সববাংলায়

কালনেমির লঙ্কাভাগ

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হলো প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “কালনেমির লঙ্কাভাগ”। এই প্রবাদটির অর্থ কোনো কাজ শুরু করার আগেই লাভের হিসাব করা। অথবা কোনো বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত আশা করে নিরাশ হওয়া। এই প্রবাদটির সাথে রামায়ণের যোগ রয়েছে। এই প্রবাদের উৎপত্তি সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের চলে যেতে হবে রামায়ণের সময়কালে। বর্তমান জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এই প্রবাদটির প্রয়োগ করে থাকি।

রাক্ষসরাজ সুমালী ও গন্ধর্বকন্যা কেতুমতীর সন্তান হলেন কালনেমি। কালনেমির এক মাত্র বোনের নাম ‘কৈকসী’। কৈকসী ছিলেন লঙ্কাধিপতি রাবণের মা। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে কালনেমি ছিলেন লঙ্কাধিপতি রাবণের মামা। এখানে উল্লেখ্য, রাক্ষসের অর্থ মানুষ খেকো কোন অতিকায় জীব নয়। শাস্ত্র অনুযায়ী রাক্ষসরা হলেন সাধারণ মানুষ ও জলভূমির রক্ষাকর্তা। পুরাণ অনুযায়ী রাক্ষসদের জন্ম হয় দক্ষের কন্যা দিতির গর্ভ থেকে। দক্ষের দুই কন্যা দিতি ও অদিতির বিয়ে হয়েছিল কাশ্যপমুনির সাথে। দিতির গর্ভ থেকে জন্ম হয় দানবদের ও অদিতির গর্ভ থেকে জন্ম হয় দেবতাদের। দিতির এক পুত্র ময়দানব ছিলেন রাক্ষস তথা দানবদের শিল্পী। সেই রকমই দেবতাদের শিল্পী হলেন বিশ্বকর্মা। ময়দানব রাক্ষসকূলের প্রয়োজনীয় অস্ত্র তৈরি করতেন। এই ময়দানব হলেন সম্পর্কে রাবণের শ্বশুর অর্থাৎ রাবণের স্ত্রী মন্দোদরীর বাবা। ময়দানব শক্তিশেল নামক এক ভয়ঙ্কর ও অব্যর্থ অস্ত্র তৈরি করেন। এই অস্ত্রটি ছিল অষ্টঘন্টাযুক্ত মহাবেগবান ও সাপের জিহ্বার মতো অগ্নিস্ফুলিঙ্গযুক্ত ও বিচ্ছুরণকারী। শ্বশুর ময়দানবের থেকে এই অস্ত্রটি রাবণ লাভ করেছিলেন।

রাম রাবণের যুদ্ধকালে রাবণপুত্র মেঘনাদকে বধ করেন লক্ষণ। শোকার্ত রাবণ প্রতিশোধ নিতে এই অব্যর্থ অস্ত্রটির প্রয়োগ করেন লক্ষণের উপর। এই অস্ত্রের প্রয়োগে লক্ষ্মণ প্রায় অর্ধমৃত হয়ে যান। লক্ষ্মণকে বাঁচাতে সেনাদলের সুদক্ষ শল্যচিকিৎসক সুষেন মহাবীর হনুমানকে পাঠান গন্ধমাদন পর্বত থেকে মহৌষধি আনতে। এই পর্বতের দক্ষিণ শিখর থেকে বিশল্যকরণী, সুবর্ণকরণী, মৃতসঞ্জিবনী ও সন্ধানী এই চারপ্রকার ভেষজ ঔষধের গাছ লক্ষ্মণকে সেবন করালে সে পুনরায় প্রাণ ফিরে পাবে।

গন্ধমাদন পর্বতে হনুমানের যাত্রার খবর পেয়ে রাবণ হনুমানকে হত্যার জন্য মামা কালনেমিকে নিয়োগ করেন। সাথে ঘোষণা করেন হনুমানকে বধ করতে পারলে পুরস্কার স্বরূপ তিনি অর্ধেক লঙ্কা মামা কালনেমিকে প্রদান করবেন। এই খবরে আনন্দিত কালনেমি হনুমানকে হত্যার প্রস্তুতি ছেড়ে লঙ্কাভাগের স্বপ্ন দেখতে থাকেন। মহাবীর হনুমানের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি কীভাবে লড়াই করবেন সেই চিন্তা বা প্রস্তুতি না করে তাঁর মাথায় ঘুরতে থাকে লঙ্কার কোন দিক তিনি নেবেন। অথচ হনুমানের মতো বীরের সঙ্গে যুদ্ধে কীভাবে তিনি জয় লাভ করবেন তার কোনও ভাবনাই কালনেমির মাথায় নেই। কালনেমির মনের এই খবর কৌশলে হনুমান জানতে পেরে যান। মহাশক্তিশালী হনুমান গন্ধমাদন পর্বতের সামনে থেকে কালনেমিকে সজোরে শূন্যে নিক্ষেপ করেন এবং কালনেমি সোজা লঙ্কায় রাবণের সিংহাসনের কাছে এসে আছড়ে পড়েন। কোনরকম প্রস্তুতি ছাড়া অতিরিক্ত লাভের স্বপ্ন দেখে কালনেমির এই পরিণতি হয়েছিল। বলা বাহুল্য, এই হঠকারিতার জন্যই কালনেমির লঙ্কাভাগ করার স্বপ্নপূরণ হয়নি আর লক্ষ্মণও তাঁর জীবন ফিরে পান।

উদাহরণ – যে সব ছাত্র ছাত্রীরা ঠিকমতো পড়াশোনা না করে ভাল ফল করার স্বপ্ন দেখে তাদের ক্ষেত্রে কালনেমির লঙ্কাভাগ প্রবাদটি যথাযোগ্য।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ৪৫-৪৬ পৃঃ

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading