ধর্ম

চন্দ্র ও তারার প্রেম

চন্দ্র ছিল অসংখ্য গ্রহ এবং নক্ষত্রের অধিপতি। একসময় দেবতাদের গুরু বৃহস্পতির স্ত্রী তারাকে দেখে চন্দ্র তার প্রেমে পড়ে যায়। তারাও চন্দ্রের প্রেমে পড়ে যায়। চন্দ্র ও তারার প্রেম এমনই জায়গায় যায় যে  বৃহস্পতির ঘর ছেড়ে তারা চন্দ্রের সাথে চলে যায়। এর ফলে বৃহস্পতি রেগে যায় এবং  চন্দ্রের সাথে তার বিবাদ বাধে। চন্দ্র তারাকে কিছুতেই ফেরত দিতে চায় না এবং তাকে ফিরিয়ে আনতে এক বিশাল যুদ্ধ বেধে যায়।সেই যুদ্ধে কি হয়েছিল সেটাই এখানে বিস্তারিত আলোচনা করব।

একদা ভগবান ব্রহ্মা চন্দ্রকে  অনেক গ্রহ-নক্ষত্রের উপর আধিপত্য করার ক্ষমতা দান করল। চন্দ্র মনে মনে এই নিয়ে একটু অহংকারীও ছিল।এদিকে বৃহস্পতি ছিল দেবগুরু। তার ছিল এক সুন্দরী স্ত্রী, তারা। কিন্তু স্ত্রীর প্রতি মন না দিয়ে বেশিরভাগ সময়েই সে দেবতাদের কাজে ব্যস্ত থাকত। আর এদিকে তার স্ত্রী তারা একাকী দিন কাটাত। এইরকম ভাবেই দিন কাটছিল।এমনি সময়  একদিন চন্দ্র ও তারার দেখা হল।

তারার সৌন্দর্যে চন্দ্র এবং চন্দ্রের ব্যক্তিত্বে তারা প্রভাবিত হল। দুজনেই একে অপরের প্রেমে পড়ল। বেশ কিছুদিন  চন্দ্র ও তারার প্রেম চলতে থাকল। কিন্তু বৃহস্পতি নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকায় কিছু টের পেল না। অবশেষে একদিন তারা চন্দ্রের সাথে তার বাড়ি গেল আর ফিরে এল না। বৃহস্পতি প্রথমে এই বিষয়ে আমল দেয় নি। কিন্তু বেশ কিছুদিন কেটে গেলেও তারা যখন ফিরে এল না, তখন বৃহস্পতি তার এক শিষ্যকে পাঠাল।কিন্তু তারা ফিরে এল না। এরপর বৃহস্পতি নিজে চন্দ্রের বাড়ি এল। কিন্তু চন্দ্র তারাকে ফেরত দিল না। তখন বৃহস্পতি রেগে গিয়ে তাকে বলল, “তোমার লজ্জা করে না, তুমি আমার স্ত্রীকে এভাবে অন্যায়ভাবে আটকে রেখেছ?”
“অন্যায়ভাবে?” হেসে উঠল চন্দ্র, “আমি তো তারাকে জোর করে রাখিনি। সে যেতে চাইলে যেতেই পারে। কিন্তু তুমি কি দিয়েছো তাকে যে সে তোমার সাথে যাবে? এতটুকু সময় দিয়েছো ওর জন্য? একবারও জানতে চেয়েছো ও কি চায়?”
“খবরদার!” গর্জে উঠল বৃহস্পতি, “আমাদের বিষয় নিয়ে তোমার সাথে আলোচনা করতে চাই না। মনে রেখো তুমি যা করছ তা ব্যভিচার। আমি তোমার গুরু আর তারা গুরুপত্নী। গুরুপত্নী মায়ের সমান তুমি জানো না? আমি অভিশাপ দিতে পারি তোমায়।”
“দিতে পারো তো দাও।” চন্দ্র বলল, “যার নিজের ঘর সামলানোর ক্ষমতা নেই সে আমায় অভিশাপ দেবে। আর হ্যাঁ ব্যাভিচার প্রসঙ্গে বলে রাখি প্রতি ঋতুচক্রের পর নারী শুদ্ধ এবং নতুন হয়ে ওঠে। আমাদের মিলনে কোনো ব্যভিচার নেই। এবার যেতে পারো তুমি।” চন্দ্র নিজের ঘরে ফিরে গেল। বৃহস্পতি তার দরজায় দাঁড়িয়ে ফুঁসতে লাগল।

বাড়ি ফিরে এসে বৃহস্পতি তারার অনুপস্থিতি অনুভব করল। এতোদিন যে স্ত্রীয়ের দিকে ভালোভাবে চেয়ে দেখেনি তার কথা মনে করে তার বুকের ভেতরটা কেমন হতে থাকল। কষ্টে সে আরো কিছুদিন কাটাল কিন্তু একাকী তারও ভালো লাগছিল না। আবার সে চন্দ্রের বাড়ি এল। এবারে দরজার বাইরে থাকা প্রহরীরা তাকে ঢুকতে দিল না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে অভিশাপের কথা বলে চেঁচাতে লাগল। শুনতে পেয়ে চন্দ্র বাড়ির বাইরে এল। সে দেবগুরুকে বলল, “আগেও বলেছি আবারও বলছি যদি তারা নিজে থেকে যেতে চায় যেতেই পারে। কিন্তু তোমার কথায় ওকে আমি ছাড়ছি না। তোমার অভিশাপ দেওয়ার ইচ্ছা হলে যতখুশি দাও। যা ইচ্ছা হয় করো।” বলে চন্দ্র ভেতরে চলে গেল।

এরপর ক্রুদ্ধ বৃহস্পতি ইন্দ্রের কাছে গেল। ইন্দ্র চন্দ্রের বাড়ি দূত পাঠালেও চন্দ্র কিছুতেই রাজি হল না। তখন ক্রুদ্ধ ইন্দ্র চন্দ্রালোকে হামলা করার কথা বলল। খবর পেয়ে দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য চন্দ্রকে সাহায্যের কথা জানাল। দেব দানবে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হল। তখন ব্রহ্মা মধ্যস্থতা করল। তার এবং অন্যান্য বড় বড় দেবতাদের অনুরোধে চন্দ্র অবশেষে তারাকে বৃহস্পতির কাছে ফেরত পাঠাল।

বৃহস্পতি সাময়িক ভাবে জয়ী হয়েছে ভেবে আনন্দিত হলেও যখন দেখা গেল তারা গর্ভবতী, তখন সে অস্বস্তিতে পড়ল। শিশুটির জন্মগ্রহণের পর দেখা গেল শিশুটি অসম্ভব সুন্দর। শিশুটির অমন সৌন্দর্য দেখে বৃহস্পতি ও চন্দ্র দুজনই পছন্দ করে ফেলল। চন্দ্র দাবী করল এই সন্তান তার। বৃহস্পতি আবার অস্বস্তিতে পড়ল। আবারো একটা জেদাজেদির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল কিন্তু তারা কিছুই বলছিল না। সবার পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত তারা বলতে বাধ্য হলেন বাচ্চাটি চন্দ্রের।

সেই ছেলেটির নাম বুধ। সেই চন্দ্রবংশের প্রতিষ্ঠা করল। তার ছেলে পুরূরবা উর্বশীকে বিয়ে  করেছিল। তাদের বংশধরেরাই প্রতিষ্ঠা করে মহাভারতের সমস্ত বিখ্যাত বংশগুলো।

তথ্যসূত্র


  1. "মহাভারতের অষ্টাদশী", আনন্দ পাবলিশার্স, চতুর্থ মুদ্রণ - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, অধ্যায়ঃ উর্বশী, পৃষ্ঠাঃ ১২- ১৩
  2. http://utkarshspeak.blogspot.com/chandra-tara-adultery
  3. https://isha.sadhguru.org/brihaspatis-curse-taras-child
  4. http://www.kamakoti.org/kamakoti/chandra-tara

১ Comment

1 Comment

  1. Pingback: চন্দ্রবংশের প্রতিষ্ঠা | সববাংলায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!