সব

বিভিন্ন প্রকার নির্বাচন (ভারত)

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হল ভারত। যেকোন গণতান্ত্রিক দেশের মূল ভিত্তি হল সেই দেশের নির্বাচন পদ্ধতি। নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমেই সাধারণ মানুষ তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন। ভারতে বিভিন্ন প্রকার নির্বাচন সংঘটিত হয় যাতে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষ নির্দল হিসেবে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা হওয়ায় ভারতে কেন্দ্রে ও রাজ্যে দুই ধরণের আইনসভা রয়েছে – কেন্দ্রের আইনসভা সংসদ নামে পরিচিত যার দুটি কক্ষ যথাক্রমে রাজ্যসভা ও লোকসভা। রাজ্যের আইনসভা বিধানসভা, তবে কোন কোন রাজ্যে বিধানপরিষদ বলে আরেকটি কক্ষও থাকে।

ভারতে সংঘটিত বিভিন্ন প্রকার নির্বাচন -এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হল – লোকসভা নির্বাচন, রাজ্যসভা নির্বাচন, বিধানসভা নির্বাচন, বিধান পরিষদ নির্বাচন, পুরসভা নির্বাচন, পঞ্চায়েত নির্বাচন।

লোকসভা নির্বাচন (Lok Sabha Election): ভারতের লোকসভা নির্বাচন সাধারণ নির্বাচন নামে পরিচিত যা দেশের প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন যা সমগ্র দেশ জুড়ে একই সময়ে সংঘটিত হয়। লোকসভা নির্বাচন সাধারণত প্রতি ৫ বছর অন্তর হয় তবে কোনকারণে আইনসভা তার সম্পূর্ণ মেয়াদ অতিক্রম না করতে পারলে তার আগেও হতে পারে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতের জনগণ তার নিজ নিজ লোকসভা কেন্দ্র (constituencies) থেকে আইনসভার নিম্ন কক্ষ অর্থাৎ লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব করবার জন্য একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন। এই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাংসদ (Member of Parliament) বলে যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের ভিত্তিতে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে আইনসভার (লোকসভা বা রাজ্যসভা) সদস্য হতেই হবে। লোকসভা নির্বাচন একটি সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়া (direct election) যেখানে ১৮ বছরের বেশি যেকোন সাধারণ নাগরিক ভোট দান করে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। লোকসভা ভোটে প্রার্থী হওয়ার ন্যুনতম বয়স ২৫ বছর।
সংবিধান অনুযায়ী সর্বাধিক ৫৫২ টি লোকসভার আসন থাকতে পারে, এর মধ্যে রাজ্যগুলি থেকে ৫৩০টি ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি থেকে ২০ টি আসন ও রাষ্ট্রপতি দ্বারা মনোনীত ২জন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সদস্য থাকতে পারেন। বর্তমানে ৫৪৩ টি আসনে নির্বাচন হয় ও ২ টি আসনে রাষ্ট্রপতি দ্বারা নির্বাচিত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান প্রতিনিধি থাকেন।
জন সংখ্যার ভিত্তিতে লোকসভা কেন্দ্রের সীমানা নির্ধারিত হয় ও আদমসুমারির পর কেন্দ্রের সীমানা পরিমার্জন করা হতে পারে।
লোকসভা ভোট ভারতের নির্বাচন কমিশন দ্বারা পরিচালনা করা হয়ে থাকে।

রাজ্যসভা নির্বাচন (Rajya Sabha Election): সংসদের উচ্চ কক্ষের নাম রাজ্যসভা। রাজ্যসভায় সদস্য নির্বাচন হয় পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে। এক্ষেত্রে রাজ্যের নির্বাচিত বিধায়করা ভোট দিয়ে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচন করেন। রাজ্যসভায় মনোনীত সদস্যদের মেয়াদ ৬ বছরের তবে প্রতি ২ বছর অন্তর এক তৃতীয়াংশ সদস্য অবসর নেন ও সেই আসনগুলিতে ২ বছর পর পর নির্বাচন হয়।
সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যসভায় সর্বাধিক ২৫০ টি আসন থাকতে পারে যার মধ্যে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে ২৩৮টি ও ১২ টি রাষ্ট্রপতি মনোনীত আসন। রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের জন্য প্রার্থীর বিশেষ বিভাগে পারদর্শিতা ও জ্ঞান থাকা দরকার। বর্তমানে ২৩৩ জন নির্বাচিত ও ১২ জন রাষ্ট্রপতি মনোনীত অর্থাৎ মোট ২৪৫ জন সদস্য আছেন।

বিধানসভা নির্বাচন (Legislative Assembly Election): রাজ্যের আইনসভার নাম বিধানসভা। লোকসভা নির্বাচনের মতই প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিধানসভার সদস্যদের নির্বাচিত করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী এক একটি রাজ্যে সর্বনিম্ন ৬০ থেকে সর্বাধিক ৫০০ টি পর্যন্ত আসন থাকতে পারে। তবে বিশেষ আইনে ব্যতিক্রম হিসেবে সিকিম, গোয়া, মিজোরাম ও পুদুচেরিতে ৬০ এর কম আসন আছে। সিকিম বিধানসভা সর্বনিম্ন ৩২ ও উত্তর প্রদেশ বিধানসভা সর্বাধিক ৪০৩ টি আসনবিশিষ্ট। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২৯৪ টি আসনে নির্বাচন হয়। বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করা প্রার্থীদের বিধায়ক (Member of Legislative Assembly) বলা হয় যাঁরা মুখ্যমন্ত্রী মনোনয়ন করেন, মনোনীত মুখ্যমন্ত্রীর মোট বিধায়কের অর্ধেকের বেশি বিধায়কের সমর্থন প্রয়োজন। বিধানসভা নির্বাচন সাধারণত প্রতি ৫ বছর অন্তর হয় তবে কোনকারণে আইনসভা তার সম্পূর্ণ মেয়াদ অতিক্রম না করতে পারলে তার আগেও হতে পারে। বিধানসভা নির্বাচনের নিয়ম মোটামুটি লোকসভা নির্বাচনের মতই এবং এটিও পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন।

বিধানপরিষদ নির্বাচন (Legislative Council Election): কেন্দ্রের আইনসভার উচ্চ কক্ষ যেমন রাজ্যসভা, তেমনই রাজ্যের ক্ষেত্রে উচ্চ কক্ষের নাম বিধানপরিষদ। তবে সব রাজ্যে বিধানপরিষদ নেই – বর্তমানে শুধুমাত্র ৬ টি রাজ্যে বিধানপরিষদ আছে। রাজ্যগুলি হল অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা।
বিধানপরিষদ এর সদস্যদের নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে নির্বাচন/মনোনয়ন করা হয় –
(১) এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত হন পঞ্চায়েত, পৌরসভা ও জেলা পরিষদের মতো স্থানীয় প্রশাসনগুলি থেকে।
(২) এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত হন বিধায়কদের ভোটে বিধায়ক নন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে।
(৩) এক-দ্বাদশাংশ সদস্য নির্বাচিত হন একটানা তিন বছর রাজ্যে বসবাসকারী স্নাতকদের মধ্যে থেকে।
(৪) এক-দ্বাদশাংশ সদস্য নির্বাচিত হন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অন্তত তিন বছর শিক্ষকতাকারী ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে।
(৫) এক-ষষ্ঠাংশ সদস্য মনোনীত হন রাজ্যপাল কর্তৃক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্ট অবদানকারীদের মধ্যে থেকে।
বিধানপরিষদের ক্ষমতা খুব সীমাবদ্ধ এবং রাজ্যের বড় কোন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। স্বাধীনতার পর অধিকাংশ রাজ্যেই বিধানপরিষদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যেমন ১৯৬৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধান পরিষদ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পঞ্চায়েত ও পুরসভা নির্বাচন: প্রত্যেক রাজ্যে তাদের স্থানীয় প্রশাসন চালানোর সুবিধার্থে পঞ্চায়েত (গ্রামীণ এলাকা) ও পৌরসভা (শহর এলাকা) নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনগুলি সেই রাজ্যের রাজ্য নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য প্রশাসন পরিচালনা করে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন হয় যার মাধ্যমে পঞ্চায়েত সদস্য (গ্রাম স্তর), পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য (ব্লক স্তর) ও জেলা পরিষদের সদস্য (জেলা স্তর) নির্বাচিত হন।

এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন প্রকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যা্র নিয়ম নীতি সেই নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থা নির্ধারণ করে – যেমন কলেজ নির্বাচন, বিদ্যালয়ের পরিচালন কমিটি নির্বাচন ইত্যাদি।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।