ইতিহাস

আউধ সংযুক্তিকরণ

সিপাহি বিদ্রোহের আগে ব্রিটিশ ভারতে বেশ কিছু শক্তিশালী রাজ্য ছিল যেখানে ব্রিটিশের অধীনে নবাব তথা দেশীয় রাজারা শাসন করতেন। ঝাঁসি, সম্বলপুর, সিতারা, নাগপুর ইত্যাদি রাজ্যকে লর্ড ডালহৌসী বাধ্যতামূলকভাবে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির আওতায় আনেন এবং এই সব রাজ্যে স্বত্ববিলোপ নীতি চালু করেন। এই রাজ্যগুলির মধ্যে অযোধ্যা তথা আউধই সর্বপ্রথম অধীনতামূলক মিত্রতা নীতিতে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু ডালহৌসি অপশাসনের অজুহাতে এই রাজ্যটিকেও ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। পরোক্ষে এই ঘটনা সিপাহি বিদ্রোহকে ত্বরান্বিত করেছিল বলা যায়। আউধ সংযুক্তিকরণ (Annexation of Awadh) অন্যান্য রাজ্যের নবাবদের রুষ্ট করেছিল ব্রিটিশ রাজের উপর।  

বক্সারের যুদ্ধের সময় ইংরেজরা প্রথম ভারতের মধ্যে একটি শক্তিশালী দেশীয় রাজ্য হিসেবে আউধ প্রদেশের ব্যাপারে সচেতন হন। বক্সারের যুদ্ধে আউধ পরাজিত হয় এবং লর্ড ক্লাইভ কিছুদিন পরে এই প্রদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী এলাহাবাদ এবং কারা প্রদেশ ইংরেজরা মুঘল সম্রাটের কাছে হস্তান্তর করে এবং এর বিনিময়ে কোম্পানিকে মুঘল সম্রাট পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দেন। ১৭৭৩ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস পুনরায় আউধের মধ্যে এলাহাবাদ ও কারা প্রদেশকে সংযুক্ত করেন। ইংরেজরা সেই সময় মুঘল সম্রাটকে রুহেলখণ্ড জয়েও সাহায্য করেছিলেন। ১৭৭৫ সালের একটি চুক্তি অনুযায়ী বেনারস ও গাজীপুরের সঙ্গে আউধকে ইংরেজদের কাছে হস্তান্তরিত করা হয়। আউধের নবাব ইংরেজদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে তাঁর বেগমদের কাছ থেকে তাঁর পিতার সঞ্চিত সব অর্থসম্পদ উদ্ধার করেন। তিনি ব্রিটিশ সেনাদের খরচ হিসেবে বার্ষিক কিছু অর্থ দিতে স্বীকার করেন। লর্ড কর্ণওয়ালিস গভর্নর জেনারেল হয়ে ভারতে এলে, আউধের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। সেই সময় ব্রিটিশরা আউধকে মারাঠা অঞ্চল এবং ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলের মধ্যবর্তী একটি বাফার অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছিল। ফলে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কখনোই দুর্বল রাখতে চাননি ব্রিটিশরা। কর্ণওয়ালিস এর ফলে আউধের নবাবের বার্ষিক দেয় অর্থের পরিমাণ কমিয়ে দেন। ১৭৯৭ সালে নবাব আসফ-উদ্‌-দৌল্লা মারা গেলে সিংহাসনের দুই দাবিদার হিসেবে উঠে আসেন তাঁর ভাই সাদাত আলি এবং তাঁর পুত্র বজির আলি। তৎকালীন গভর্নর জন শোর এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন এবং সাদাত আলিকে গদিতে বসিয়ে তাঁর সঙ্গে একটি নতুন চুক্তি করেন। কিন্তু এই চুক্তিতে ব্রিটিশ সরকার আউধের উপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দেন, এমনকি লর্ড ওয়েলেসলি ভারতের গভর্নর থাকাকালীনও এই প্রদেশের উপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। আউধ তথা অযোধ্যার নবাবকে বাধ্য করা হয় অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি মেনে নিতে। আউধের নবাব সেই সময় রুহেলখণ্ড ও নিম্ন দোয়াব অঞ্চল ব্রিটিশদের হাতে সমর্পণ করে। ক্রমে এই রাজ্যের আভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে ব্রিটিশরা ঢুকে পড়ে এবং বহুবার ব্রিটিশরা একে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু এই সংযুক্তিকরণ তখনও ঘটেনি। ব্রিটিশরা যতটা পারত কর বাবদ অর্থ আউধ থেকে সংগ্রহ করত। অন্যদিকে আউধের প্রশাসনিক উন্নতির জন্য কোন পদক্ষেপই নেয়নি ব্রিটিশরা। ১৮৪৭ সালে তৎকালীন গভর্নর লর্ড হার্ডিঞ্জ আউধের নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে সতর্ক করেন এই মর্মে যে যদি দুই বছরের মধ্যে আউধের প্রশাসনিক ব্যবস্থার কোন উন্নতি তিনি করতে না পারেন, তাহলে আউধ ব্রিটিশরা অধিগ্রহণ করবে। কিন্তু নবাব এ বিষয়ে কোন চেষ্টাও করেননি। তবুও দ্বিতীয় ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধে ইংরেজরা ব্যস্ত হয়ে পড়লে সে যাত্রায় আউধ রক্ষা পায়। ১৮৪৮ সালে লর্ড ডালহৌসি ভারতে আসেন। প্রথম থেকেই আউধকে অধিগ্রহণ করার জন্য তিনি একটি অজুহাত বা ছুতো খুঁজছিলেন। আউধের নবাবরা প্রত্যেকেই ইংরেজদের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন, তারা কোনরকম ব্রিটিশ বিরোধিতা করেওনি আগে কখন। ফলে ডালহৌসির কাছে একমাত্র রাস্তা ছিল নবাবের অপশাসনের দোহাই দেওয়া। আগের গভর্নররাও এই বিষয়ে বহুবার আউধের নবাবকে হুমকি দিয়েছিলেন, সতর্ক করেছিলেন। এই মর্মেই ডালহৌসিও ইংরেজ রেসিডেন্ট স্যার ডব্লিউ. এইচ. স্লিম্যানকে আউধের প্রশাসনিক সংগঠনের উপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে বলেন। স্লিম্যানের অবসর গ্রহণের পর জেনারেল আউটরামকেও একই দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তবে আউধের অধিগ্রহণের ব্যাপারে ইংরেজদের মধ্যে দ্বিমত ছিল। এক পক্ষ চেয়েছিল নবাবকে না সরিয়ে কেবলমাত্র রাজ্যের শাসনভার গ্রহণপূর্বক নবাবের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বার্ষিক দেয় হিসেবে সংগ্রহ করতে। স্লিম্যানও এই মত পোষণ করেছিলেন। স্যার হেনরি লরেন্স নৈতিক ভিত্তিতে আউধ সংযুক্তিকরণের বিরোধী ছিলেন। আবার অনেক ইংরেজ ডালহৌসির পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছিলেন এবং আউধ অধিগ্রহণ হোক তা চাইতেন। এতদসত্ত্বেও আউধকে ব্রিটিশের দখলে আনার সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়। ১৮৫৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির জেনারেল লর্ড ডালহৌসির নির্দেশে আউধের নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে সিংহাসনচ্যুত করা হয় এবং আভ্যন্তরীণ অপশাসনের অজুহাতে আউধকে ব্রিটিশ ভারতে সংযুক্ত করা হয়। এই ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের প্রণীত ‘ডক্ট্রিন অফ ল্যাপ্স’কে (Doctrine of Lapse) কাজে লাগানো হয়।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৮৫৭ সালের ৫ জুলাই থেকে ১৮৫৮ সালের ৩ মার্চের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত নবাবের পুত্র ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশদের বিপক্ষে যোগ দেয়। এই বিদ্রোহের সময় আউধের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে ব্রিটিশরা, কিন্তু আঠারো মাসের মধ্যে তারা পুনরায় আউধে ব্রিটিশ শাসন কায়েম করে। উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের সঙ্গে আউধকে সংযুক্ত করার পরে উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ এবং অযোধ্যা নামে একটি বৃহত্তর অঞ্চল গড়ে ওঠে। ১৯০২ সালে ঐ সমগ্র অঞ্চলকে আগ্রা ও অযোধ্যার সংযুক্ত প্রদেশ হিসেবে নামাঙ্কিত করা হয় এবং ১৯০৪ সালে এর নাম হয় আগ্রা প্রদেশ। বলা যায় আউধ সংযুক্তিকরণ সিপাহি বিদ্রোহের একটি অন্যতম রাজনৈতিক কারণ ছিল।            

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য