ইতিহাস

চরণ সিং

চৌধুরী চরণ সিং(Chaudhary Charan Singh) ছিলেন ভারতবর্ষের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী যিনি চরণ সিং নামেই সবার কাছে পরিচিত। কাজের প্রতি তাঁর সততা পরিশ্রম আর আত্মত্যাগের জন্য তিনি ‘হার্ড টাস্কমাষ্টার’ নামেও পরিচিত।

১৯০২ সালের ২৩ ডিসেম্বর উত্তর প্রদেশের মিরাট জেলায় একটি মধ্যবিত্ত চাষি পরিবারে চরণ সিংয়ের জন্ম হয়। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের নেতা, রাজা নাহার সিং। তাঁর ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচার থেকে পালতে নাহার সিং এর অনুগামীদের সাথে চরণ সিংয়ের দাদু উত্তরপ্রদেশের বুলান্দসাহেরে পালিয়ে যান । 

চরণ সিংয়ের প্রথমিক পড়াশোনা‌ শুরু হয় গ্রামের স্কুলেই । ছাত্র হিসাবে তিনি খুব মেধাবী ছিলেন। তিনি ১৯২৩ সালে বিজ্ঞান নিয়ে গ্র্যাজুয়েট হন। তারপর ১৯২৫ সালে আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি আইনের প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন। ১৯২৬ সালে চরণ সিং আইনের ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর ১৯২৮ সাল থেকে তিনি গাজিয়াবাদে আইন নিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করেন । 

চরণ সিংয়ের কর্মজীবন শুরু হয় ৩৪ বছর বয়েসে। ১৯৩৭ সালে উত্তরপ্রদেশের চাঁপারউলি থেকে তিনি একজন বিধায়ক নির্বাচিত হন। ঋণী চাষিদের ঋণের হার কমাতে এবং জমিদারি প্রথার চড়া ঋণের হাত থেকে বাঁচাতে ১৯৩৮ সালে তিনি ‘এগ্রিকালচারাল প্রোডিউস মার্কেট বিল’ প্রকাশ করেন। ১৯৪৬ সালে পন্ডিত গোভিন্দ বল্লভ পান্থের সরকারে তিনি পার্লামেন্টারী সেক্রেটারি নিযুক্ত হয়ে কর বিভাগ, চিকিৎসা বিদ্যা বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ, বিচার বিভাগের মত বিষয়গুলো দেখাশোনা করতেন। ১৯৫১ সালে তাঁকে ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ করা হয়। ১৯৫৯ সালে তাঁকে ‘মিনিস্টার অব্ রেভিনিউ এন্ড এগ্রিকালচার’ পদে নিয়োগ করা হয়। শ্রী সি.বি গুপ্তার সময়ে ১৯৬০ সালে তিনি ছিলেন ‘মিনিস্টার অব্ হোম অ্যান্ড এগ্রিকালচার’। ১৯৬২-৬৩ সালে শ্রীমতী সুচেতা কৃপালিনির মন্ত্রীত্বে তিনি ‘মিনিস্টার অব্ এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফরেস্টের’ দ্বায়িত্ব পালন করেন। কংগ্রেস দল ভেঙে যাওয়ার পর চরণ সিং ১৯৭০ সালে দ্বিতীয় বারের জন্য উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হন। তিনি বিভিন্ন ভাবে উত্তর প্রদেশের সেবা করেন। ‘ল্যান্ড হোল্ডিং অ্যক্ট, ১৯৬০’ কে তিনি ফিরিয়ে আনেন। ১৯৬৭ সালের ৩ এপ্রিল তিনি পঞ্চম বারের জন্য উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মনোনীত হন। ১৯৭৭ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৭৮ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত চরণ সিং ছিলেন ভারতবর্ষের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ১৯৭৭ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৭৯ সালের ২৪ জুলাই পর্যন্ত তিনি ছিলেন ভারতের তৃতীয় উপপ্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৯ সালের ২৪ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৯ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত তিনি ছিলেন ভারতের অর্থমন্ত্রী। অবশেষে ১৯৭৯ সালের ২৮ জুলাই তিনি ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মনোনীত হন। ১৯৭৯ সালের ২৮ জুলাই থেকে ১৯৮০ সালের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চরণ সিং ছিলেন ভারতবর্ষের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী । 

চরণ সিংয়ের স্ত্রী ছিলেন গায়েত্রী দেবী। তাঁদের ছয় সন্তান ছিল। চরণ সিং সামাজিক সুবিচারের উপর বিশ্বাস করতেন । ঐতিহাসিকরা এবং জনসাধারণ তাঁকে ‘ভারতীয় চাষিদের জনক’ বলেন । তিনি তাঁর শেষ জীবনে অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য বই লেখেন যেমন ‘অ্যবোলিশান অব্ জামিন্দারি'(Abolition of Zamindari), ‘কো-অপরেটিভ ফার্মিং এক্স-রেইড'(Co-operative Farming X-rayed), ‘ইন্ডিয়াস পভার্টি‌ অ্যান্ড ইটস্ সলিউশন'(India’s Poverty and its Solution), ‘পেজান্ট‌ প্রোপ্রিয়েটরশীপ অর ল্যান্ড টু দ্যা ওয়ার্কার্স'(Peasant Proprietorship or Land to the Workers) এবং’ প্রিভেনশান অব্ ডিভিশন অব্ হোল্ডিং বিলো অ্যা সার্টেন মিনিমাম'(Prevention of Division of Holdings Below a Certain Minimum)। তাঁর জন্মদিনটি ‘কিষান দিবস’ অর্থাৎ কৃষক দিবস হিসাবে পালিত হয়।

১৯৮০ সালের ২৯ মে চরণ সিংয়ের মৃত্যু হয়।

১৯৯০ সালে তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে ভারত সরকার একটি স্মারক পোষ্ট স্ট্যাম্প চালু করে। উত্তরপ্রদেশের লখনৌয়ের অমাউশী বিমানবন্দর চরণ সিংয়ের নাম অনুসারে ‘চৌধুরী চরণ সিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ নাম দেওয়া হয় । এছাড়াও উত্তরপ্রদেশের মিরাট বিশ্ববিদ্যালয় ও বুলান্দসাহেরের একটা হাসপাতাল চরণ সিংয়ের নাম অনুসারে নাম দেওয়া হয় ।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।