আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “ধন্বন্তরি”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: অভিজ্ঞ ও সুদক্ষ চিকিৎসক। এই প্রবাদের সঙ্গে পুরাণ ও লোককাহিনির চিকিৎসকের যোগ রয়েছে যাঁর নাম ধন্বন্তরি। এখানে আমরা জেনে নেব “ধন্বন্তরি” প্রবাদটি এলো কীভাবে।
দেবতাদের চিকিৎসক বা দৈববৈদ্য হিসেবে ধন্বন্তরির পরিচয় ভারতীয় পুরাণ ও লোকসংস্কৃতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রাচীনকাল থেকেই রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও আরোগ্যের ক্ষেত্রে যিনি অতুলনীয় দক্ষতার প্রতীক, সেই আদর্শ চিকিৎসকের নাম হিসেবেই ধন্বন্তরি উচ্চারিত হয়ে আসছে। আজও সমাজে কোনো চিকিৎসক যখন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রোগ নিরাময় করেন, কিংবা কোনো ওষুধ যখন অব্যর্থভাবে কাজ করে, তখন আমরা প্রশংসাসূচকভাবে বলি—“এ তো একেবারে সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি!” এই প্রবাদমূলক ব্যবহার থেকেই বোঝা যায়, ধন্বন্তরির নাম কেবল পৌরাণিক চরিত্রে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি চিকিৎসা-দক্ষতার এক চিরন্তন প্রতীক।
পুরাণ অনুসারে, দেবতা ও অসুরদের সম্মিলিত আয়োজনে সমুদ্রমন্থনের সময় ধন্বন্তরি অমৃতভাণ্ড হাতে আবির্ভূত হন। অমৃতের সঙ্গে তাঁর আবির্ভাব মানবসভ্যতায় স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বকে প্রতীকীভাবে প্রতিষ্ঠা করে। তিনি শুধু অমৃতের ধারক নন, বরং আয়ুর্বেদের মূর্ত প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। এই কারণেই ধন্বন্তরিকে অনেক সময় আয়ুর্বেদের দেবতা বলা হয়।
অন্যদিকে, সূর্যের ঔরসে অশ্বিনীরূপা সংজ্ঞার গর্ভে জন্মগ্রহণকারী অশ্বিনী ও রেবন্ত — এই দুই ভ্রাতা অশ্বিনীকুমার নামে পরিচিত। তারা স্বর্গের প্রধান বৈদ্য হিসেবে খ্যাত এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রাচীনতম আচার্যদের অন্যতম। পুরাণে তাদের আয়ুর্বেদের জনক এবং চিকিৎসা-সারতন্ত্রের প্রণেতা বলা হয়েছে। দেবলোকের অসুস্থতা নিরাময় থেকে শুরু করে মানবজাতির কল্যাণ — সব ক্ষেত্রেই অশ্বিনীকুমারদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বলা হয়ে থাকে, সর্বপ্রথম ব্রহ্মা সহস্র অধ্যায় ও লক্ষ শ্লোকবিশিষ্ট আয়ুর্বেদ প্রকাশ করেন। ব্রহ্মার কাছ থেকে এই বিদ্যা লাভ করেন প্রজাপতি। পরবর্তীকালে প্রজাপতির নিকট থেকে অশ্বিনীকুমারদ্বয় আয়ুর্বেদ শিক্ষা করেন। তাদের কাছ থেকে ইন্দ্র এবং ইন্দ্রের কাছ থেকেই ধন্বন্তরি চিকিৎসাবিজ্ঞান লাভ করেন — এমন বর্ণনাও বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। আবার কোথাও কোথাও বলা হয়েছে, ধন্বন্তরি ছিলেন শঙ্কর ও গরুড়ের শিষ্য এবং তিনি ভাস্করের নিকট আয়ুর্বেদ শিক্ষা করেন। এই ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ধন্বন্তরির পরিচয় একক কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি একাধিক ধারার চিকিৎসা-ঐতিহ্যের সমন্বিত প্রতীক।
ধন্বন্তরির প্রণীত গ্রন্থ হিসেবে ‘চিকিৎসাতত্ত্ব বিজ্ঞান’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ব্রহ্মার নির্দেশে তিনি আয়ুর্বেদকে আটটি প্রধান শাখায় বিভক্ত করেন। এই আটটি শাখা হল — শল্যতন্ত্র (শল্যচিকিৎসা), শালাকাতন্ত্র (চক্ষু, কর্ণ, নাসা ও কণ্ঠরোগ চিকিৎসা), কায়চিকিৎসাতন্ত্র (দেহব্যাধির সাধারণ চিকিৎসা), ভূতবিদ্যাতন্ত্র (মানসিক ও অদৃশ্য কারণজনিত রোগ চিকিৎসা), কৌমারভূত্যতন্ত্র (শিশু ও প্রসূতি চিকিৎসা), অগদতন্ত্র (বিষচিকিৎসা), রসায়নতন্ত্র (বার্ধক্যনাশ ও দীর্ঘায়ু বিদ্যা)
এবং বাজীকরণতন্ত্র (বল ও প্রজনন শক্তি বৃদ্ধি)। এই বিভাজন থেকেই বোঝা যায় যে, প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞান কতটা সুসংগঠিত ও বিস্তৃত ছিল।
বিশ্বামিত্রের পুত্র সুশ্রুত ধন্বন্তরির নিকট আয়ুর্বেদ শিক্ষা করেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। মানুষের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে তিনি এই বিদ্যা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। আবার অন্য একটি কাহিনিতে বলা হয়, ধন্বন্তরি জন্মান্তরে কাশীর রাজা দিবোদাস রূপে আবির্ভূত হন এবং তাঁর কাছ থেকেই সুশ্রুত চিকিৎসাবিজ্ঞান লাভ করেন। ‘সুশ্রুত সংহিতা’ সুশ্রুত রচিত আয়ুর্বেদশাস্ত্রের এক অমূল্য গ্রন্থ, যেখানে শল্যচিকিৎসা ও শারীরবিদ্যার বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে সীমিত থাকায় তা পরিহার করা হলো।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই এই উপমহাদেশে চিকিৎসাবিজ্ঞান একটি সুদৃঢ় ও উন্নত শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ধন্বন্তরি নামে এক বা একাধিক চিকিৎসক, বৈদ্য কিংবা গুরু ছিলেন—এমন ধারণাও অমূলক নয়। ধন্বন্তরি ওঝা বা উপাধ্যায়ের কথাও লোকস্মৃতিতে পাওয়া যায়। এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের ফলেই ধন্বন্তরি নামটি ক্রমে চিকিৎসা-দক্ষতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
সুতরাং আজকের দিনে যখন আমরা কোনো চৌকস, অভিজ্ঞ ও রোগনির্ণয়ে পারদর্শী ডাক্তারকে, কিংবা অব্যর্থ কার্যকর কোনো ওষুধকে “ধন্বন্তরি” বলে অভিহিত করি, তখন তা নিছক প্রশংসা নয় — বরং হাজার বছরের চিকিৎসা-ঐতিহ্য ও বিশ্বাসেরই প্রতিধ্বনি। এই প্রবাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাস্থ্য ও আরোগ্যের সাধনা মানবসভ্যতার প্রাচীনতম ও সর্বাধিক মূল্যবান সাধনাগুলির একটি।
‘ধন্বন্তরি’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:
১। ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের ডাক্তারি প্রতিভার জন্য অনেকেই তাঁকে ধন্বন্তরি বলতেন।
২। বহু বছরের অভিজ্ঞতায় গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তারই গ্রামের লোকদের কাছে ধন্বন্তরি ধয়ে দাঁড়িয়েছেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ৮৭ পৃঃ


আপনার মতামত জানান