সববাংলায়

নরাণাং মাতুলক্রমঃ

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “নরাণাং মাতুলক্রমঃ”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: মানুষ মাতুল বা মামার অনুসরণকারী। মনে করা হয় ভাগ্নে মামার গুণ পায়, যেমন মামা তেমন ভাগ্নে। এই প্রবাদটির উৎসের সঙ্গে বাংলার পারিবারিক গঠনের প্রভাবের পাশাপাশি মহাভারতের সঙ্গেও যোগসূত্র পাওয়া যায়। এখানে আমরা জেনে নেব “নরাণাং মাতুলক্রমঃ” প্রবাদটি এলো কীভাবে।

এই প্রবাদটি কেবল রক্তসম্পর্কের অনুকরণ বোঝায় না; এটি আসলে একটি গভীর সামাজিক পর্যবেক্ষণ। ভারতীয় সমাজে মামা — অর্থাৎ মায়ের ভাই —ঐতিহ্যগতভাবে শিশুর জীবনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। অনেক পরিবারে শিশুর লালন‑পালন, স্নেহ, নিরাপত্তা, এমনকি চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রেও মামার প্রভাব স্পষ্ট থাকে। তাই প্রবাদটি রূপকভাবে বলে যে মানুষের স্বভাব, সিদ্ধান্ত, আচরণ — সবকিছুতেই তার মামার ছাপ দেখা যায়। এই প্রবাদটি আরও বিস্তৃত অর্থে বোঝায় যে মানুষ তার বেড়ে ওঠার পরিবেশকে অনুসরণ করে। মামা এখানে সেই পরিবেশের প্রতীক—যে পরিবেশে স্নেহ, শিক্ষা, মূল্যবোধ ও আচরণগত ধারা শিশুর মধ্যে প্রবেশ করে। তাই “নরাণাং মাতুলক্রমঃ” আসলে বলে যে মানুষের চরিত্রে তার নিকটজনদের, বিশেষত মায়ের পরিবারের, প্রভাব গভীরভাবে কাজ করে। অনেক সময় এটি রসিকতার সুরেও বলা হয়—যখন কারও স্বভাব বা আচরণ তার মামার সঙ্গে অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তখন হাসতে হাসতে বলা হয়, “দেখো, মামার মতোই হয়েছে।”

এই প্রবাদের ব্যবহার মহাভারতেও দেখা গেছে। মদ্রদেশের রাজা শল্যের বোন মাদ্রী হলেন পাণ্ডুর দ্বিতীয় স্ত্রী। মাদ্রীর গর্ভজাত সন্তান হলেন নকুল ও সহদেব। সুতরাং মদ্ররাজ শল্য নকুল ও সহদেবের মামা। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে প্রথমে পাণ্ডবপক্ষে যোগদান করার ইচ্ছে থাকলেও শল্য দুর্যোধনের কাছে বিশেষ মর্যাদা ও সাদর আমন্ত্রণ পাওয়ায় কৌরবপক্ষে যোগদান করেন। যুদ্ধের শেষভাগে মহাবীর কর্ণের সারথি হন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষ দিন অর্থাৎ অষ্টাদশ দিনে শল্য কৌরবদের সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধ করেন এবং অবশেষে যুধিষ্ঠিরের শক্তি অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন।

যুদ্ধের ষোড়শ দিনে দ্রোণের পর কৌরবপক্ষে সেনাপতিত্ব করেন কর্ণ । অর্জুন ব্যতীত সকল পাণ্ডবই কর্ণ কর্তৃক তখন পরাজিত। এই যুদ্ধে মদ্ররাজ শল্য কর্ণের সারথি হন এবং নানারকম কটূক্তি করে কর্ণের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ তিনি দুর্যোধনের চাতুরিতে কৌরবপক্ষে যোগ দিলেও মনে মনে নিজের ভাগ্নেদের অর্থাৎ পাণ্ডবদের জয় চাইতেন।

শল্য যখন কর্ণকে নানা কটূক্তি করছিলেন সে সময় কর্ণও শল্যকে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন যে, পাণ্ডবেরা অজ্ঞাতবাসে রাজা বিরাটের ভবনে থাকার সময় অন্যের সেবা করলেও তাদের মধ্যে যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনের কাজ ছিল উন্নত শ্রেণির। কিন্তু শল্যরাজের ভাগ্নে নকুল ছিলেন গোরক্ষক আর সহদেব অশ্বপালক। শল্য তাদের মামা। তিনি কর্ণের রথের সারথি মাত্র। সুতরাং তার ভাগ্নেরাও তার মতো কাজই করেছে। মামার গুণ ভাগ্নেরাও পেয়েছে। যার যা কাজ তাকেই তা মানায় –

গোরক্ষী সহদেবশ্চ নকুলো হয়রক্ষকঃ।
বৈরাটে কুরুদায়াদৌ নরাণাং মাতুলক্রমঃ ॥

‘নরাণাং মাতুলক্রমঃ’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:

১। রুদ্র কোন কাজ শুরু করার আগে বড় বড় ডায়লগ দেয়, সবাই ব্যঙ্গ করে বলে “নরাণাং মাতুলক্রমঃ”, মামার মতোই কাজের চেয়ে কথার পরিমাণ বেশি।
২। রাহুলের স্বভাব দেখে সবাই বলে, ‘নরাণাং মাতুলক্রমঃ’ — ছেলেটা একেবারে তার মামার মতোই হাসিখুশি ও উদার।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ৯৬ পৃঃ

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading