ্বিতীয়বার ফ্রেঞ্চ ওপেন খেলায় প্রতিপক্ষ হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন বলিটেরি অ্যাকাডেমিতে তাঁর এককালের ক্রীড়াসঙ্গী জিম কুরিয়ারকে। ঐ বছরই সমস্ত ছুঁতমার্গ ভুলে উইম্বলডনের টুর্নামেন্টে খেলতে নামেন আগাসি, কিন্তু পাঁচটি সেটের খেলায় ফাইনালে ডেভিড হুইটনের কাছে পরাজিত হন। ১৯৯২ সালে উইম্বলডনের দুই প্রাক্তন চ্যাম্পিয়ন বরিস বেকার এবং জন ম্যাকেনরোকে হারিয়ে বিবিসি ওভারসিজ স্পোর্টস পার্সোনালিটি অফ দ্য ইয়ারের খেতাব জিতে নেন আন্দ্রে আগাসি। ঐ বছরই ওকলে ব্র্যাণ্ডের সানগ্লাস পড়ে মাঠে টেনিস খেলতে নামেন আগাসি আর তাঁর সেই ছবি ‘টেনিস’ পত্রিকার প্রচ্ছদে ছাপা হয়। ১৯৯৩ সালে সিনসিনাত্তি মাস্টার্সের একমাত্র ডাবলসে জিতে রেকর্ড করেন আগাসি। ১৯৯৪ সালে মাইকেল স্টিচকে হারিয়ে ইউএস ওপেন খেলায় গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম জয় করেন তিনি। এর পরের বছরই জীবনে প্রথমবার ১৯৯৫ সালের অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে জিতে বিশ্বের ১ নং টেনিস খেলোয়াড়ের মর্যাদা পান তিনি। ১৯৯৬ সালের আটলান্টা অলিম্পিকে টেনিস খেলার জিতে স্বর্ণপদক অর্জন করেন আগাসি। কিন্তু ১৯৯৭ সালে হাতের কব্জির আঘাতের কারণে মাত্র ২৪টি ম্যাচ খেলায় তাঁর র‍্যাঙ্ক ১ নং থেকে কমে ১৪১ নং-এ নেমে আসে। ১৯৯৮ সালে আবার ঘুরে দাঁড়ান আগাসি আর ১৯৯৯ সালে পরপর দুটি গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম পুরস্কার জেতেন। ২০০০, ২০০১ এবং ২০০৩ সালে মোট তিনবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন টুর্নামেন্টে জয়লাভ করেন আন্দ্রে আগাসি। ২০০৩ সালের অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেই তাঁর ক্রীড়া জীবনের শেষতম গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম পুরস্কারটি জেতেন আগাসি। ২০০৬ সালে ক্রীড়া জগত থেকে অবসর নেন তিনি। খেলার জগতে ‘দ্য পানিশার’ ডাকনামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন তিনি। তাঁর সমগ্র ক্রীড়া জীবনে মোট ৩ কোটি ডলারেরও বেশি উপার্জন করেন আগাসি পুরস্কার মূল্য হিসেবে এবং তার পাশাপাশি বিজ্ঞাপনী জগত থেকেও তাঁর উপার্জন কম বেশি ২.৫ কোটি ডলার। উপার্জনের দিক থেকে টেনিসের জগতে তাঁকে চতুর্থ স্থানে রাখা হয় সবসময়।

খেলা থেকে অবসর নেওয়ার পরেও বেশ কিছু চ্যারিটি টুর্নামেন্ট খেলেছেন তিনি। ২০০৯ সালে ফিলাডেলফিয়া ফ্রিডমের হয়ে ওয়ার্ল্ড টিম টেনিস টুর্নামেন্টে খেলন আন্দ্রে আগাসি। এছাড়া ঐ বছরই আমেরিকার ক্যান্সার ত্রুটমেন্ট সেন্টারস টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন তিনি। ২০১২ সাল পাঁচটি টুর্নামেন্টে অংশ নেন তিনি যার মধ্যে তিনটি ম্যাচেই জয়লাভ করেন। ২০০৯ সালে মাকাওতে একটি ম্যাচে সাম্প্র্যাস এবং আগাসির দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ ঘটে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আয়োজিত ‘হিট ফর হাইতি’ চ্যারিটি অনুষ্ঠানে আগাসি, সাম্প্র্যাসের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন রজার ফেডেরার এবং রাফায়েল নাদাল। এই সময়েই উত্তেজনাপ্রবণ রসিকতা করার জন্য আগাসিকে প্রকাশ্যে আঘাত করেন সাম্প্র্যাস যা দ্রুত খবরের পাতায় ছাপা হয়ে যায় শিরোনামে। পরে আগাসি প্রকাশ্যে সাম্প্র্যাসকে নিয়ে রসিকতা করার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেন। ২০১৪ সালে বিশ্ব টেনিস দিবস উপলক্ষে লণ্ডনে আয়োজিত একটি ম্যাচে সাম্প্র্যাসকে দুটি সেটে পরাজিত করেন আন্দ্রে আগাসি।

১৯৯৪ সালে আগাসি গড়ে তোলেন ‘আন্দ্রে আগাসি চ্যারিটেবল ফাউণ্ডেশন’ যার উদ্যোগে ২০০১ সালে লাস ভেগাসে গড়ে তোলা হয় ‘আন্দ্রে আগাসি কলেজ প্রিপারেটরি অ্যাকাডেমি’। এই প্রতিষ্ঠানে নিজের ৩.৫ কোটি ডলার দান করেছিলেন তিনি শুধুমাত্র দুঃস্থ ও দুর্গত শিশুদের পড়ানোর জন্য।    

২০০৯ সালে তাঁর লেখা আত্মজীবনী ‘ওপেন : অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ প্রকাশ পায়।

২০১০ সালে ‘স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড’ পত্রিকার সমীক্ষায় সপ্তম শ্রেষ্ঠ টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হন আন্দ্রে আগাসি। ২০১১ সালে রোড আইল্যাণ্ডে তাঁকে আন্তর্জাতিক টেনিস হল অফ ফেম সম্মানে ভূষিত করা হয়। মোট আটটি গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্ট জয়ের শিরোপা রয়েছে তাঁর মুকুটে।  

চ্যারিটেবল ফাউণ্ডেশন এবং আরো বিবিধ জনহিতকর কাজের মধ্যে বর্তমানে আন্দ্রে আগাসি নিয়োজিত আছেন।      


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading