প্রাচীন ভারতীয় গণিতবিদেরা গণিতশাস্ত্রের অগ্রগতিতে কী পরিমাণ অবদান রেখেছিলেন তা তাঁদের কাজের দিকে ফিরে তাকালেই বুঝতে পারা যায়। প্রাচীন ভারতের অসামান্য মেধাসম্পন্ন সব গণিতবিদের ভিড়ে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন বৌধায়ন (Baudhayana)। তবে বৌধায়নের কাজ দেখে অনুমান করা হয় যে তিনি কেবল গণিতের প্রতি আগ্রহ থেকেই গণিত নিয়ে চর্চা করেননি, গণিতকে আসলে তিনি ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছিলেন। মনে করা হয় তিনি একজন বৈদিক পুরোহিত এবং দক্ষ কারিগরও ছিলেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নিয়ম-কানুন প্রদানের জন্য শুল্বসূত্র লিখেছিলেন তিনি। বৈদিক যুগের বলিদানের যে বেদি তার আকার কেমন হবে গাণিতিকভাবে তার নির্দেশ দিয়েছিলেন বৌধায়ন। যে কৃতিত্ব গণিতবিদ পিথাগোরাসকে দেওয়া হয়, তা বৌধায়নেরই প্রাপ্য ছিল বলেই মনে করা হয়। বৌধায়ন সূত্র গ্রন্থটি আজও সারস্বত সমাজের কাছে খুবই মূল্যবান।
তথ্যের অপ্রতুলতার কারণেই গণিতবিদ বৌধায়নের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। তাঁর কাজকর্মের সাহায্যেই ঐতিহাসিকেরা তাঁর যথাযথ পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। ঐতিহাসিকদের মতে, আনুমানিক ৮০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে এই প্রতিভাশালী গণিতবিদ বৌধায়নের জন্ম হয়।
জানা যায় যে, তিনি দুই হাজারেরও বেশি ধর্মপুস্তিকা রচনা করেছিলেন। বৌধায়নের রচিত তেমনই কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পুস্তিকা (treatise) হল, বেদভ্রুতি, বেদান্ত, রত্নমঞ্জুষ, ধর্মসূত্র, গৃহসূত্র ইত্যাদি। গণিতে তাঁর আগ্রহ কেবল নিজস্ব ভাল লাগার জন্য ছিল না, বরং ধর্মীয় কাজেই গণিতকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন। ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠানের নিয়মকানুন নির্ধারণের কাজ তিনি করেছিলেন। তাঁর লেখা শুল্বসূত্র থেকে অনুমান করা হয় তিনি নিশ্চয়ই একজন বৈদিক পুরোহিতও ছিলেন। তবে তার পাশাপাশি গণিত এবং দর্শনশাস্ত্রে বৌধায়নের যা অবদান তা পরবর্তী প্রজন্মের পন্ডিতদেরও দারুণভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিল। বিখ্যাত সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ পাণিনি তাঁর মহাগ্রন্থ ‘অষ্টাধ্যয়ী’তে বৌধায়নকে ‘গুরু’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। আবার পরবর্তীকালে কিংবদন্তি গণিতবিদ ও শূন্যের আবিষ্কর্তা হিসেবে খ্যাত আর্যভট্টও ‘বৌধায়ন সূত্রে’র ভিত্তিতেই তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অনেক আবিষ্কার করেছিলেন।
বৌধায়নের রচনা থেকে অনেক পন্ডিত তাঁকে একজন সুদক্ষ কারিগর হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। সেই কারিগরির কাজেই তিনি গণিতের ব্যবহারিক প্রয়োগ করেছিলেন। মূলত বেদি নির্মাণের মতো কাজে পরিমাপের হিসেবনিকেশের জন্য গণিতকে কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি। ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কাজ করতে গিয়ে গণিতের নানাবিধ তত্ত্বকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন বৌধায়ন। তবে যে উদ্দেশ্যেই হোক, গণিতশাস্ত্রে যে অবদান তিনি রেখেছিলেন তা আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
বৌধায়ন নামটির সঙ্গেই যে কাজটির কথা প্রসঙ্গত উঠে আসে, সেটি হল বৌধায়ন সূত্র। এটি মোট ছয়টি সূত্রগ্রন্থের সমাহার। সেই ছয়টি গ্রন্থ হল, শ্রৌতসূত্র, কর্মান্তসূত্র, দ্বৈধসূত্র, গৃহসূত্র, ধর্মসূত্র এবং শুল্বসূত্র। এগুলির মধ্যে এই শেষতম গ্রন্থ অর্থাৎ শুল্বসূত্রটিই বৌধায়নের গাণিতিক প্রতিভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। বৌধায়ন সূত্রের সূত্রগুলি আবার কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় শাখার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
বৌধায়নের গৃহসূত্রে গার্হস্থ আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে, আবার শ্রৌতসূত্রে মূলত বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান, আরতি, যজ্ঞ, ইত্যাদির নির্দেশাবলী সংক্রান্ত আলোচনা রয়েছে। বৈদিক ঐতিহ্য শ্রৌত (শ্রুতি ভিত্তিক) এবং স্মার্ত (স্মৃতি ভিত্তিক)—এই দুই ভাগে বিভক্ত। শ্রৌতসূত্রগুলি আবার স্মার্তসূত্র থেকে আলাদা। মনে করা হয় বৌধায়ন শ্রৌতসূত্র প্রাচীনতম শ্রৌতসূত্রগুলির মধ্যে অন্যতম।
বৌধায়নের যে ধর্মসূত্র তা নিয়ে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। এই ধর্মসূত্রের যে একটিমাত্র ভাষ্য পাওয়া গেছে সেটি হল গোবিন্দস্বামীনের ‘বিবরণ’। এই ভাষ্যের রচনাকালও অনিশ্চিত তবে অলিভেলের মতে, এটি খুব বেশি প্রাচীন নয়।
এই ধর্মসূত্র মোট চারটি গ্রন্থে বিভক্ত ছিল। বুহলার এবং কেন-এর মতো পন্ডিতদের মতে, এই চারটির মধ্যে শেষ দুটি গ্রন্থ পরবর্তীকালের সংযোজন। তবে ধর্মসূত্রের প্রথম বইটি ছাত্রদের প্রতি উৎসর্গীকৃত। সেখানে ছাত্রজীবন সম্পর্কিত নানা গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিগত আলোচনা রয়েছে। এছাড়াও তাতে সামাজিক শ্রেণী, রাজার ভূমিকা, বিবাহ ইত্যাদি বিষয় নিয়েও গভীর রেখাপাত করা হয়েছে। দ্বিতীয় বইটিতে তপস্যা, উত্তরাধিকার, নারী, গৃহকর্তা, জীবনের আদেশ ইত্যাদি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। তৃতীয় বইয়ের বিষয়বস্তু হল: পবিত্র গৃহকর্তা, আরণ্যক সন্ন্যাসী ও তপস্যা এবং চতুর্থ বইটিতে রয়েছে যোগ অনুশীলন, তপস্যা ও বিবাহ সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে আলোচনা।
তবে বৌধায়নের আসল প্রতিভার পরিচয় লুকিয়ে রয়েছে তাঁর শুল্বসূত্রের ভিতরে। এই গ্রন্থটিকে প্রাচীনতম গণিতগ্রন্থগুলির মধ্যে একটি বলে বিবেচনা করা হয়। আসলে গণিতের বই লেখবার উদ্দেশ্য নিয়ে এই গ্রন্থ বৌধায়ন রচনা করেননি। মূলত ধর্মীয় উদ্দেশ্যে, বৈদিক যজ্ঞের বলিদানের বেদি নির্মাণের জন্য গণিতের ব্যবহার করেছিলেন তিনি। সেই বেদি নির্মাণের জন্য গাণিতিক পরিমাপ কী হবে তা সঠিকভাবে উল্লেখ করে গিয়েছিলেন তিনি। এই বই থেকেই অনুমান করা হয় তিনি একজন বৈদিক পুরেহিত ও দক্ষ কারিগর ছিলেন। যে উদ্দেশ্যেই হোক, এই গ্রন্থের তিনটি অধ্যায়ে তিনি বেশ কিছু গাণিতিক তত্ত্ব ও ফলাফল লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর শুল্বসূত্রের সেই গণিতচর্চা থেকেই পিথাগোরাসের উপপাদ্যের সমতুল্য গণিতের হদিশ মেলে। এর থেকে এও প্রমাণিত হয় যে, পিথাগোরাসের জন্মের অন্তত এক হাজার বছর আগেই পিথাগোরাসের উপপাদ্যের মূল ধারণাটি আবিষ্কার করেছিলেন বৌধায়ন। তাছাড়াও এই বইতে জ্যামিতি নিয়েও চর্চা লক্ষ করা যায়। এছাড়াও এই বই থেকেই জানা যায় তিনি ২-এর বর্গমূলও নির্ণয় করেছিলেন।
এই বইয়ের সূত্র ধরেই সংক্ষেপে গণিতে বৌধায়নের অবদানগুলির দিকে তাকানো যাক।
বৌধায়নকে প্রথম পাই-এর মান আবিষ্কারকদের মধ্যে অন্যতম একজন বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। তাঁর ধারণা অনুযায়ী পাই-এর আনুমানিক মান ৩। বৌধায়নের শুল্বসূত্রে পাই-এর বেশ কয়েকটি মান পাওয়া যায়। আসলে বিভিন্নরকম বৃত্তাকার নির্মাণের জন্য বিভিন্ন মান অনুমান করে তা ব্যবহার করেছিলেন তিনি। এই মানগুলির মধ্যে কয়েকটি মান আজকের দিনে পাই-এর মান হিসেবে বিবেচিত হওয়ার খুবই কাছাকাছি।
বৌধায়ন ২-এর বর্গমূল নির্ণয়ের পদ্ধতিও বের করেছিলেন।
পিথাগোরাসের উপপাদ্যের ধারণাটি সম্পর্কে অনেক আগেই যে বৌধায়ন অবগত ছিলেন, তা শুল্বসূত্রের একটি শ্লোক থেকেই জানা যায়। সেই শ্লোকের অর্থ করলে দাঁড়ায়, কর্ণের দৈর্ঘ্য বরাবর একটি দড়ির এলাকা যতটুকু হয়, উল্লম্ব এবং অনুভূমিক দিকগুলির একত্রীকরণে ততটুকুই এলাকা তৈরি হয়। এছাড়াও বৌধায়ন এমন একটি বৃত্তের অনুসন্ধান করেছিলেন যার ক্ষেত্রফল একটি বর্গক্ষেত্রের সমান। তিনি এও বুঝতে পেরেছিলেন যে বর্গক্ষেত্রের ভিতরের বৃত্তের ক্ষেত্রফল সেই বর্গক্ষেত্রের বাইরের বৃত্তের ক্ষেত্রফলের অর্ধেক।
বেদি নির্মাণের সূত্রেই আয়তক্ষেত্র, বর্গক্ষেত্র নিয়ে অনেক চর্চা করেছিলেন তিনি। তাঁর সেই চর্চার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ফলাফল হল,
যেকোনো রম্বসে তীর্যক (বিপরীত কোণের সঙ্গে সংযোগকারী রেখা) পরস্পরকে সমকোণে দ্বিখণ্ডিত করে।
দ্বিতীয়ত, একটি আয়তক্ষেত্রের কর্ণগুলি সমান এবং একে অপরকে দ্বিখণ্ডিত করে।
একটি আয়তক্ষেত্রের মধ্যবিন্দু একটি রম্বস গঠন করে যার ক্ষেত্রফল আয়তক্ষেত্রের অর্ধেক।
একটি বর্গক্ষেত্রের মাঝের বিন্দুগুলিকে যুক্ত করে গঠিত বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল মূলটির অর্ধেক।
বৌধায়নের এইসমস্ত গাণিতিক হিসেবনিকেশ গণিতশাস্ত্রকে তো সমৃদ্ধ করেছেই, আগামী প্রজন্মের কাছে এক নতুন ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত করে দিয়েছিল।
অনেকে মনে করেন ৭৪০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে ভারতবর্ষের এই মহান গণিতবিদ ও দার্শনিক বৌধায়নের মৃত্যু হয়েছিল। তবে তা নিয়েও সংশয়ের অবকাশ রয়ে গেছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান