বিজ্ঞান

বর্ণান্ধ ব্যক্তিরা রঙ দেখতে পান না কেন


যদি কোনো ব্যক্তি এমন হন যে তিনি প্রকৃতি ও পরিবেশের সকল বস্তুর মধ্যে বিশেষ কিছু কিছু রঙ চোখে দেখতে পান না, সেক্ষেত্রে তাকে বর্ণান্ধ বলা হয় ডাক্তারি পরিভাষায়। বর্ণান্ধতা একটি রোগ যার ফলে রঙ চেনার ক্ষমতা লোপ পায় মানুষের। কোনো বর্ণান্ধ ব্যক্তির সামনে লাল, হলুদ বা সবুজ বর্ণের কোনো ছবি বা বস্তু রাখলে তিনি সেই রঙ উপলব্ধি করতে পারবেন না, এমনটাই আমরা মনে করে থাকি। কিন্তু ভেবে দেখেছি কি, কেন এমন হয়? তাহলে চলুন আজ জেনে ফেলি, বর্ণান্ধ ব্যক্তিরা রঙ দেখতে পান না কেন।

জীববিজ্ঞান অনুযায়ী আমাদের চোখে দুই ধরনের আলোকসংবেদী কোষ থাকে যাদের রড কোষ (Rod Cell) ও কোন কোষ (Cone Cell) বলা হয়। রড কোষ আমাদের আলোর সাহায্যে দেখতে সাহায্য করে আর কোন কোষ রঙ বুঝতে সহায়তা করে। কোন কোষগুলি মূলত তিন ধরনের রঙকে শনাক্ত করে – লাল, নীল ও সবুজ। এগুলি প্রাথমিক রঙ বলে ধরা হয় আলোকবিজ্ঞানে। চোখের রেটিনায় যদি এই তিন ধরনের মধ্যে কোনো এক ধরনের কোষ অনুপস্থিত থাকে তাহলেই ব্যক্তি সেই বর্ণ দেখতে অক্ষম হন। হতে পারে শুধু এক প্রকার কোষই অনুপস্থিত, হতে পারে দুই প্রকার বা সকল প্রকার কোষই অনুপস্থিত রেটিনায় আর এর তারতম্য অনুসারে বর্ণান্ধতারও তারতম্য করেছেন চিকিৎসকেরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যদি কেউ লাল রঙ দেখতে না পান তাহলে সেই বর্ণান্ধতাকে বলা হয় প্রোটানোপিয়া (Protanopia)। কেউ যদি সবুজ রঙ দেখতে অসমর্থ হন তাহলে তার ক্ষেত্রে রয়েছে ডিউটেরানোপিয়া (Duteranopia) আর কোনো বর্ণান্ধ ব্যক্তি নীল রঙ দেখতে না পেলে তার ক্ষেত্রে ট্রিটানোপিয়ার (Tritanopia) রয়েছে বলে ধরা হয়। সহজ করে বললে, প্রোটানোপিয়ার ক্ষেত্রে লাল বাদে অন্য সব রঙ তিনি দেখতে পাবেন। তেমনভাবেই ডিউটেরানোপিয়ার ক্ষেত্রে সবুজ এবং ট্রিটানোপিয়ার ক্ষেত্রে নীল রঙ বাদে অন্য সব রঙ দেখতে পান বর্ণান্ধ ব্যক্তিরা। ফলে একটা ব্যাপার মনে রাখা দরকার যে বর্ণান্ধ মানেই যে কোনো রঙ দেখতে পাবে না তা কিন্তু নয়। যদিও সম্পূর্ণ বর্ণান্ধতার ক্ষেত্রে কোনো রঙই রোগী দেখতে পান না।

এবারে জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে এই বর্ণান্ধ ব্যক্তিরা রঙ দেখেন বা কেন বলা হয় তারা রঙ দেখতে পান না। ধরা যাক একজন সাধারণ দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন মানুষ একটি নীল রঙের পর্দাকে নীল রঙেরই দেখবেন। তার মানে এই নয় যে তার রেটিনার নীল পিগমেন্টটাই শুধু অধিকমাত্রায় সংবেদন সৃষ্টি করছে তার মস্তিষ্কে, নীল পিগমেন্টের পাশাপাশি সবুজ পিগমেন্টটিও অল্পমাত্রায় সংবেদন সৃষ্টি করে। একইভাবে একজন নীল রঙে বর্ণান্ধ ব্যক্তি যখন ঐ নীল পর্দার দিকে তাকাবেন তখন তাঁর রেটিনায় নীল রঙের পিগমেন্ট না থাকায় তা কোনো সংবেদন সৃষ্টি করবে না, কিন্তু সবুজ রঙের পিগমেন্ট অল্পমাত্রায় সংবেদন তৈরি করবে। তার ফলে নীল বর্ণান্ধ ব্যক্তি ঐ পর্দাকে নীল রঙের বদলে হাল্কা সবুজ রঙের দেখবেন। ঠিক একই ঘটনা ঘটে অন্য রঙের বর্ণান্ধ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও। লাল আলোর দিকে তাকানোর সময় আমাদের রেটিনার লাল কোন কোষগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু লাল কোন কোষ শুধু লাল নয়, তার পাশাপাশি কমলা ও হলুদ আলোতেও সংবেদন সৃষ্টি করে। সেভাবেই সবুজ কোন কোষও সবুজ রঙের পাশাপাশি কমলা, হলুদ এবং নীল রঙ দেখতে সাহায্য করে থাকে। যখন কোনো সাধারণ সুস্থ ব্যক্তি একটি হলুদ ফুলের দিকে তাকান, তখন তার চোখে একইসঙ্গে লাল ও সবুজ কোন কোষগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে মস্তিষ্ক অধিক লাল ও স্বল্পমাত্রায় সবুজ রঙ হিসেবে সংবেদন গ্রহণ করে যা মিশে চোখে হলুদ রঙ তৈরি করে। সহজে বললে কোনো একটি রঙ আমাদের রেটিনায় সক্রিয় হয় না, সকল বর্ণই আসলে দুটি বা ততোধিক বর্ণের সমাহারে মস্তিষ্কে সংবেদন জাগায়। বর্ণান্ধতার ক্ষেত্রে যে কোনো একটি কোন কোষ অনুপস্থিত থাকে বা দুর্বল থাকে। তার ফলে বর্ণান্ধ ব্যক্তি নীল রঙের দিকে তাকালে গাঢ় সবুজ দেখতে পান। শুধুমাত্র প্রাথমিক রঙের ক্ষেত্রে এরূপ ঘটে, কিন্তু যখন কোনো গৌণ বা মিশ্র রঙের দিকে বর্ণান্ধ ব্যক্তি তাকায়, সেক্ষেত্রে তার রেটিনায় অনুপস্থিত বিশেষ রঙের কোন কোষটি বাদে অন্যান্য সকল কোষই সক্রিয় হয় এবং অন্যান্য সব রঙই সে দেখতে পায়। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, যদি কোনো নীল রঙে বর্ণান্ধ ব্যক্তি গোলাপী রঙের দিকে তাকায় তাহলে সে ঐ গোলাপী রঙের মধ্যে থাকা নীলের সামান্য অংশটিই খালি দেখতে পাবেননা যা সমগ্র রঙের পরিমাণের খুব নগণ্য অংশ। ফলে মিশ্র রঙ দেখতে বর্ণান্ধ ব্যক্তির খুব একটা অসুবিধে হয় না।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


শুধু রঙই নয়, বস্তুর আলো-ছায়া, তার গভীরতা, আকার-আয়তন সবই দৃষ্টিকে প্রভাবিত করে। একজন লাল বর্ণান্ধ ব্যক্তি একটি লাল চেয়ারকে গাঢ় হলুদ রঙের দেখে ঠিকই, কিন্তু সেটা যে চেয়ার তা সে ঠিকই বুঝতে পারে। এমনকি সেই চেয়ারের কাঠামো, কারুকার্য সবই তার চোখে ধরা পড়ে। লাল রঙে বর্ণান্ধ ব্যক্তি লাল রঙকে কমলাও দেখতে পারেন কিন্তু তাই বলে রাস্তার লাল সিগনালের সঙ্গে একটি কমলালেবুকে তিনি কখনোই গুলিয়ে ফেলেন না।

এ থেকে বোঝা যায় বর্ণান্ধ ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি আংশিকভাবে রঙ বুঝতে অক্ষম, তার মানে তারা কোনো রঙই দেখতে পায় না তা নয়। মস্তিষ্কে বিভিন্ন রঙের পিগমেন্টের সমাপতনের কারণে অন্য রঙ দিয়ে সেই অপূর্ণ অংশটি ভরাট করে নেয় আমাদের রেটিনা। আশা করি এবার নিশ্চয়ই বোঝা গেল বর্ণান্ধ ব্যক্তিরা রঙ দেখতে পান না কেন ।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য