ইতিহাস

হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা

হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা (Homi Jehangir Bhabha) একজন পরমাণু বিজ্ঞানী যাঁকে ভারতবর্ষের পরমানু চর্চার জনক বলা হয়৷  হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা ভারতবর্ষে পরমাণু  চর্চার প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক, পথপ্রদর্শক ছিলেন। তিনি ‘টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ’ -এ পদার্থবিদ্যায় অধ্যাপনা করেছেন। তিনি একাধারে পরমানু শক্তি সংস্থাপন কেন্দ্র(বর্তমান ‘ভাবা এটমিক রিসার্চ সেন্টার BARC)এর প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন৷  ‘টি আই এফ আর’ (Tata Institute of Fundamental Research ) এবং ‘এ.ই.ই.টি’ ( Atomic Energy Establishment. Trombay )এর ডিরেক্টর ছিলেন তিনি। পদার্থবিজ্ঞানে  নোবেল পুরস্কারেরর জন্য  হোমি ভাবা ১৯৫১, ১৯৫৩, ১৯৫৪,১৯৫৫ এবং ১৯৫৬ সালে মনোনীত হয়েও শেষ পর্যন্ত পুরস্কৃত হননি৷ ভারতবর্ষের পরমাণুচর্চায় তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শুধুমাত্র নিজের দেশেই নয়, হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা আন্তর্জাতিক মহলেও পরমাণু চর্চার জন্য  স্বীকৃতি  পেয়েছিলেন। 

হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার  ১৯০৯ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রিটিশ অধীনস্থ বোম্বে বা বর্তমান মুম্বাইতে জন্ম হয়। জাহাঙ্গীর ভাবা অর্থবান পারসি পরিবারের সন্তান ছিলেন৷ তাঁর বাবা জাহাঙ্গীর হোরমুসজি ভাবা একজন নামকরা পারসি আইনজীবি ছিলেন। ভাবার মায়ের নাম মেহেরেন৷ জাহাঙ্গীরের পরিবার যথেষ্ট প্রভাবশালী, বিত্তশালী, সুশিক্ষিত ছিল৷ খুব  ছোটবেলা থেকেই ভাবা শিক্ষিত পরিবেশে বড় হয়েছিলেন।   

ভাবার স্কুল শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় ‘ক্যাথ্রিডাল’ অ্যান্ড জন কোনন’  স্কুল থেকে। স্কুল শিক্ষা শেষের পর তিনি অনার্স  নিয়ে সিনিয়ার  কেমব্রিজ পরীক্ষা পাশ করবার পর পনেরো বছর বয়সে ‘এলফিনস্টোন’  কলেজে ভর্তি হন৷ ভাবা এরপর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাইয়াস কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে, বাবা এবং কাকা  ডোরাবজি টাটার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে  ১৯২৭ সালে ‘রয়্যাল  ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স’- এ যোগ দেন। ভাবার বাবা এবং কাকার ইচ্ছা ছিল ভাবা আগে কেমব্রিজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী অর্জন করুন তারপর নাহয় ভারতে ফিরে এসে জামশেদপুরের টাটা স্টিলে ধাতুবিদ বিশেষজ্ঞ হিসেবে যোগদান  করবেন৷ ভাবার বাবা ছেলের অঙ্কের প্রতি তীব্র আকর্ষণ রয়েছে বুঝতে পেরেছিলেন।  তিনি এবং তাঁর স্ত্রী ভাবাকে শর্ত দেন ভাবা যদি ট্রাইপোস পরীক্ষায় মেকানিক্যাল  সায়েন্সে ১৯৩০ সালের জুন মাসে প্রথম শ্রেণির ডিগ্রি নিয়ে পাশ করতে পারেন তাহলে তাঁরা ভাবা যতদূর পড়তে চান তার খরচ বহন করবেন। ভাবা   ট্রাইপোস পড়বার সময় পল ডির‍্যাকের অধীনে গণিত অধ্যায়নে দক্ষতা অর্জন করেন। এরপর তিনি ক্যাভেনডিশ ল্যাবরেটরিতে পদার্থবিদ হিসেবে গবেষণার কাজ শিখতে  শুরু করেন। এই গবেষণাগারে বেশ কয়েকটি  যুগান্তরকারী  বৈজ্ঞানিক কাজ চলছিল। এই চেম্বারে থেকে খুব  কাছ থেকে এই গবেষণা সংক্রান্ত কাজ দেখেছিলেন ভাবা।অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়  নিয়ে তাঁর  সমসাময়িক নামকরা বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালাচ্ছিলেন, যার প্রভাব ভাবার কাজের সাথে মিশে যায়৷ পরবর্তী সময়ে তিনি  ১৯৩১—১৯৩২ সালে সলোমন স্টুডেন্টশিপ পান।  ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে  ১৯৩২ সালে প্রথম শ্রেণি নিয়ে ম্যাথামেটিকাল ট্রাইপোস পরীক্ষায় পাশ করেন। তিনি অঙ্কে রউস বল ট্রাভেলিং স্টুডেন্টশিপ পান। এরপর তিনি পদার্থবিদ্যার পরমাণু, বিকিরণ রশ্মির মতন বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন৷  

ভাবা তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন বহুচর্চিত তাঁর প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা পত্র “The Absorption of   Cosmic radiation” প্রকাশের মাধ্যমে৷ ভাবা পারমাণবিক পদার্থবিদ্যায় (Nuclear Physics )ডক্টরেট ড্রিগ্রী অর্জন করেন ১৯৩৩ সালে৷ তাঁর গবেষণার মধ্যে ইলেকট্রন শাওয়ার  উৎপাদন,  মহাজাগতিক রশ্মি শোষণের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্লেষণ ছিল। গবেষণাপত্রটি  ভাবাকে  ১৯৩৪ সালে স্যার আইজাক নিউটন স্টুডেন্টশিপ এনে দেয়। এই স্টুডেন্টশিপ তিনি পরের  তিনবছরও ধরে রেখেছিলেন৷ ১৯৩৫ সালে  ভাবা রালফ এন্ড ফাউলারের অধীনে তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানে ডক্টরেট শেষ করেন। তিনি গবেষণা  করার সময় কেমব্রিজে এবং কোপেনহেগেনে নিলস বোরের সাথে  সময় কাটান। ১৯৩৫ সালে রয়্যাল সোসাইটিতে  আরেকটি গবেষণা পত্র  প্রকাশ করেন ভাবা যেখানে  ইলেকট্রন-পজিট্রন বিস্তারের  পদ্ধতিগভাবে  প্রথম  গণনা করা  হয়। তাঁর ইলেকট্রন –পজিট্রন  বিস্তারের গণনাগত  গবেষণার  জন্য ‘Bhabha scattering’ নাম   দেওয়া   হয়েছিল। এরপর তিনি অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের রিলেটিভিটির উপর গবেষণা করতে শুরু করেন৷ পরবর্তী  সময়ে তিনি সিনিয়ার স্টুডেন্টশিপ পান যা কেমব্রিজে তাঁকে তাঁর গবেষণা চালিয়ে  নিয়ে যেতে সাহায্য  করেছিল। পরবর্তী  সময়ে  ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে কেমব্রিজ বন্ধ করে  দেওয়া হয়। ভাবা ফিরে আসেন দেশে৷ ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ছুটি কাটাতে ভারতে এসে, ঠিক করেন আর ইংল্যান্ডে ফিরবেন না তিনি৷ ভারতবর্ষে বিশিষ্ট পদার্থবিদ সি ভি রমনের কথায় ভাবা  ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের, পদার্থবিদ্যার  রীডার হিসেবে  যোগ দেন৷  তিনি কাকা ডোরাব টাটার তরফ থেকে  বিশেষ অনুদান পান যার সাহায্যে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে কসমিক রে রিসার্চ ইউনিট তৈরি করেন।

ভাবা  ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স – এ  বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ  শুরু  করেন। তিনি এই সময় একটি যুগান্তরকারী পদক্ষেপ   নিয়েছিলেন; কংগ্রেসের  অভিজ্ঞ ও  প্রভাবশালী  নেতাদের  ভারতের  জন্য পরমাণু  চর্চার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বুঝিয়েছিলেন। তিনি ভবিষ্যতে পরমাণু  চর্চার  গুরুত্ব সম্পর্কে সেইসময়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের বুঝিয়েছিলেন; ভারতকে  নিজের  স্বার্থের  জন্যই  পরমাণু চর্চার দিকে গুরুত্ব  দিতে হবে। ভারতের  প্রথম প্রধানমন্ত্রী   জওহরলাল লাল নেহেরুর সমর্থনে, শুরু  হল  ভারতের  পরমাণু  গবেষণা। পরবর্তী  সময়ে পারমাণবিক  অস্ত্র   নিয়ে  কাজ  করবার সময়  পয়েন্ট  পার্টিকল মুভমেন্ট  নিয়ে  গবেষণার কাজ  করা   শুরু  করেছিলেন। ভাবা ১৯৪৮ সালে  পারমাণবিক শক্তি  কমিশন গঠন করেন।  নেহেরু তাঁকে পরমাণু  অস্ত্রের বিকাশের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি  ১৯৫০ সালে আই.এ.ই.এ  সম্মেলনে ভারতের  হয়ে  প্রতিনিধিত্ব  করেছিলেন। ভাবা  ১৯৫৫ সালে সুইজারল্যান্ডের  জেনেভাতে  শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির  ব্যবহার  সম্পর্কিত  আলোচনা  সভায়  রাষ্ট্রপুঞ্জ আয়োজিত সম্মেলনে  সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ভাবা মনে  করতেন পারমাণবিক  শক্তিকে সভ্যতার উন্নতির জন্য ব্যবহার করা দরকার। প্রতিটি দেশের শান্তিপূর্ণ অবস্থানই পৃথিবীকে সুরক্ষা দিতে পারবে। তিনি  পারমাণবিক শক্তিকে সভ্যতার  মঙ্গলের জন্য ব্যবহারের  পক্ষপাতী  ছিলেন। ভাবা ইন্দো– চীন যুদ্ধের  পর  পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পক্ষে সমর্থন  করতে  শুরু  করেন।

ভারতবর্ষের  পারমাণবিক  গবেষণা কেন্দ্রের উত্থান ঘটেছিল  হোমি  জাহাঙ্গীর  ভাবার হাত ধরে। তিনি যখন ভারতে পারমাণবিক শক্তি এবং  অস্ত্র  নিয়ে কাজ  করছিলেন, ভারতবর্ষে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই পারমাণু বিষয় নিয়ে চর্চা, মহাজাগতিক রশ্মি,পদার্থ বিদ্যার অতিআধুনিক বিষয়গুলি নিয়ে চর্চার সুযোগ ছিল না।  তিনি ১৯৪৪ সালে মার্চ  মাসে  স্যার ডোরাব টাটার ‘টাটা  ট্রাস্টে’র কাছে ‘মৌলিক পদার্থ বিজ্ঞানের  গবেষণামূলক একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবার  জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। শেষ  পর্যন্ত ১৯৪৪ সালে মুম্বাইতে  ‘টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (Tata Institute of Fundamental Research) নামের প্রতিষ্ঠান  তৈরী করা  হল। ভাবা ছিলেন সময়ের  থেকে  এগিয়ে  থাকা একজন সৃজনশীল মানুষ। তিনি অনবরত নতুন  নতুন চিন্তা করতেন। দেশকে নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টার  বহিঃপ্রকাশ  ঘটেছে তাঁর পদক্ষেপগুলির মধ্যে দিয়ে।    

হোমি  জাহাঙ্গীর  ভাবা ১৯৪২ সালে অ্যাডামস পুরস্কার ও ১৯৫৪ সালে পদ্মভূষণে সম্মানিত হন। 

হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার  মাত্র  ছাপান্ন বছর  বয়সে ১৯৬৬ সালের ২৪ জানুয়ারি মঁ ব্লাঁর কাছে এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১০১ বিমান দুর্ঘটনায়  মৃত্যু হয়। ভাবার এই দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর পিছনে সি.আই.এ(CIA)র  হাত আছে বলে অনেকেই মনে করেন৷ ভারতের  পরমাণু কর্মসূচীকে পঙ্গু  করবার  জন্যই, ভারতকে  সামরিক শক্তি থেকে দুর্বল  করবার  উদ্দেশ্যেই আমেরিকার গোয়েন্দা  সংস্থা  সি.আই.এ পরিকল্পনা করেই এই বিমান  দুর্ঘটনা ঘটায় বলেও মনে করা হয়। এই মতের পক্ষে যাবতীয়  প্রাথমিক নথি পাওয়া   গেলেও, ভারত সরকারের  সেই  সময়  আমেরিকার   বিরুদ্ধে  কথা   বলবার  মতন  কূটনৈতিক    দৃঢ়তা  ছিলও  না। তাঁর অবদান ভারতের  পরমাণুচর্চা, সামরিক চর্চাকে  দীর্ঘ সময় ধরে প্রেরণা দিয়ে যাবে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন