ব্যবসার কথা উঠলে এই ক্ষেত্রটিতে বাঙালি জাতির অপারগতার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করা হয় বারেবারে। ব্যবসায় যে বাঙালি চুড়ান্ত অসফল সেই কথাটা সরবে ঘোষণা করা হয়। তবে এই কথাটা বর্তমান বাঙালি সম্পর্কে খাটলেও স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী বাঙালির গায়ে এই কলঙ্ক দেওয়া যাবে না। বরং মনে রাখতে হবে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে স্বদেশী আন্দোলনের যুগে ভারতবাসীকে অর্থনৈতিক দিক থেকেও স্বাবলম্বী হওয়ার ডাক দিয়ে ব্যবসার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে দিয়েছিলেন একজন বাঙালি। বিখ্যাত একজন রসায়নবিদ হিসেবেই তিনি পরিচিত, নাম আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তিনি ভারতের প্রথম সরকারী মালিকানাধীন ঔষধ উৎপাদক কোম্পানি “বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস” (Bengal Chemicals and Pharmaceuticals) এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের চাকরি ছাড়াও বিকল্প একটি রাস্তা তিনি দেখিয়েছিলেন ভারতবাসীকে। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সফলতা দেখে ভারতবাসী ব্যবসার প্রতি মনোযোগ দিয়েছিল তা বলাই বাহুল্য।

১৯০১ সালের ১২ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত কলকাতা শহরের বুকে বাঙালি রসায়নবিদ প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিটি গড়ে উঠেছিল।
তখন দেশজুড়ে স্বদেশী আন্দোলনের দামামা বেজে গিয়েছে। ব্রিটিশের অত্যাচার অসহনীয় হয়ে উঠেছে ভারতবাসীর পক্ষে। বিপ্লবীরা প্রাণ পণ করে নেমে পড়েছিলেন দেশের কাজে। তখন একজন শিক্ষিত চিন্তাশীল মানুষ অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, কেবল সশস্ত্র সংগ্রাম করে নয়, ভারতবাসীকে সবসময় আর ইংরেজের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে চলবে না। তাকে হতে হবে আত্মনির্ভরশীল। তার জন্য সর্বাগ্রে যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং স্বাতন্ত্র্য প্রয়োজন তাও অনুভব করেছিলেন তিনি। হয়ত সেই চেতনা আরও কিছু মানুষের মধ্যেও তখন জেগেছিল, কিন্তু এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রথম এগিয়ে এসেছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়নের অধ্যাপক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। শিক্ষক হলেও আদতে তিনি যে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিলেন তা জানতেন সকলেই। একদল নিবেদিতপ্রাণ ছাত্রকে তিনি গবেষণার জন্য বেছে নিয়েছিলেন।
এখন বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে তাকানো যাক। প্রফুল্লচন্দ্রের বিষয় যেহেতু রসায়ন তাই ব্যবসার প্রসঙ্গেও তিনি সেই রসায়ন থেকে সরে গিয়ে অন্য কিছু করবার প্রয়াস করেননি। তৈরি করেছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম ঔষধ কোম্পানি।
প্রথমে ১৮৯২ সালে ৯১, আপার সার্কুলার রোডের একটি ভাড়া নেওয়া বাড়িতে কয়েকজন তরুণ ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে বেঙ্গল কেমিক্যাল ওয়ার্কস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। তখন সেই কোম্পানির মূলধন ছিল ৭০০ টাকা। প্রফুল্লচন্দ্র বাঙালি তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তার মনোভাব গড়ে তুলতে এবং তাদের সামনে ব্রিটিশদের চাকরির একটি সফল বিকল্প হাজির করতে চেয়েছিলেন। তারই ফল এই বেঙ্গল কেমিক্যালস। সেই ১৮৯২ সালে ইউরোপীয় ওষুধ প্রস্তুতকারকদের একপ্রকার একটি চ্যালেঞ্জই ছুঁড়ে দিয়েছিলেন সেই বাঙালি তরুণ বৈজ্ঞানিকের দল। প্রফুল্লচন্দ্র প্রাচীন ভারতের জ্ঞানকে পশ্চিমে উদ্ভাবিত ওষুধ তৈরির আধুনিক পদ্ধতির সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ওষুধ তৈরির উপাদান কিন্তু তাঁরা বিদেশ থেকে আমদানি করেননি, তার পরিবর্তে দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করেছিলেন। কবিরাজদের কাছ থেকে আয়ুর্বেদিক রেসিপি সংগ্রহ করতে শুরু করেন তাঁরা। বিশিষ্ট চিকিৎসকদের সহায়তায় তাঁরা নিশ্চিতও হয়ে নিতেন যে তাঁদের তৈরি রাসায়নিক পণ্য ও ওষুধ ব্রিটিশদের পণ্যের মানকে ছুঁতে পেরেছে কিনা৷ সম্পূর্ণ স্বদেশী সম্পদকে কাজে লাগিয়ে যে একটি সফল ব্যবসা দাঁড় করানো সম্ভব তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র ও তাঁর দেশপ্রেমিক ছাত্রদল। ১৮৯৩ সালের অধিবেশনের সামনে বেঙ্গল কেমিক্যালস তাদের ভেষজ পণ্যগুলি উপস্থাপন করেছিলেন।
বেঙ্গল কেমিক্যালসের ব্যবসা যত সম্প্রসারিত হতে থাকে, পণ্য যত বাড়তে থাকে আপার সার্কুলার রোডের ভাড়া বাড়িতে স্থান সংকুলানের ততই সমস্যা হতে শুরু করে। এদিকে কোম্পানি উত্তরোত্তর সফলতা পেতে থাকে। তখন প্রফুল্লচন্দ্র কোম্পানিতে দুই লক্ষ টাকার অতিরিক্ত তহবিল যোগ করেছিলেন এবং ১৯০১ সালে ব্যবসাটিকে একটি লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত করেন। ১৯০১ সালের ১২ এপ্রিল কোম্পানিটির নামকরণ হয় বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় কলকাতার মানিকতলায় একটি জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে বেঙ্গল কেমিক্যালসের প্রথম কারখানা তৈরি হয়েছিল। এই কেম্পানির জন্য আধুনিক কারখানা তৈরি করতে সেই সময় জাতীয় নেতা রাসবিহারী ঘোষও অর্থসাহায্য করেছিলেন। এরপর ১৯২০ সালে পানিহাটিতে বেঙ্গল কেমিক্যালসের দ্বিতীয় একটি কারখানা তৈরি করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালে একটি কারখানা মুম্বাইতে এবং ১৯৪৯ সালে একটি কারখানা তৈরি করা হয় কানপুরে। পরবর্তীকালে লাহোরেও এই কোম্পানির একটি ফ্যাক্টরি খোলা হয়েছিল। ভারতের বাইরেও এর পণ্যের দারুণ চাহিদা ছিল।

১৯০৩ সালে বেঙ্গল কেমিক্যালসে একজন রসায়নবিদ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক রাজশেখর বসু। তাঁর পরিচালন-দক্ষতা দিয়ে তিনি বেঙ্গল কেমিক্যালসকে যেমন সমৃদ্ধ করেছিলেন তেমনই এর বিজ্ঞাপনী প্রচারেও সাহায্য করতেন তিনি। স্থানীয় ভাষা অর্থাৎ বাংলা ভাষায় রাজশেখর বেঙ্গল কেমিক্যালসের বিজ্ঞাপন শুরু করেছিলেন। পণ্যগুলির সব কাব্যিক নাম তিনি দিতেন এবং কোন কোন বিজ্ঞাপনে আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার লাইনও ব্যবহার করতেন। এইভাবে রাজশেখর বসু নিজের উদ্ভাবনী শক্তিকে প্রচারের কাজে লাগিয়ে বেঙ্গল কেমিক্যালসকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯০৮ সাল নাগাদ বেঙ্গল কেমিক্যালস বাংলার শিল্পক্ষেত্রে নিজের একটি মর্যাদাপূর্ণ আসন তৈরি করে ফেলেছিল।
বেঙ্গল কেমিক্যালসের একটি জনপ্রিয় পণ্য হল ক্যানথারিডিন নামক একটি চুলের তেল। এছাড়াও ফিনিওল, লাইসলের মতো জীবানুনাশক, ন্যাপথলিন বল, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি মলম, অ্যান্টি-স্নেক ভেনম সিরাম ইত্যাদি হল বেঙ্গল কেমিক্যালসের কয়েকটি বহু ব্যবহৃত ও বিক্রিত পণ্য। শেষোক্ত দ্রব্যটি অর্থাৎ অ্যান্টি-স্নেক ভেনম সিরামটি হাইপার-ইমিউনাইজিং ঘোড়াদের থেকে প্রাপ্ত প্লাজমা দিয়ে তৈরি হয়। কারখানাটির একটি নিজস্ব আস্তাবল পর্যন্ত রয়েছে। কোম্পানিটি অবশ্য ধীরে ধীরে তাদের পণ্যেও বৈচিত্র এনেছে। একসময় প্রসাধনী সামগ্রী, সুগন্ধি, হাসপাতাল এবং অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ইত্যাদিও তৈরি করতে শুরু করেছিল।
কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানাসময় নানারকম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীনও হয়েছিল। বিশেষত এই কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা বেঙ্গল কেমিক্যালসের সঙ্গে জড়িত স্বদেশের যে আবেগ তাকে গুরুত্ব না দিয়ে আরও বেশি মুনাফা দাবি করতেন। এমনকি একজন মন্তব্যও করেছিলেন যে, বড়বাজারের কোন দোকানের মতো একে চালানো যেতে পারে না। এত কিছু সত্ত্বেও এই বেঙ্গল কেমিক্যালসের মধ্যে কিন্তু একটি জাতীয় সত্ত্বার বীজ নিহিত ছিল এবং একই সঙ্গে এটি ছিল প্রাচ্যের বৃহত্তম রাসায়ানিক উৎপাদক সংস্থা।
১৯৪৪ সালে প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর থেকে বেঙ্গল কেমিক্যালসের বাজার পড়ে যেতে থাকে। স্বাধীনতার পরে ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বেঙ্গল কেমিক্যালস লোকসানের মুখ দেখতে শুরু করে। ১৯৭০ সালে কোম্পানিটি সাংঘাতিকভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এরপর ১৯৭৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেঙ্গল কেমিক্যালসের ব্যবস্থাপনা ভারত সরকার কর্তৃক গৃহীত হয় এবং ১৯৮০ সালের ১৫ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় সরকার সংস্থাটির জাতীয়করণ করে। একটি নতুন সরকারী কোম্পানি হিসেবে ১৯৮১ সালের ২৭ মার্চ বেঙ্গল কেমিক্যালস কোম্পানিটি বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড নাম নিয়ে শুরু হয়। ১৯৯৩ সালের ১৪ জানুয়ারি বোর্ড ফর ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল রিকনস্ট্রাকশন (BIFR) কোম্পানিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পঙ্গু ঘোষণা করেছিল। বিআইএফআর-দ্বারা বেঙ্গল কেমিক্যালসের পুনরুজ্জীবনের একটি প্যাকেজও অনুমোদিত হয়েছিল। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে, সরকার কোম্পানির পুনরুজ্জীবনের জন্য পুনর্বাসন প্রকল্প অনুমোদন করেছিল।
বহুবছর লোকসান সহ্য করবার পরে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কোম্পানিটি লাভের মুখ দেখতে পেয়েছিল। ২০১৭ অর্থবর্ষে এই কোম্পানি প্রায় ১১১ কোটি টাকা লাভ করেছিল। ২০১৯ অর্থবর্ষে বেঙ্গল কেমিক্যালস আয় করেছিল ১১৯.৭ কোটি টাকা। অতএব বুঝতে পারা যাচ্ছে কীভাবে প্রায় ধুঁকতে থাকা একটি কোম্পানি উত্তরোত্তর তাদের লাভের অঙ্ক বাড়িয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।
২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ মহামারীর গ্রাসে গোটা বিশ্ব হয়ে উঠেছিল আতঙ্কিত। বৈজ্ঞানিকেরা এই অদৃশ্য মারণ ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন সঠিক ওষুধ তৈরি করতে। সেই মহামারীর সময়ে বেশ কয়েকটি ওষুধকে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR) মান্যতা দিয়েছিল। সেই ওষুধগুলির মধ্যে একটি হল হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন। আইসিএমআর এই ওষুধটি সুপারিশ করলে বেঙ্গল কেমিক্যালস ওষুধটি তৈরির ছাড়পত্র পেয়ে গিয়েছিল। কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে বেঙ্গল কেমিক্যালসের এই ওষুধ খুবই উপকারে লেগেছিল সাধারণ মানুষের।
শতবর্ষ পুরোনো এই বেঙ্গল কেমিক্যালস নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে দিয়ে আজও সগৌরবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, সেই সঙ্গে ধারণ করে রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাসকেও।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to কে. সি. পালের ছাতা | সববাংলায়Cancel reply