জানুয়ারিতে শীত ভালই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। শীতকাল বেড়ানোর জন্য আদর্শ সময়। ভাবছেন তো কোথায় যাওয়া যায়? এই জানুয়ারিতে ঘুরে আসুন বাংলার এই পাঁচটি জায়গায়।
১) মুর্শিদাবাদ
প্রাচীন ভারতের অন্যতম সম্পদশালী শহর এবং স্বাধীন বাংলার শেষ রাজধানী মুর্শিদাবাদের আনাচে-কানাচে রয়েছে বাঙলার সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যের ইতিহাস। গ্রীষ্মকালে মুর্শিদাবাদের তাপমাত্রা প্রচণ্ড বেশি থাকে তাই গ্রীষ্মকালে একানে ভ্রমণ কষ্টকর, তুলনামূলকভাবে শীতকাল মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের জন্য আরামদায়ক। মুর্শিদাবাদে থাকবার জন্য নানারকম হোটেল রয়েছে। বহরমপুরের কাছে বা হাজারদুয়ারির কাছে রয়েছে বেশ কিছু হোটেল। শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে কাশিমবাজারের রাজবাড়িটিতেও বর্তমানে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
মুর্শিদাবাদে অনেক দ্রষ্টব্য রয়েছে। সেগুলো টোটো বা অটো বা গাড়ি রিজার্ভ করে যেতে পারেন। নিজের গাড়ি থাকলে তাতেও যেতে পারেন। মুর্শিদাবাদ বলতেই প্রথমে যে স্থানটির কথা আসে, তা অবশ্যই হাজারদুয়ারি। এর ভিতরে এক হাজার খানা দরজা রয়েছে যে কারণে এইরকম নাম। এখানে আসল দরজা ৯০০টি এবং বাকি ১০০টি কৃত্রিম দরজা। এছাড়াও অন্যান্য ঐতিহাসিক জায়গার মধ্যে রয়েছে নিজামত ইমামবাড়া, কাটরা মসজিদ, কাঠগোলা বাগান, মোতিঝিল, জগৎ শেঠের বাড়ি , আজিমুন্নিসা বেগমের সমাধি ও মসজিদ, খোশবাগ এবং অন্যান্য। মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
আরও পড়ুন: বাঁকুড়া পুরুলিয়ার পাঁচটি জনপ্রিয় পাহাড়
২) শুশুনিয়া পাহাড়
আপনাকে যদি বলা হয় জানুয়ারিতে ঘুরে দেখুন বাংলার পাঁচ জায়গা, তাহলে সেই তালিকায় অবশ্যই রাখা দরকার বাঁকুড়ার উল্লেখযোগ্য পাহাড় শুশুনিয়া। এই পাহাড় শুধু পর্যটক বা পর্বতারোহীদের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম শিলালিপিটি এই পাহাড়েই অবস্থিত এবং বিভিন্ন প্রাচীন জীবাশ্ম থাকার ফলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছেও এই জায়গার গুরুত্ব অপরিসীম। পাহাড়ের একপারে বড়ু চণ্ডীদাসের জন্মভিটে ছাতনা। আর অন্যদিকে আদিবাসী ঘেরা গ্রাম। যাঁদের জীবন ও জীবিকা জুড়ে রয়েছে এই পাহাড়। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পাহাড়ের কোলে বাস করেন স্বয়ং ভোলা মহেশ্বর। এখানে তাঁর একটি মন্দিরও রয়েছে। ফিবছর শ্রাবণ মাসে এখানে বসে শ্রাবণী মেলা। মহাদেবের মাথায় জল ঢালতে শুশুনিয়ার ঝরণা থেকে জল সংগ্রহ করতে ছুটে আসেন অগনিত ভক্ত।
পাহাড়ের তিনটি ধাপ। প্রথম পাহাড় ওঠার পর উপর থেকে চারিদিকে সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। সঙ্গে পরিমাণমত জল বিস্কুট রাখবেন। খুব বেশি নেওয়ার দরকার নেই, কারণ প্রথম পাহাড়ে ওঠার কিছুটা ধাপে ধাপেই এখানে জল বিস্কুটের অস্থায়ী দোকান। তারপর দ্বিতীয় পাহাড়ে যাওয়ার জন্য রাস্তা চলে গেছে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। আপনি ইচ্ছা করলে সারা দিনই এই পাহাড়ে ট্রেকিং করতে পারবেন। তবে বিকালের আগে অবশ্যই নেমে আসবেন। স্থানীয় বাসিন্দারা সন্ধ্যের পরে লজের বাইরে বেরোতে নিষেধ করে। পাহাড়ে ওঠার সময় হনুমানদের থেকে সাবধান থাকবেন। পাহাড়ে ওঠার মুখেই সাধারণত তারা থাকে। তবে মানুষজনকে খুব বিরক্ত করে না এবং পাহাড়ের ওপরেও তাদের উৎপাত নেই বললেই চলে।
এখানের পাথরের শিল্প বিখ্যাত। বাঁকুড়ার ঘোড়ার মূর্তি তো একপ্রকার বাংলার আইকন বলা যায়। সেগুলোও এখানে পাওয়া যায়, আপনি কিনতে পারেন। শুশুনিয়া ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
১) পূর্বস্থলী
ছাড়ি গঙ্গার ধারে শীতকালে পিকনিক করতে আসা এবং ছাড়ি গঙ্গার বুকে নৌকাভ্রমণের অসাধারণ অভিজ্ঞতা পেতে আপনাকে যেতে হবে পূর্বস্থলী। পাখিপ্রেমীদের কাছে অবশ্য এখানে যাওয়ার কারণ হল শীতকালে উত্তরবঙ্গ তথা উত্তর এশিয়া, ইউরোপ, তিব্বত, সাইবেরিয়া থেকে পরিযায়ী পাখিদের ভিড় দেখা। জায়গাটি পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলী ২ পঞ্চায়েত সমিতির অন্তর্গত চুপি গ্রামে অবস্থিত। লেকের পাড়ে যেখানে পিকনিক করা হয় তার নাম কাষ্ঠশালী। লেকের অন্যপাড়ে যে জায়গাটি আছে, তাকে বলে চুপির চর।
পূর্বস্থলী এসে দ্রষ্টব্য বা ঘোরার জায়গা মূলত দুটিই। পিকনিক স্পট এবং ছাড়ি গঙ্গা লেক। দলবল নিয়ে শীতকালে পিকনিক করতে আসার জন্য এটা আদর্শ স্থান হলেও মানুষের ক্রমাগত ভিড় আর হই-হট্টগোলে কয়েক বছর ধরেই পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা কমছে। তাদের কথা মাথায় রেখে পিকনিক করার সময় একটু সংযত হওয়া দরকার।
ভূগোলের ছাত্র এবং পাখিপ্রেমীদের পছন্দের জায়গা হতে পারে ছাড়ি গঙ্গা লেক। অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ নিয়ে ভূগোলের বইতে আমরা পড়েছি, এই লেকে গিয়ে সেটা দেখা যায়। গঙ্গার গতিপথ পরিবর্তনের ফলে তৈরি হয়েছে এই অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ। নৌকা করে এই লেক ঘুরে দেখা যায়। বড় নৌকায় সর্বাধিক ৮ জন এবং ছোট নৌকায় সর্বাধিক ৪ জন ভ্রমণ করতে পারে। নৌকা আগে থেকে বুক করার কোন উপায় নেই। স্পটে এসেই বুক করতে হবে। অন্যান্য আরও নিয়মসমেত পূর্বস্থলী ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
৪) সুন্দরবন
যাঁরা শীতের অ্যাডভেঞ্চার ভালবাসেন, এই ডিসেম্বরে ঘুরে আসুন সুন্দরবন থেকে। সুন্দরবনের পাখিরালয়, দয়াপুর এলাকায় প্রচুর বেসরকারি লজ, হোটেল বা রিসোর্ট রয়েছে। এছাড়া সজনেখালিতে আছে সরকারি পর্যটন আবাস এখানে সেখানে থাকতে হলে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের ওয়েবসাইটে আগে বুকিং করতে হবে। তবে সুন্দরবনে বেড়াতে আসা অনেক মানুষই নদীর বুকে লঞ্চ ভাড়া করে থাকতে ভালবাসেন। সেই ব্যবস্থাও এখানে আছে৷ তবে লঞ্চ ভাড়া করতে গেলে আগে বুকিং করে রাখতে হবে৷
রোমাঞ্চের পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের দেখাও পেতে পারেন। তাছাড়া লঞ্চে করে ঘুরতে ঘুরতে রোদ পোহাতে থাকা কুমীর তো আছেই। বাঘ বা কুমীর ছাড়াও হরিণ, সজারু, গোসাপ, বন বিড়াল, মেছো বিড়াল, বাঁদর, বুনো শূকর, ভোঁদড়ের দেখা মিলবে। পাখিদের মধ্যে চোখে পড়বে গারাপোলা, মদনটাক, বাঁশকুয়াল, গয়াল, করমকুলি, বুনোহাঁস, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, টিয়া, দোয়েল, ফিঙে, দুধরাজ, রক্তরাজ, হাট্টিমাটিম ইত্যাদি নানা প্রজাতির পাখি। তবে সুন্দরবন সফরের মজাটাই হল নদীর বুকে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং রোমাঞ্চ। বিশেষ করে মাতলা নদীর বুকে যখন লঞ্চ ছুটে চলে, তখন মাতলার ব্যাপ্তি এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ জোগায় মনে। সুন্দরবন ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
৫) গৌড়
এই জানুয়ারিতে ঘুরে আসতে পারেন প্রাচীন বঙ্গদেশের রাজধানী গৌড়। বহু রাজবংশের উত্থান পতনের নীরব সাক্ষী গৌড় আজ রক্ষনাবেক্ষণের অভাবে আগের জৌলুশ হারিয়েছে অনেকটাই। তবুও ইতিহাসের টানে প্রতিবছরই দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর মানুষ আসেন গৌড় ভ্রমণে। শোনা যায়, একসময় গুড়ের ব্যবসার জন্য এই জনপদ ছিল বিখ্যাত আর সেই থেকেই গৌড় নামটা এসেছে। আবার পুরাণ বলে, সূর্যবংশীয় রাজা মান্ধাতার দৌহিত্র গৌড় এই অঞ্চলের অধীশ্বর ছিলেন, সেখান থেকেই এই নামকরণ।
ঐতিহ্যবাহী এই জনপদের বেশিরভাগ অংশ এখন পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার অন্তর্গত, বাকি অংশ পড়েছে বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। গৌড় ভ্রমণে বেরিয়ে প্রথমেই দেখে নেওয়া যেতে পারে পিয়াস বারি বা পিয়াজবাড়ি। পিয়াসবাড়ির কাছেই শ্রীচৈতন্যের স্মৃতিবিজড়িত রামকেলি গ্রাম। গৌড়ের সৌধগুলোর মধ্যে অন্যতম বারোদুয়ারী বা বড়সোনা মসজিদ। এছাড়াও গৌড়ের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ দিল্লির কুতুব মিনারের আদলে তৈরি ফিরোজ মিনার। এছাড়া রয়েছে ইউসুফ শাহের তৈরি এক গম্বুজওয়ালা মসজিদ চিকা মসজিদ।
ইতিহাসের খোঁজে আসা পর্যটকেরা আশপাশে ঘুরে দেখে নিতে পারেন তাঁতিপাড়া মসজিদ, ছোটসোনা মসজিদ, লোটন মসজিদ, গুণমন্ত মসজিদ, চমকাটি মসজিদ, কোতোয়ালি দরওয়াজা। শোনা যায়, এই কোতোয়ালি দরওয়াজা দিয়েই নাকি বখতিয়ার খলজি গৌড়ে প্রবেশ করেন। গৌড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এরকম অজস্র জায়গা সমেত গৌড় ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৬
আরও পড়ুন: পুরী ভ্রমণ
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান