“ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি/ দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়” – ভালোবাসার তীব্রতা প্রমাণে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে লাল কাপড় বাঁধার উপমা দিয়েছেন। কেন দিয়েছেন? কেননা আমাদের মধ্যে প্রচলিত আছে ষাঁড় লাল রং দেখলে রেগে যায়। কখনও কি ভেবে দেখেছেন যে ষাঁড় লাল রং দেখলে রেগে যায় কেন? বা লাল রং দেখলে ষাঁড় সত্যিই কি রেগে যায়? এখানে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি।
প্রথমেই জানিয়ে দিই যে, ষাঁড় লাল রং দেখলে রেগে যায় না। এটা একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এই ধারণার উদ্ভব সম্ভবত ‘বুল ফাইটিং’ (Bull Fighting) এর মতো জনপ্রিয় খেলা থেকে। স্পেনসহ অনেক দেশেই এই খেলা বেশ জনপ্রিয়। এখানে একজন মানুষ, (যাঁকে ম্যাটাডোর বলা হয়), হাতে একটি লাল কাপড় বা মুলেটা নিয়ে ষাঁড়ের সামনে দোলায় ও ষাঁড় ক্রুদ্ধ হয়ে তার দিকে তেড়ে যায়। অনেকে মনে করেন এই কাপড়ের রং দেখেই ষাঁড় রেগে যায়। আমরা এখানে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব যে আসলে ষাঁড় লাল রং দেখলে রেগে যায় না বরং এর পিছনে অন্যান্য কারণ আছে।
অবাক করার মতো বিষয় যে ষাঁড়, গরুর মতো বেশিরভাগ গবাদিপশু আংশিক বর্ণান্ধ ও তারা লাল রং দেখতেই পায় না। অর্থাৎ সুস্থ দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের মতো তাদের লাল রং সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই। মার্কিন বিজ্ঞানী টেম্পল গ্র্যান্ডিনের লেখা ‘ইমপ্রুভিং অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার’ বই অনুযায়ী এই প্রাণীগুলির রেটিনায় লাল রং সংবেদী কোন কোষ (cone cells) নেই। ফলত লাল রং বুঝতে পারে না। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বর্ণান্ধতা নিয়ে বিস্তারিত জানতে বর্ণান্ধ ব্যক্তিরা রঙ দেখতে পান না কেন বিষয়ক নিবন্ধটি দেখতে পারেন।
ষাঁড়সহ সমস্ত গবাদি পশুরা লাল সংবেদী কোন কোষহীন মানুষদের মতো হয়। যাঁরা লাল রঙ দেখতে পান না তাঁদের সেই বর্ণান্ধতাকে বলা হয় প্রোটানোপিয়া (Protanopia) আর গবাদি পশুরা এই গোত্রের মধ্যে পড়ে। অন্য দুটি প্রকারের কোন কোষের উপস্থিতির জন্য ষাঁড় এক্ষেত্রে লাল রংকে হলুদাভ ধুসর দেখে। যেহেতু লাল রং দেখতেই পায় না তাই লাল রং দেখে ষাঁড় বা গরুর রেগে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। বরং বুল ফাইটিংয়ে যেভাবে কাপড়টি নাড়া হয় সেই নাড়ানো দেখেই ষাঁড় রেগে যায়।
ষাঁড়ের রেগে যাওয়ার কারণ হিসেবে যেগুলি মূল সেগুলি হল, বুল ফাইটিং এর ষাঁড়গুলি মূলত ক্ষিপ্র প্রজাতির ষাঁড় বাছাই করা হয় ও তাদেরকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করা হয়। এছাড়া, ম্যাটাডোর যেভাবে মুলেটা নাড়ায় তাও ষাঁড়কে উত্যক্ত করার জন্যই। এছাড়া দর্শকভর্তি স্টেডিয়ামে প্রচুর চিৎকারের মধ্যে ও সামনে ম্যাটাডোরের উত্যক্ত করা – সবে মিলিয়ে ষাঁড়ের জন্য এক ধরণের প্রতিকুল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় পড়লে সাধারণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে আক্রমণ বা পলায়ন (Fight or Flight) ছাড়া অন্য উপায় থাকে না। ফলত ষাঁড়টি আক্রমণ করে নিজেকে বাঁচাতে সচেষ্ট হয়।
এখানে জানিয়ে রাখা ভাল, বুল ফাইটিংয়ের প্রথম দিকের কয়েকটি রাউন্ডে কিন্তু হলুদ বা গোলাপি মুলেটা ব্যবহার করা হয়, লাল নয় কিন্তু তাতেও ষাঁড়ের প্রতিক্রিয়া একই হয়।
কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেমিকা বরুণা হয়ত ষাঁড় লাল রং দেখলে রেগে যায় না একথাটি জানতেন তাই ষাঁড়ের চোখে লাল রুমাল বাঁধাকে কঠিন কিছু ভাবেননি। কবিও হয়ত, আসল সত্য জানলে অন্য কিছু লিখতেন। কবিকল্পনার কথা বাদ দিন, ষাঁড় লাল রং দেখলে রেগে যায় না এই বিষয়টি আশা করি বোঝা গেল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান