ভারতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে নজিরবিহীন অবদান রেখেছেন ‘প্রোজেক্ট টাইগার’-এর প্রথম ডিরেক্টর কৈলাস শঙ্খলা (Kailash Shankhala)। তিনিই ছিলেন ভারতের প্রথম ফিল্ড অফিসার যিনি বাঘের সংখ্যা, আচার-আচরণ ও নিত্যদিনের কাজকর্ম বিচার পূর্বক প্রকৃত ক্ষেত্রসমীক্ষা চালিয়েছিলেন। প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবাদী কৈলাস শঙ্খলা ১৯৫৩ সালে ‘দ্য ফরেস্ট সার্ভিস’-এর সঙ্গে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে তাঁকে দিল্লী জুলজিক্যাল পার্কের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ভারতীয় ব্যাঘ্র প্রজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে ১৯৭৩ সালে তাঁকে ‘প্রোজেক্ট টাইগার’-এ নিযুক্ত করা হয়। বাঘ সংরক্ষণের কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে ১৯৮৯ সালে কৈলাস শঙ্খালা স্থাপন করেন ‘টাইগার ট্রাস্ট’। তাঁকে ‘ভারতের ব্যাঘ্রমানব’ বলা হয়ে থাকে। ১৯৯২ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৯২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি ব্রিটিশ শাসিত ভারতে রাজস্থানের যোধপুরে কৈলাস শঙ্খলার জন্ম হয়।
তাঁর বাবা চেয়েছিলেন তিনি একজন ইঞ্জিনিয়ার হবেন, কিন্তু বাবার ইচ্ছার বিরোধিতা করে জীববিদ্যা পড়তে শুরু করেন তিনি। যোধপুরের যশবন্ত কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন কৈলাস। এরপরে ১৯৫৩ সালে ইণ্ডিয়ান ফরেস্ট কলেজ থেকে ফরেস্ট্রি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
এই বছরই তিনি রাজস্থানের ফরেস্ট সার্ভিসে যোগ দেন। কৈলাস শঙ্খলা তাঁর বই ‘টাইগার! দ্য স্টোরি অফ দ্য ইণ্ডিয়ান টাইগার’-এ বলেছেন এই ফরেস্ট সার্ভিসের কাজই তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্যকে নির্ধারিত করে দিয়েছিল। এই কাজে যোগ দেওয়ার প্রথম দিকে শিকারের ক্ষেত্রে অনুমতি দিতে তিনি নিষেধ করতেন না। তখনও তাঁর মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইচ্ছে বিকশিত হয়নি। ১৯৫০ এর দশকের শুরুর দিকে, একটি বাঘ মেরে ফেলেন তিনি আর এই ঘটনাই তাঁকে আমূল বদলে ফেলে। প্রচণ্ড অপরাধবোধে দীর্ণ হয়ে এরপর থেকেই একজন নিষ্ঠাবান সংরক্ষণবাদী হয়ে ওঠেন তিনি। জীবনের বাকি সময়টা তিনি ব্যাঘ্র সংরক্ষণেই অতিবাহিত করেন। ফরেস্ট সার্ভিসের অংশ হিসেবে সারিস্কা, ভরতপুর, বনবিহার, রণথম্বোরের জাতীয় উদ্যানগুলি পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত রাজস্থানের ফরেস্ট ডিভিশনের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কৈলাস শঙ্খলা। ১৯৫৬ সালে রাজস্থানের ওয়াইল্ড লাইফ বোর্ডের কাছে তিনি একটি চিঠি পাঠিয়ে বাঘ হত্যা বন্ধ করার আবেদন জানান এবং তিনিই সেই সময় প্রথম কোন সংরক্ষণবাদী হিসেবে বাঘ হত্যার বিরোধিতা করেছিলেন। এর এক দশক পরে ১৯৬৫ সালে তাঁকে দিল্লি জুলজিক্যাল পার্কের ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি এই চিড়িয়াখানার প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। এই সময়ই তিনি ইণ্ডিয়ান বোর্ড অফ ওয়াইল্ড লাইফকে বোঝান যে এমন একটা ব্যবস্থা চালু করতে হবে যাতে ব্যাঘ্র শাবকদের পাচার ধরা পড়ে এবং বোঝা যায় যে কীভাবে পাচারকারীরা ঐ শাবকটিকে পাচার করেছে। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যেই কৈলাস শঙ্খলার ব্যাঘ্র সংরক্ষণের কাজের একেবারে শীর্ষ সময় ছিল। স্থানীয় গণমাধ্যমের বিরোধিতা সত্ত্বেও চিড়িয়াখানার খাঁচার মধ্যে বন্যপ্রাণীকে রাখার বদলে তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থানে রাখার পরামর্শ দেন এবং এই বিষয়ে অগ্রণী হন। সাধারণ মানুষকে আনন্দ দেওয়ার কাজে বন্যপ্রাণীকে ব্যবহার করার বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এই সময়ই একেবারে ছোট পরিসরে বাঘেদের নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং বাঘের সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য তিনি বিভিন্ন স্থানে যেতে শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে কৈলাস দিল্লির বাজারে বাঘ ও চিতার চামড়া বিক্রির ঘটনার তদন্ত করেন এবং ‘দ্য ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার একেবারে সামনের পাতায় সেই সংবাদ ও তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এর দুই বছর পরে বিলুপ্তপ্রায় বাঘেদের সংরক্ষণের ব্যাপারে কৈলাস কথা বলেন ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার’ তথা আইইউসিএন (IUCN) সংস্থায়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে এই বিষয়ে জনমত গঠন করে কৈলাস শঙ্খলা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বাঘের চোরাচালান এবং শিকারের উপর সম্পূর্ণরূপে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বলেন। এমনকি ভারতের তৎকালীন কিছু দেশীয় রাজাও এই প্রস্তাবে সম্মত হন। প্রাচীনকালে বাঘ শিকার করা রাজা-রাজড়াদের একটা অবসরযাপনের মধ্যেই পড়ত। কিন্তু তাঁরা এটা কখনও ভেবে দেখেননি যে এভাবে শিকার করতে করতে একদিন বনে কোন বাঘই আর শিকারের জন্য অবশিষ্ট থাকবে না। ১৯৭০ সালের মে মাসে ‘দ্য কন্ট্রোভার্সিয়াল টাইগার : এ স্টাডি অফ ইকোলজি, বিহেভিয়ার অ্যাণ্ড স্ট্যাটাস’ নামের একটি প্রকল্পের জন্য তিনি সম্মানীয় জওহরলাল নেহেরু বৃত্তি লাভ করেন। এর ফলেই তিনি আরও সক্রিয়ভাবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কাজে যুক্ত হন। এই বৃত্তির মাধ্যমে ভারতে তখনও পর্যন্ত বাঘের জীবিত থাকার হার বিষয়ে গভীরভাবে গবেষণা করার সুযোগ পান কৈলাস।
১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পর্যটন ও বিমান মন্ত্রী ড. করণ সিংকে তিনি বোঝাতে সমর্থ হন যে বাঘ, চিতা এবং প্যান্থারের চামড়ার পাচার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা উচিত। পরের দুই বছরের জন্য ক্রমহ্রাসমান বাঘের সংখ্যা গণনার জন্য তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ান। এই প্রকল্পের মধ্যেই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি অ্যানে রাইট ১৯৭১ সালের মে মাসে পশুর চামড়ার দোকানের বিষয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন যেখানে কলকাতায় বাঘ ও চিতার চামড়া পাচার ও বিক্রির নিপুণ তথ্য উপস্থাপন করেন। ব্রিটিশ সংরক্ষণবাদী গাই মাউন্টফোর্টের পরামর্শে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী করণ সিংহের নেতৃত্বে বাঘ সংরক্ষণের জন্য একটি টাস্ক ফোর্স তৈরি করেন। এই টাস্ক ফোর্সের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কৈলাস শঙ্খলা, অ্যানে রাইট, বন্যপ্রাণী দপ্তরের এক অধিকর্তা ড. এম. কে. রঞ্জিত সিং এবং ভারতের বিখ্যাত সংরক্ষণবাদী জাফর ফতেহ্আলি। কয়েক মাস পরে ১৯৭২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সংসদে উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সপক্ষে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন পাশ হয়। এই আইন পাশ হওয়ার পরেই ধীরে ধীরে ভারত জুড়ে জাতীয় উদ্যান, পাখিরালয় ইত্যাদি গড়ে উঠতে শুরু করে। এইসব বনাঞ্চলের মধ্যে কিছু কঠোর বিধিনিষেধ পালন করা হয় এবং এই অঞ্চলের মধ্যে কোনভাবেই পশু বা পাখি শিকার করা নিষিদ্ধ। ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে বাঘের স্বাভাবিক বাসস্থান রক্ষা করতে এবং পুনরুদ্ধার করতে এবং তার পাশাপাশি ভারতের অবশিষ্ট বাঘেদের বাঁচিয়ে রাখতে ইন্দিরা গান্ধী শুরু করেন ‘প্রোজেক্ট টাইগার’। এই প্রকল্পের প্রথম ডিরেক্টর রূপে তিনি নির্বাচন করেন কৈলাস শঙ্খলাকে। মোট নয়টি ব্যাঘ্র সংরক্ষণ প্রকল্প এবং ২৬৮টি বাঘকে নিয়ে শুরু হয় প্রোজেক্ট টাইগার। সবথেকে বড় এবং কঠিন কাজ ছিল এই প্রকল্পে, জাতীয় উদ্যানের বাইরে লোকালয়গুলিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এই কাজে প্রয়োজন ছিল গ্রামবাসীদের প্রত্যক্ষ সাহায্য। উদ্যানের চারধারে নির্দিষ্ট দূরত্বে সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছিল। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্পের ডিরেক্টরের পদে আসীন ছিলেন তিনি। শুধু প্রোজেক্ট টাইগারের ডিরেক্টর হিসেবেই নয়, বরং তাঁর সংরক্ষণবাদী মানসিকতা ও চিন্তনের মাধ্যমে কৈলাস শঙ্খলা ভারতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের একজন পথিকৃৎ হয়ে উঠেছিলেন।
দীর্ঘ সময় ধরে নিপুণভাবে তিনি লক্ষ করেছিলেন বাঘেদের সকল আচরণ – কীভাবে তারা প্রতিক্রিয়া জানায়, কীভাবে ফেরোমোন ক্ষরণ করে, কীভাবে তারা নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করে এবং কীভাবেই বা একে অপরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে তা সবই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন কৈলাস। তাঁর বই ‘টাইগার! দ্য স্টোরি অফ দ্য ইণ্ডিয়ান টাইগার’-এ কৈলাস শঙ্খলা লিখেছেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাঘেদের খুব সীমিত পরিসরে স্বাভাবিক বাসস্থানে রাখলে তারা নিজেরাই নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করে নেয় এবং খুব প্রয়োজন ছাড়া নিজের এলাকার বাইরে যায় না। প্রোজেক্ট টাইগারের সেই নয়টি জাতীয় উদ্যান প্রকল্প আজ ৫০টি ব্যাঘ্র সংরক্ষণ প্রকল্পের রূপ নিয়েছে সমগ্র ভারত জুড়ে। ২৬৮টি বাঘ থেকে আজ সেইসব সংরক্ষণ প্রকল্পে প্রায় ৩০০০টি বাঘ রয়েছে।
বাঘ সংরক্ষণের কাজকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে ১৯৮৯ সালে কৈলাস শঙ্খালা স্থাপন করেন ‘টাইগার ট্রাস্ট’। তাঁকে ‘ভারতের ব্যাঘ্রমানব’ বলা হয়ে থাকে।
১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত রাজস্থানের চিফ ওয়াইল্ড লাইফ ওয়ার্ডেন হিসেবে কাজ করেন তিনি। ১৯৯২ সালে আজীবনের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত করে।
১৯৯৪ সালের ১৫ আগস্ট ৬৯ বছর বয়সে কৈলাস শঙ্খলার মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান