বিজ্ঞান

করোনা ভাইরাস নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা ও সত্যতা

নভেল করোনা ভাইরাস বা nCOVID-19 বর্তমানে সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়েছে। চীন, ইটালি ইত্যাদি দেশে ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়েছে ও মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক বেশি। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশেও এই ভাইরাস সংক্রমণের হার ক্রমশই বাড়ছে। আর বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে পাল্লা দিয়ে ছড়াচ্ছে ভুল তথ্য। এখানে আমরা সামাজিক মাধ্যমে প্রাপ্ত করোনা ভাইরাস নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা ও সেগুলি সম্পর্কিত বিজ্ঞানসম্মত ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organisation, WHO) নির্ধারিত নির্দেশাবলী তুলে ধরব। আমরা সঠিক তথ্য জানলে তবেই এই রোগের বিশ্বব্যাপী সংক্রমণের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারব।

ধারণা ১। করোনা ভাইরাস উষ্ণ আবহাওয়ায় বা ঠান্ডায় বাঁচে নাঃ অনেকেই প্রচার করছেন করোনা বেশি উষ্ণতায় বাঁচে না। আমরা অনেক মেসেজ পাচ্ছি যেখানে লেখা হচ্ছে ২৭ ডিগ্রির বেশি উষ্ণতায় করোনা ভাইরাস মারা যায়। অনেকে আবার বলছেন, খুব ঠান্ডায় মারা যায়।
মনে রাখতে হবে, আমাদের দেহের স্বাভাবিক উষ্ণতা ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, তাতে ভাইরাসটি দিব্যি বেঁচে আছে। WHO বলছে, এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এই ভাইরাস গরম, আর্দ্র, ঠান্ডা সব ধরণের পরিবেশেই সংক্রামিত হতে পারে তাই নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিধি সর্বত্র মেনে চলতে হবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উষ্ণ জলে স্নান করলে ভাইরাস মরে যাবে ও আক্রান্ত হবেন না এটিও ঠিক একই কারণে ভুল ধারণা।

ধারণা ২। নুন জল/ভিনিগার দিয়ে গারগেল করলে করোনা সংক্রমণ হবে নাঃ গারগেল করলে সাধারণ সর্দি কাশি থেকে সাময়িক আরাম পাওয়া গেলেও WHO এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই ভাবে করোনা সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব নয়। এখনও পর্যন্ত এই ধরণের কোনও বিজ্ঞান সমর্থিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ধারণা ৩। ঘন ঘন জল খেলে ভাইরাস পেটে চলে যাবে ও সেখানে আ্যসিডে ধ্বংস হয়ে যাবেঃ করোনার ভাইরাস মুখ, নাক, চোখ দিয়ে একবার প্রবেশ করলে সব সময় সম্ভবনা থাকে তা শ্বাসযন্ত্রে যাবে এবং খুব কম পরিমাণ ভাইরাস দেহের ভিতরে গেলেও তারা কিছু দিনের মধ্যেই সংখ্যায় বেড়ে যাবে। তাই এই ভাবে সংক্রমণ বন্ধ হবে না।

ধারণা ৪। রসুন খেলে করোনা সংক্রমণ হবে নাঃ রসুন একটি উপকারী খাদ্য এবং এর কিছু জীবাণু প্রতিরোধক গুণ আছে একথা ঠিক কিন্তু এখনও পর্যন্ত রসুন খেয়ে করোনা সংক্রমণ রুখে দেওয়ার কোনও প্রমাণ WHO বা বিজ্ঞানীরা পায়নি।

ধারণা ৫। করোনার টিকা তৈরি হয়ে গেছে এবং বাজারে শীঘ্রই আসছেঃ সারা বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞানীরা অবশ্যই করোনা ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বাজারে তা আসেনি। বাজারে কোনও ওষুধ বা টিকা আসার আগে বেশ কিছু ধাপ আছে, তার মধ্যে মানুষের উপর পরীক্ষা ও একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই এই সমস্ত কিছু দেখা হয়। এই সমগ্র প্রক্রিয়ার জন্য বেশ কিছুটা সময় প্রয়োজন, সেটা অন্তত এক বছর। WHO বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে এর টিকা ও ওষুধের জন্য কাজ করছে।
প্রসঙ্গত, নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদির ভ্যাক্সিন এই ভাইরাসের উপর কাজ করে না। টিকা কিভাবে কাজ করে জানতে এখানে দেখুন।

ধারণা ৬। অ্যান্টিবায়োটিক বা কিছু ওষুধে (বিভিন্ন মেসেজে বিভিন্ন নাম) সুস্থ হয়ে উঠছেনঃ এখানে জেনে রাখা প্রয়োজন, করোনা সংক্রমণ মানেই মৃত্যু নয়, সাধারণ হিসেবে ১০০ জনের মধ্যে ২ থেকে ৩ জনের এখনও মৃত্যু হয়েছে। তাই রোগের উপসর্গ দেখে তার চিকিৎসা করালেই সুস্থ হওয়া সম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে হয়ত, ভেন্টিলেশন বা লাইফ সাপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোন বিশেষ ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি যা যেকোন করোনা আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যাবে।

ধারণা ৭। করোনা ভাইরাস আকারে বড় এবং যেকোন মাস্ক ব্যবহার করলে সংক্রমণ এড়ানো যাবেঃ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সব চেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হল ঘনঘন হাত ধোওয়া বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা। আসলে, কারোর হাঁচি, কাশির সাথে ভাইরাস বের হলে তা শুধু মুখ বা নাক দিয়ে প্রবেশ করে এমন নয়, চোখের মিউকাস তরলের মাধ্যমেও ঢুকতে পারে। তার থেকেও বড় কথা, আমরা হাত দিয়ে যেকোন সংক্রামিত জায়গা ছুঁতে পারি, হাতে এই জীবানু লাগার সম্ভবনা খুব বেশি, ফলে সেই হাত মুখে, নাকে বা চোখে নিলে সংক্রমণের সম্ভবনা বাড়ে। এছাড়াও অনেক মাস্কের ভিতর দিয়ে ভাইরাস যেতে পারে, তাই মুখে মাস্ক নিলে করোনা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা কমে না। মাস্ক শুধু মাত্র যাঁরা করোনা আক্রান্তদের সেবায় নিয়োজিত অর্থাৎ ডাক্তার, নার্স তাঁদের প্রয়োজন এবং সেগুলিও নির্ধারিত মাপে তৈরি হয়ে থাকে। প্রসঙ্গত, মাস্ক ব্যবহার না জানলে বরং ক্ষতির সম্ভবনা বাড়ে কারণ, অনভ্যাসের কারণে মাস্ক ঠিক করতে মুখে বার বার হাত যাওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যায় যা সংক্রামিত হওয়ার সম্ভবনা বাড়ায়।

ধারণা ৮। গৃহপালিত পশু বা মুরগি ইত্যাদির থেকে সংক্রমণ হতে পারেঃ এখনও পর্যন্ত এ বিষয়েও কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সাধারণত রোগটি মানুষের থেকে মানুষেই ছড়াচ্ছে, তাই পোষ্যদের থেকে এই রোগ ছড়ায় না। বিশেষভাবে উল্লেখ্য অন্য কোন কারণ না থাকলে মুরগির মাংস নিশ্চিন্তে খান, মাংস সুসিদ্ধ করলে কোন ধরণের ভাইরাসই বাঁচে না।

ধারণা ৯। গোমূত্র ও গোবর বা অন্যান্য প্রাণীর মূত্র খেলে করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি জন্মাবেঃ সাধারণ বিজ্ঞান জানা থাকলে সকলেই বুঝবেন তবু বলে দেওয়া ভাল এটিও সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। এই সব হল দেহের বর্জ্য পদার্থ যাতে ক্ষতিকর পদার্থ, জীবানু থাকে তাই উপকারের থেকে এতে ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা অনেক বেশি। কিছু ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা গোমূত্র, গোবর, উটের মূত্র ইত্যাদির উপকারিতা্র কথা বললেও তা যে আসলে ভুল তা অনেক পত্রিকা ও টিভি প্রচার করছে।

ধারণা ১০। সবাই এক সাথে রোদে দাঁড়ালে ভাইরাস মরে যাবেঃ সম্পূর্ণ ভুল ধারণা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ‘জনতা কারফিউ’ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা প্রচার করে মেসেজের সংখ্যা অনেকাংশে বেড়ে গেছে। এ কথা ঠিক, দেহের বাইরে এই জীবানু বেশিক্ষণ বেঁচে থাকে না কিন্তু তাই বলে সকলে এক সঙ্গে রোদে দাঁড়ালে এই ভাইরাস সংক্রমণ বন্ধ হবে এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত একটি ধারণা। দেহের ভিতরে ভাইরাস থাকলে তা কখনই মরবে না এবং এর জন্যে এক মাত্র উপায় হচ্ছে সুচিকিৎসা। যেকোন আক্রান্তকে জনমানস থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্তত ১৪ দিন (বা ডাক্তারের পরামর্শ মত দিন) রাখতে হবে। এই ধরণের মেসেজ পেয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে রোদে দাঁড়ানোর কোন দরকার নেই। আপনি এবং আপনার পরিবার আক্রান্ত না হয়ে থাকলে ভাইরাস মরার প্রশ্নই আসছে না, আর আক্রান্ত হয়েছেন মনে হলে সরাসরি আইসোলেশন সেন্টারে যান।

ধারণা ১১। সবাই একদিন ঘর থেকে না বেরোলে সংক্রামণ বন্ধ হবেঃ এটিও সম্পূর্ণ ভুল ধারণা, এই প্রচারটিরও শুরু ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ‘জনতা কারফিউ’ ঘোষণার পর। কারোর দেহে যদি ভাইরাস ঢুকে থাকে তাকে অন্তত ১৪ দিন বিচ্ছিন্ন করে রাখতে হবে। আমরা জানি দেহে ভাইরাস প্রবেশের সাথে সাথেই আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা দেয় না। তাই এক দিন কারফিউ করে করোনার সংক্রমণ আটকানো সম্ভব নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ‘এক দিনের কারফিউ’ এর মাধ্যমে দেশবাসীর এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করার প্রস্তুতির কথা বুঝতে চেয়েছেন এবং ভবিষ্যতে ভারতে যদি প্রকোপ বাড়ে সেক্ষেত্রে এ ধরণের বিচ্ছিন্নতা বা অঞ্চল ভিত্তিক ‘লক ডাউন’ এর কথা ভাবা হতে পারে। অথচ প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান এর সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা করে এই ধরণের প্রচার চলছে যে একদিন কারফিউ হলেই সংক্রামণের শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়া যাবে।

এই ধরণের আরও অনেক অপপ্রচার চলছে, দয়া করে সেগুলি থেকে বিরত থাকুন। কেউ করোনা ভাইরাস নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করলে তাদের ভুল ধরিয়ে দিন। এই লেখাটি WHO সহ বিভিন্ন বিজ্ঞান ভিত্তিক তথ্যসূত্র থেকে নিয়ে তৈরি করা। আপনাদের কোন মেসেজ নিয়ে সন্দেহ থাকলে কমেন্ট করুন, আমরা তা ঠিক না ভুল ব্যাখ্যা করব। আর করোনার আক্রান্ত না হওয়ার জন্য নিচে দেওয়া এই বিশেষ কাজগুলি করুন তাহলেই ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন। আর ভয় পাবেন না, করোনা মারণ ব্যাধি নয়, জ্বর, সর্দি কাশির মতোই সাধারণ শুধু এটি খুব বেশি সংক্রামক তাই গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে এর মোকাবিলা করতে হবে। আক্রান্ত, আক্রান্তের সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন তাঁদের সব থেকে বেশি দায়িত্ব রোগ যাতে না ছড়ায় আর প্রত্যেকের নিজস্ব স্বাস্থ্যবিধি পালন প্রয়োজন যাতে আক্রান্ত না হন। সেই বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি হলঃ

  • ঘনঘন সাবান বা হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলুন। হাত ধুয়ে ফেলার অসুবিধে থাকলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।
  • যার হাঁচি, কাশি হচ্ছে তার থেকে ১ মিটার বা ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন। হ্যান্ড শেক বা এই ধরণের স্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
  • নাক, চোখ, মুখ হাত দিয়ে ছোঁওয়া বন্ধ করুন কারণ হাত দিয়ে আমরা এমন অনেক জায়গা ছুঁতে পারি যেখান থেকে ভাইরাস আসতে পারে এবং মুখ, নাক, চোখের মিউকাসের মাধ্যমে শ্বসন যন্ত্রে পৌঁছে যেতে পারে।
  • হাঁচি বা কাশির সময় কনুই ঘুরিয়ে নাকে, মুখে ঢাকা দিন, টিসু পেপার ব্যবহার করুন এবং তা দ্রুত ডাস্টবিনে ফেলে দিন, পরিষ্কার রুমাল ব্যবহার করুন এবং ব্যবহার হলে আবার পরিষ্কার করে নিন।
  • জ্বর, সর্দি-কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার দেখান। ডাক্তার দেখানোর সময় নিজের ভ্রমণ ইতিহাস জানাবেন। সাধারণ সর্দি-কাশি হলে ক্রোনা আক্রান্ত ভেবে নিয়ে আতঙ্কিত হবেন না। মনে রাখবেন, উপযুক্ত চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।

সব শেষে আরও একবার মনে করিয়ে দিই করোনা ভাইরাস নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করবেন না, আইননানুযায়ী তা দন্ডনীয় অপরাধ।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন