সে অনেকদিন আগেকার কথা। তখন ব্রিটিশ আমল। উত্তর কলকাতার এক বাঙালির ওষুধের দোকানে এডওয়ার্ড স্ট্যানলি নামের এক ইংরেজ সাহেব রোজই আড্ডা মারতে আসেন। আড্ডা মারার কারণ আর কিছুই না, কলকাতায় গড়ে ওঠা হাতেগোনা আলোপ্যাথি ওষুধের দোকানের মধ্যে এই দোকানটি অন্যতম। সাহেব পেশায় ভারত সরকারের আন্ডার সেক্রেটারি হলেও আলোপ্যাথি ওষুধ নিয়ে অল্প বিস্তর পড়াশোনা আছে। মূলত সেই টানেই আসা যাওয়া এই দোকানে। একদিন এরকমই আড্ডা মেরে সাহেব দোকান থেকে চলে যাওয়ার পর সেই বাঙালি ওষুধ বিক্রেতার সহকারির খেয়াল হল টেবিলে একটি বটুয়া পড়ে। খুলে দেখলেন ভর্তি টাকা। বুঝলেন সাহেব ফেলে গেছেন। পর দিন এডওয়ার্ড সাহেব হন্তদন্ত হয়ে দোকানে খোঁজ করতে এলে সেই সহকারি হাসি মুখে টাকার বটুয়াটি সাহেবের সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন – দেখুন তো এটা কিনা? সাহেবের ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে এল। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ দোকান ছেড়ে যাওয়ার আগে ওষুধ বিক্রেতার ঐ সহকারিকে তিনি চুপি চুপি একটি ওষুধের ফর্মুলা বলে দিয়ে গেলেন। সহকারীটি আবার খোদার ওপর খোদকারি করে ঐ সাহেবি ফর্মুলার সাথে নিজের কিছু আয়ুর্বেদী ফর্মুলা গুলঞ্চ লতার ছাল ও নিশাদল ( অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড) মিশিয়ে একটি ওষুধ তৈরি করলেন যার নাম রাখলেন ‘এডওয়ার্ডস টনিক’ (Edwards Tonic)। বাকিটা ইতিহাস।
‘অ্যান্টি ম্যালেরিয়াল স্পেসিফিক’ অর্থাৎ এক কথায় ম্যালেরিয়া রোগের যম এই ‘মহৌষধ’ কেবল ম্যালেরিয়া নয় ‘সর্বজ্বরের মহৌষধ’ হিসেবেও তুমুল হিট হল মার্কেটে। বর্ষাকালে কলকাতায় ম্যালেরিয়ার ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের চাপে কুইনাইন যখন কাজ না করে ফাইন খেত তখন ত্রাতা হয়ে উঠত দেশি বিদেশি ফর্মুলার এই ওষুধ। সেই আমলের প্যারাসিটামল হিসেবেও তুলনাহীন ছিল এই এডওয়ার্ডস টনিক। বাঙালি ওষুধ বিক্রেতার ঐ সহকারীর নাম জানতে ইচ্ছে করছে তো? আজ্ঞে, তেনার নাম বটকৃষ্ণ পাল। সাহেবি বানানে BUTTO KRISTO PAUL. নাম শুনে যদি ভদ্রলোককে চিনতে না পারেন তাহলেও অসুবিধে নই। বেনিয়াটোলা সার্বজনীনের বিখ্যাত বারোয়ারি পুজোটি যে রাস্তার মোড়ে হয় সেই মোড়টি এই ওষুধওলার নামে – বি কে পাল অ্যাভিনিউ। হ্যাঁ ঠিকই বুঝেছেন – বি কে পাল- ই এই বটকৃষ্ণ পাল। শোভাবাজার স্ট্রিটে অবস্থিত হাটখোলা পোস্ট অফিস থেকে কয়েক পা এগোলেই রাস্তার বাঁদিকে যে রাজকীয় অট্টালিকাটি দেখবেন সেটিই বি কে পালের বাড়ি। দুদণ্ড দাঁড়িয়ে খেয়াল করলে দেখবেন এই বাড়িতে কোন সদর দরজা নেই। ঘাবড়ে গেলেন তো শুনে? আরে ঘাবড়ানোর কিছু নেই, কারণ বাড়ির একতলাতেই তো রয়েছে সেই বিখ্যাত ওষুধের দোকান বটকৃষ্ণ পাল এন্ড কোম্পানি, ‘এডওয়ার্ডস টনিক’ -এর আঁতুড়ঘর। দোকানের ভেতর দিয়েই আসলে বাড়ির অন্দরমহলের প্রবেশপথ।
আজও এলাকার অসংখ্য মানুষ জ্বরজ্বালা এবং ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে ‘মুহ তোড় জবাব’ হিসেবে শতাব্দী প্রাচীন এই ‘এডওয়ার্ডস টনিক’ -এর ওপরই আস্থা রাখেন। দোকানে ঢোকবার সময় সাইনবোর্ডে বড় করে লেখা ‘এডওয়ার্ডস টনিক’ নামটি আজও চোখে পড়ে। ১৮৫৫ সালে স্থাপিত এই বটকৃষ্ণ পাল এন্ড কোম্পানি সম্ভবত কলকাতার সবথেকে প্রাচীন ওষুধের দোকান এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা যা আজও সমানভাবে সক্রিয় মানুষের সেবায়। কলকাতার চৌহদ্দি পেরিয়ে প্রথমে বাংলা তারপর ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে ইংল্যান্ড আমেরিকাতেও এডওয়ার্ডস টনিকের মহিমা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯০৯ সালের ইন্ডিয়ান মেডিকেল রেকর্ড বি কে পালের এই ওষুধের দোকানটিকে নিয়ে যে মন্তব্যটি করেছে সেটি সরাসরি তুলে দিলাম – “ Calcutta can at least boast of one pharmacy organized and financed solely by Indian brain and Capital/which/only through unstinted honesty of purpose and dogged perseverance of its founder proprietor, has fully won the confidence and esteem of even in the Western world.”
বটকৃষ্ণের বড় ছেলে ভূতনাথের প্রচেষ্টাতেই মূলত এডওয়ার্ডস টনিকের নাম বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময়ে প্রকাশিত সমস্ত নামকরা দৈনিক সংবাদপত্র,গল্প, উপন্যাস ও ম্যাগাজিনে এডওয়ার্ডস টনিকের পাতা ভর্তি বিজ্ঞাপন দিতেন তিনি। ক্ষীরোদ প্রসাদ বিদ্যাবিনোদের সাপ্তাহিকী ‘অলৌকিক রহস্য’ তে প্রকাশিত গল্প উপন্যাসের মাঝে মাঝেই পাতা ভর্তি করে এডওয়ার্ডস টনিকের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ত। এমনকি বিভিন্ন ভৌতিক গল্পে অশরীরী আত্মাকে আক্ষেপ করতে শোনা যেত – তাঁর সময়ে যদি এডওয়ার্ডস টনিক থাকতো তাহলে আর এই ভৌতিক গল্প লেখার প্রয়োজন পড়ত না।
ইউরোপীয়ান ক্রেতাদের অভ্যর্থনা জানাতে বটকৃষ্ণের মেজ ছেলে কলকাতার তৎকালীন মেয়র স্যার হরিশংকর পালের তৈরি এই বাড়িতেই একসময় বিধানচন্দ্র রায় রোগী দেখেছেন। আলোপ্যাথি ওষুধের এই একছত্র রমরমার যুগে ও বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলির সঙ্গে আধিপত্যের প্রশ্নে বটকৃষ্ণ পাল এন্ড কোম্পানি এখন অনেকটাই জৌলুষহীন। তবুও কাজের সূত্রে শোভাবাজার চত্বরে গেলে তো বটেই এমনকি উত্তর কলকাতার দুর্গাপুজো দেখতে গিয়ে একবার ঘুরে আসতেই পারেন এডওয়ার্ডস টনিক – এর জন্মস্থান বি কে পালের বাড়ি। আফটার অল এই বাড়িতেই প্রতিষ্ঠিত বটকৃষ্ণ পাল এন্ড কোম্পানি সম্পর্কে ১৯০৯ সালে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত The Cyclopaedia of India, Biographical, Historical, Administrative, Commercial বইটিতে লেখা হয়েছিল – “There is hardly another Bengali firm which has attained the same eminence or enjoys the same reputation and popularity as the firm of Butto Kristo Paul & Co.”
লেখক : অয়ন মৈত্র
অয়ন মৈত্রের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায়। তিনি ইংরাজিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পেশায় একটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষার শিক্ষক। তিনি সববাংলায় সাইটের সহ প্রতিষ্ঠাতা। সববাংলায় প্রতিষ্ঠানের ছয় বছর প্রধান সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন ম্যাগাজিন এবং ওয়েবজিনে লেখালিখি করেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান