বিবিধ

মহাজাগতিক কচ্ছপ – যার পিঠের ওপর এই জগৎ সংসার দাঁড়িয়ে

মহাজাগতিক কচ্ছপ

যুগে যুগে সব ধর্মেই এই পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য নিয়ে নানান লোক কথা উপকথা প্রচলিত আছে। প্রাচীন মানুষ তখনও যখন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি ভঙ্গির যুক্তিবোধে বলীয়ান হয়ে ওঠেনি তখন সে নিজের মত করেই এই বিশ্ব জগতের সৃষ্টি রহস্য খুঁজতে চেয়েছে তার মত করে। কল্পনার রঙে রঙিন সেসব লোককথা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালিত পালিত হয়েছে মানুষের মনে। তেমনই একটি লোকপুরাণ হল মহাজাগতিক কচ্ছপ। হিন্দু পুরাণ, চৈনিক পুরাণ কিংবা আমেরিকার আদিম উপজাতিদের লোককথায় আমাদের পৃথিবী সম্পর্কে এক আশ্চর্য লোককথা গড়ে উঠেছে এই মহাজাগতিক কচ্ছপ (Cosmic Turtle) নামকে কেন্দ্র করে। হাজার হাজার বছর ধরে এই লোক-বিশ্বাসটি চলে আসছে পৃথিবীর নানা গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মধ্যে। এই বিশ্বাসের অনুষঙ্গেই জুড়ে রয়েছে একটি ছবি যেখানে দেখা যায় একটি কচ্ছপের পিঠে কয়েকটি হাতি এবং তার উপরে রয়েছে আমাদের এই বিশ্ব। মহাবিশ্বের বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার পাশাপাশি লৌকিক বিশ্বাসের জায়গাতেও বিশ্ব সম্পর্কে এমনই নানাবিধ মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। আর এই মহাজাগতিক কচ্ছপের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে মহাজাগতিক হাতির কল্পনাও।

বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত নৃ-বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ব্রুনেট তাঁর ‘রিসার্চেস ইনটু দ্য আর্লি হিস্ট্রি অফ ম্যানকাইন্ড অ্যান্ড দ্য ডেভেলপমেন্ট অফ সিভিলাইজেশন’ বইতে লিখেছেন যে সম্ভবত এই মহাজাগতিক কচ্ছপের ধারণাটি প্রথম হিন্দু পুরাণেই উল্লিখিত হয়েছিল। একটি বৈদিক গল্পে দেখা যায় হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর দ্বিতীয় অবতার হিসেবে এক বিরাটাকায় কচ্ছপের বেশধারী কূর্মাবতারের উল্লেখ পাওয়া যায় যিনি এই পৃথিবীকে ধারণ করে আছেন এবং তার পিঠের উপরেই সমস্ত পর্বত দাঁড়িয়ে আছে। মহাজাগতিক কচ্ছপ মূলত হিন্দু পুরাণে ‘অকুপার’ নামেই পরিচিত, তবে কোনও কোনও স্থানে আবার একে ‘ছুক্য’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। প্রাচীন হিন্দু সাহিত্য ‘জ্ঞানরাজা’তে বলা হয়েছে যদি সামান্য শক্তি সম্পন্ন একটি শকুন ঠোঁটের মধ্যে একটি সাপকে নিয়ে আকাশে মাত্র তিন ঘন্টা সময় কাটাতে পারে তাহলে অকল্পনীয় শক্তির অধিকারী দেবতা একটি কচ্ছপের আকারে শূন্যে কয়েক কোটি বছর পৃথিবীকে ধারণ করে থাকতে পারবে না কেন। অন্যদিকে চিনের পুরাণে ‘আও’ (Ao) নামের একটি বিরাট কচ্ছপের কথা বলা হয়। চৈনিক কিংবদন্তী অনুসারে এই বিশ্বের স্রষ্টা দেবী নুয়া (Nuwa) মহাজাগতিক কচ্ছপের পা কেটে ফেলেছিলেন। গংগং (Gong Gong) নামের এক দেবতা যখন বুজু পর্বতকে ধ্বংস করে দেন, তখন স্বর্গকে ধরে রাখতে তিনি এই কচ্ছপের পা ব্যবহার করেছিলেন। এই কচ্ছপ আসলে তার পিঠের উপর বিশ্বকে ধারণ করছে না, বরং আকাশকে অনেক উপরে তুলে ধরে রাখছে মাত্র যাতে তা নীচে না পড়ে যায়। আমেরিকার আদিম উপজাতিদের মধ্যেও এই মহাজাগতিক কচ্ছপের ধারণাটি লক্ষ্য করা যায়। লিনেপ ও এরোকুইস জনগোষ্ঠীর মানুষদের কাছে এই বিশ্ব সৃষ্টির রহস্যের পিছনে রয়েছে এই মহাজাগতিক কচ্ছপের অনুষঙ্গ। সেখানে বলা হচ্ছে, এক বিশাল সামুদ্রিক কচ্ছপের পিঠের উপর মাটির স্তূপ জমতে জমতেই এই পৃথিবী তৈরি হয়েছে। ক্রমে ধীরে ধীরে তার আকার বাড়তে থাকে এবং সমগ্র বিশ্বকেই তখন কচ্ছপটি ধারণ করে। আজও উত্তর আমেরিকার বহু উপজাতি গোষ্ঠী তাদের মহাদেশকে কচ্ছপের দ্বীপ (Turtle Island) হিসেবে বিশ্বাস করে থাকেন। মহাশূন্যে এক বিশালাকায় কচ্ছপ এই বিশ্বকে ধারণ করে রেখেছে এই ছবিটিও লোককথার জগতে বহুল জনপ্রিয়। বহু যুগ যুগ ধরে এই ধারণা পরম্পরা-বাহিত হয়ে চলে আসছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মধ্যে।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে পৃথিবীর প্রায় সব জনজাতির লোক-বিশ্বাসের মূলে কেন একমাত্র প্রাণী হিসেবে কচ্ছপকেই নির্বাচন করা হল? এর উত্তরে ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত একটি নৃতাত্ত্বিক জার্নাল ‘ম্যান’-এর একটি সংখ্যায় পণ্ডিত জে মিলার লিখেছেন যে কচ্ছপের আকার-আকৃতির কারণেই এই পৌরাণিক বিশ্বাসে কচ্ছপ স্থান পেয়েছে। লিনেপদের বিশ্বাসে এই কচ্ছপ আসলে অধ্যবসায় এবং দীর্ঘায়ুর প্রতীক যা এই বিশ্বের চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায়। ১৬৭৮ থেকে ১৬৮০ সালের মধ্যে জ্যাসপার ড্যাঙ্কার্টস লিনেপ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই মহাজাগতিক কচ্ছপের কাহিনির উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন।

এরোকুইসদের লোককথা অনুসারে এই বিশাল পৃথিবী আসলে একটি মহাশূন্যে ভাসমান একটি দ্বীপ যা একটি স্বর্গীয় শান্তির জায়গা। সে সময় এই পৃথিবীর সমগ্র অংশ বিশালাকার মেঘ, সমুদ্র কিংবা জলে পরিপূর্ণ ছিল। বহু প্রাণী সেই সময়ে সমুদ্রের একেবারে তলদেশে গিয়ে সেখান থেকে মাটি-পলি আনার চেষ্টা করছিল ভূ-ভাগ তৈরির জন্য। কেবলমাত্র একটি ইঁদুর এই কাজ করতে সক্ষম হয় এবং সে তখন ঐ মাটি-পলি ইত্যাদি জমা করতে থাকে এক বিরাটাকায় কচ্ছপের পিঠের উপর। এই মাটি-পলির পরিমাণ যত বাড়তে থাকে, ততই কচ্ছপের আকারও বাড়তে থাকে। এভাবেই গড়ে ওঠে বিশালাকার এই কচ্ছপের দ্বীপ ওরফে আমাদেরই পৃথিবী। অন্যদিকে এই মহাজাগতিক কচ্ছপের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে মহাজাগতিক হাতির অনুষঙ্গও যা কিনা হিন্দু মহাকাশতত্ত্বে এক বিশেষ প্রতীক হিসেবে পরিচিত। পঞ্চম শতকে লেখা ‘অমরকোষ’ বইতে পৃথিবীকে ধারণকারী এমন আটটি পুরুষ হাতির উল্লেখ রয়েছে। যেমন – ঐরাবত, পুণ্ডরীক, বামন, কুমুণ্ড, অঞ্জন, পুষ্পদন্ত, সার্বভৌম এবং সুপ্রতীক। আবার রামায়ণে পৃথিবীর চারদিক ধারণকারী চারটি হাতির নাম বলা হয়েছে – পূর্বদিকে বিরূপাক্ষ, দক্ষিণে মহাপদ্ম, পশ্চিমে সৌমানস এবং উত্তরে ভদ্র। মহাজাগতিক কচ্ছপ এবং মহাজাগতিক হাতির অস্তিত্ব ও অনুষঙ্গ পরস্পরের সঙ্গে এভাবেই জড়িয়ে আছে।      

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন