ভারতীয় বিচারালয়ের ইতিহাসে এমন বেশ কয়েকটি মামলার হদিশ পাওয়া যাবে যেখানে সংবিধান বর্ণিত নির্দিষ্ট কিছু ধারা নিয়ে পুনর্বার পর্যালোচনা করা হয়েছে। বচ্চন সিং বনাম পাঞ্জাব মামলা সেই তালিকারই অন্তর্ভুক্ত। এই মামলায় মূলত আদালত কর্তৃক মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা নিয়ে কিছু টানাপোড়েন চলেছিল। ৩৫৪(৩) ধারার অধীনে বচ্চন সিং নামক এক ব্যক্তির তিন জনকে হত্যা করা ‘বিশেষ কারণ’-এর আওতায় পড়ে কিনা এবং ঘটনাগুলির কারণে অভিযুক্তের মৃত্যুদন্ড পাওয়া কতখানি সাংবিধানিক সেইসব নিয়ে দীর্ঘ সওয়াল জবাব চলেছিল এই মামলায়। সুপ্রিম কোর্ট ‘বিরলতম ঘটনা’র ওপর জোর দিয়েছিল মৃত্যুদন্ডের ক্ষেত্রে। সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এই মামলার মীমাংসা করেছিলেন। যদিও বচ্চন সিংয়ের পক্ষে যায়নি আদালতের রায় তবে মৃত্যুদন্ড সংক্রান্ত সাংবিধানিক ব্যাখ্যাগুলিকে পুনরায় একবার বিচার করে তার বৈধতার ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করা হয়েছিল এই মামলায়।
বচ্চন সিং তাঁর স্ত্রীকে হত্যার জন্য ৩০২ ধারার অধীনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা ভোগ করেছিলেন। সাজা ভোগ করার পর তিনি মুক্তি পান এবং প্রায় ছয় মাস তাঁর খুড়তুতো ভাই হুকাম সিং ও তাঁর পরিবারের সাথে কাটিয়েছিলেন। হুকাম সিং-এর অ্যাপার্টমেন্টে বচ্চনের বসবাসকে হুকাম সিং-এর পরিবারের সদস্যরা, তাঁর স্ত্রী এবং ছেলে ভালো চোখে দেখেনি।
১৯৭৭ সালের ৪ জুলাই রাতের খাবারের পর সকলে ঘুমোতে চলে যায়। হুকাম সিংয়ের তিন কন্যা দুর্গা বাঈ, বীরান বাঈ এবং বিদ্যা বাঈ ভিতরের উঠোনে ঘুমাতে গিয়েছিলেন এবং বচ্চন সিং, হুকাম সিং এবং দেশা সিং গিয়েছিলেন বাইরের উঠোনে ঘুমোতে। মাঝরাতে অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় বিদ্যা বাঈয়ের। ঘুম ভেঙে তিনি দেখেন তাঁর বোন বীরান বাঈয়ের মুখে কুড়ুল দিয়ে আঘাত করছেন বচ্চন। বিদ্যা তাঁকে বাধা দিতে গেলে বচ্চন তাঁরও মুখে ও কানে আঘাত করে তাঁকে অজ্ঞান করে দেয়৷ পরে চিৎকার শুনে, দিওয়ান সিং ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখেন দেশা সিংকে কুড়ুল দিয়ে আঘাত করছেন বচ্চন। সেখান থেকে অল্প দূরত্বে ঘুমন্ত গুলাব সিংকে জাগানোর জন্য দিওয়ান অ্যালার্ম বাজান। এরপর দিওয়ান ও গুলাব সিং মিলে ছুটে যান দেশাকে বচ্চনের হাত থেকে বাঁচাতে। তাঁদের দুজনকে আসতে দেখে বচ্চন ছুটে পালান। তাঁকে ধাওয়া করেও ধরা যায়নি। দেশা এবং বীরান ছাড়াও হুকাম সিং-এর আরেক কন্যা দুর্গা বাঈকে খুন করেন বচ্চন এবং বিদ্যা বাঈকে গুরুতরভাবে জখম করেন।
মধ্যরাতে হুকাম সিং-এর বাড়ির বিচারসভায় বচ্চনকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। ট্রায়াল কোর্টেও বচ্চনকে মৃত্যুদন্ডের রায় শোনানো হয়, যে রায় পরবর্তীতে হাইকোর্টও বহাল রেখেছিল৷ এমনকি বিদ্যা বাঈয়ের আঘাতকেও ট্রায়াল ও হাইকোর্টে অমানবিক বলেই গণ্য করা হয়েছিল।
হাইকোর্টেও সুফল না পাওয়া গেলে বচ্চন সিং ১৩৬ ধারার সাহায্যে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন মৃত্যুদন্ডের রায়টির বিরূদ্ধে। সুপ্রিম কোর্টে করা আপিলে বচ্চন সিংয়ের তরফ থেকে যে প্রশ্নগুলি তোলা হয়েছিল সেগুলি হল – ১) হত্যাকান্ডের অপরাধে সংবিধানের ৩০২ ধারায় বর্ণিত মৃত্যুদন্ডের বিধান অসাংবিধানিক কিনা? ২) ৩০২ ধারা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন কিনা? ৩) সর্বোপরি মৃত্যুদন্ডের জন্য প্রয়োজনীয় ‘বিশেষ কারণ’ বা বিরলের মধ্যেও বিরলতম ঘটনার যে উল্লেখ ৩৫৪(৩) ধারায় রয়েছে বচ্চন সিং মামলার ঘটনাগুলি সেই ‘বিশেষ কারণ’-এর আওতায় পড়ে কিনা?
আবেদনকারী অর্থাৎ বচ্চন সিং-এর আইনজীবীদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে, ৩০২-এর অধীনে উল্লিখিত হত্যার অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ভারতীয় সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন বোঝায়। মৃত্যুদণ্ড ১৯(এ) থেকে (জি) ধারার অধীনে নিশ্চিত করা সমস্ত স্বাধীনতাকে শেষ করে দেয়। মৃত্যুদণ্ড দিয়ে কোনো সামাজিক উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। অন্যদিকে উত্তরদাতাদেরও কাছেও কঠোর যুক্তি ছিল৷ তাঁরা বলেন, সংবিধানের ১৯ ধারার অধীনে নিশ্চিত করা অধিকারগুলি কিছু যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধের অধীন।
বচ্চন সিং বনাম পাঞ্জাব মামলাটির দায়িত্ব ছিল পাঁচ বিচারপতির একটি বেঞ্চের হাতে। সেই পাঁচ জন বিচারপতি হলেন বিচারপতি ওয়াই সি চন্দ্রচূড়; বিচারপতি এ গুপ্তা; বিচারপতি এন. উন্টওয়ালিয়া; বিচারপতি পি এন ভগবতী ও বিচারপতি আর সারকারিয়া। দীর্ঘ সওয়াল জবাবের পর ১৯৮০ সালে সুপ্রিম কোর্ট যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা অবশ্য গিয়েছিল বচ্চন সিংয়ের বিপক্ষেই। প্রথমত, সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় দন্ডবিধির ৩০২ ধারা এবং সিআরপিসি ৩৫৪(৩) ধারার সাংবিধানিক বৈধতা ও অধিকারের বিরূদ্ধে করা চ্যালেঞ্জকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল। আদালত জানায় যে, ১৯(১)-এর অধীনে নিশ্চিত হওয়া ছয়টি মৌলিক অধিকার নিরঙ্কুশ অধিকার নয় এবং এই অধিকারগুলি অন্যের অনুরূপ অধিকারকে লঙ্ঘন বা আঘাত না করার জন্য ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও আদালতের দ্বারা এটি খুব স্পষ্ট করা হয়েছিল যে ১৯ অনুচ্ছেদের (২) থেকে (৬) ধারায় নাগরিকের অধিকার প্রয়োগের উপর যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করার জন্য রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে স্পষ্টভাবে সমর্থন করা হয়েছে। আদালত জানায়, ধারা ৩০২ সংবিধানের ১৯ বা ২১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন নয়। জগমোহন সিং বনাম উত্তরপ্রদেশ মামলায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে মৃত্যুদণ্ড ১৯(১) অনুচ্ছেদ দ্বারা সংরক্ষিত সমস্ত স্বাধীনতাকে খর্ব করে না এবং এটি সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদকে লঙ্ঘন করে না।
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল, আদালত ‘বিরল থেকে বিরলতম’ ঘটনার তত্ত্বটিকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করে মৃত্যুদন্ডের সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করে দেয়। সুপ্রিম কোর্ট জানায় যে, ৩০২ ধারার অধীনে হত্যার বিকল্প শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া অযৌক্তিক বা জনস্বার্থের পরিপন্থী নয়। এটা সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে। মৃত্যুদণ্ড প্রদানের সময়, সুপ্রিম কোর্ট ‘বিরল মামলাগুলির মধ্যেও বিরল’ নীতিটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি পুনর্নিশ্চিত করা হয়েছিল যে হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নিয়ম রয়েছে, তবে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ‘বিশেষ কারণ’-এর উল্লেখ করতে হবে। কোর্ট জানায় যে, চরম অপরাধের গুরুতর মামলা ব্যতীত, মৃত্যুদণ্ডের সাজা বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আরও বলে যে, মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়ার আগে বিচারকের উচিত অপরাধীর পরিস্থিতির সাথে অপরাধের পরিস্থিতি বিবেচনা করা। আদালত জানায়, যেসব ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তিও অপ্রতুল মনে হয়, সেইসব ‘বিশেষ’ ক্ষেত্রেই কেবলমাত্র মৃত্যুদন্ড দেওয়া উচিত। এই রায় ঘোষণার দ্বারা আদালত দন্ডবিধির ৩০২ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধি ১৯৭৩-এর ৩৫৪(৩) ধারাটিকে সাংবিধানিকভাবে বৈধ ঘোষণা করেছিল।
চারজন বিচারপতি মৃত্যুদন্ডের বৈধতার প্রতি সমর্থন দিলেও বিচারপতি ভগবতী একমাত্র যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিকল্প হিসাবে মৃত্যুদণ্ড আরোপ করা অতি ভয়ঙ্কর এবং বেআইনি কারণ এটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ এবং ২১ লঙ্ঘন করে বলে মনে করেছিলেন।
তবে এই বচ্চন সিং বনাম পাঞ্জাব মামলা টি নিঃসন্দেহেই মৃত্যুদন্ড সংক্রান্ত আইনের ক্ষেত্রটিকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান