ইতিহাস

হেগেল

হেগেল

জার্মান আদর্শবাদের এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত পণ্ডিত, দার্শনিক হেগেল (Hegel) পাশ্চাত্য দর্শনশাস্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। নন্দনতত্ত্ব থেকে রাজনীতি সর্বত্র তাঁর পাণ্ডিত্যের নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। হেগেলের প্রচারিত দর্শনকে বাস্তব ভাববাদ বলা হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের জন্ম হয়েছে হেগেলের দর্শন থেকেই। রাষ্ট্রের স্বরূপ, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ইতিহাস ও সভ্যতার বিবর্তনের বিষয়ে অভিনব দার্শনিক অবদান রেখে গেছেন হেগেল।

১৭৭০ সালের ২৭ আগস্ট দক্ষিণ পশ্চিম জার্মানির স্টুটগার্টে হেগেলের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম জর্জ ভিলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল। তাঁর বাবা জর্জ লুডউইগ উর্তেমবার্গের ডিউক কার্ল ইউগেনের রাজস্ব দপ্তরের সম্পাদক ছিলেন এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল মেরিয়া ম্যাগডেলেনা লুসিয়া। উর্তেমবার্গ আদালতের এক উকিলের কন্যা ছিলেন তাঁর মা। হেগেলের মাত্র তেরো বছর বয়সেই জণ্ডিসে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মা মারা যান। পরে হেগেল এবং তাঁর বাবাও এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, কিন্তু ভাগ্যক্রমে তাঁরা বেঁচে যান। হেগেলের এক বোন ও এক ভাই ছিল যাদের নাম যথাক্রমে ক্রিস্টেন লুইস ও জর্জ লুডউইগ। শৈশব থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন হেগেল।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

মাত্র তিন বছর বয়সে জার্মান স্কুলে ভর্তি হন হেগেল। দুই বছর পরে তিনি যখন লাতিন স্কুলে ভর্তি হন, ততদিনে মায়ের কাছে প্রথম বর্ণমালাগুলি শিখে নিয়েছিলেন তিনি। ১৭৭৬ সালে স্টুটগার্টের জিমন্যাসিয়াম ইলাস্ট্রে-তে ভর্তি হন। এখানে প্রচুর পড়াশোনা করতে থাকেন তিনি। এই সময়কার দীর্ঘ পঠন-পাঠনের অভিজ্ঞতা তিনি তাঁর দিনলিপিতে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। সেই সময়কার জার্মান নবজাগরণের কবি ফ্রেদরিক ক্লপস্টক, সাহিত্যিক ক্রিস্টিয়ান গার্ভ ও গ্রথহোল্ড লেসিং-এর লেখাপত্র পড়তে থাকেন হেগেল। এই জিমন্যাসিয়ামে স্নাতক উত্তীর্ণ হন হেগেল এবং বিশেষ বৃত্তি নিয়ে তুরস্কে পড়তে যান তিনি। ১৮ বছর বয়সে তুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন তুবিনজের স্টিফট নামে একটি প্রোটেস্ট্যান্ট সেমিনারিতে ভর্তি হন তিনি। এখানেই পরবর্তীকালের দার্শনিক ফ্রেডরিক হোল্ডারলিন এবং ফ্রেডরিক শেলিং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে তাঁর। সেমিনারির প্রবল নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশের মধ্যে এই তিনজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এবং ক্রমেই হেগেল জাঁ জাঁক রুশোর চিন্তা-চেতনার দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে। তাঁর বন্ধু হোল্ডারলিন ও শেলিং উভয়েই কান্টের দর্শনতত্ত্ব বিষয়ে বিতর্ক করলেও হেগেল এই বিষয়ে নীরব ছিলেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্যই ছিল দার্শনিক চিন্তা-চেতনার বিমূর্ত ধারণাগুলি সাধারণের উদ্দেশ্যে সহজ ও সরল করে তোলা। কিন্তু সেই সময় ১৭৯৩ সালের সন্ত্রাসের রাজত্বের সহিংস রূপ হেগেলকে প্রভাবিত করে এবং এই সময়েই তিনি গিরেণ্ডিন গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচিত হন। তুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করার পর ১৭৯৩ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষা সমাপ্ত হয় তাঁর। এই প্রোটেস্ট্যান্ট সেমিনারি থেকে হেগেল একটি ধর্মতত্ত্বের সার্টিফিকেট পেয়েছিলেন। এরপরে তিনি বার্ন শহরের একটি অভিজাত পরিবারে গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। এই সময় যিশুর জীবন বিষয়ে একটি নাতিদীর্ঘ রচনা প্রকাশ করেন হেগেল এবং ‘খ্রিস্টধর্মের ইতিবাচকতা’ শিরোনামে একটি পাণ্ডুলিপিও তৈরি করেন তিনি। ফ্রাঙ্কফোর্টে থাকার সময় হেগেল অনেকগুলি প্রবন্ধ লেখেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘ধর্ম ও প্রেম সংক্রান্ত অংশ’, ‘খ্রিস্টান ধর্মের আত্মা ও তার ভাগ্য’ ইত্যাদি। ১৭৯৭ সালে তিনি লেখেন ‘জার্মান আদর্শবাদের প্রাচীনতম পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া’, কিন্তু এই বইটি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ পায়নি। ১৭৯৯ সালে তাঁর বাবার মৃত্যুর পরে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে জার্মানির জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন হেগেল এবং এখান থেকেই তাঁর পাণ্ডিত্যের সংবাদ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সেই সময় জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমালোচনামূলক দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে কে. এল. রেইনহোল্ডের খুব নামডাক ছিল। হেগেলও তাঁর ক্লাস করেছেন এবং তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি লেখেন ‘দ্য ডিফারেন্স বিটুইন ফিস্তে অ্যাণ্ড শেলিংস সিস্টেম অফ ফিলোজফি’। ১৮০১ সালে হেগেলের এই বই প্রকাশ পায় এবং এর পরের দুই বছর ১৮০২-০৩ সাল নাগাদ শেলিং-এর সঙ্গে যৌথভাবে হেগেল সম্পাদনা করেন তাঁর বিখ্যাত বই ‘ক্রিটিক্যাল জার্নাল অফ ফিলোজফি’।

চার বছর জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিষয়ের প্রভাষক রূপে নিযুক্ত ছিলেন হেগেল এবং এরপরে ১৮০৫ সালে তিনি দর্শনের অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। এই সময়পর্বেই নেপোলিয়নের নেতৃত্বে ফরাসিরা জার্মানি আক্রমণ করে বসে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায় অনির্দিষ্টকালের জন্য। কর্মহীন হয়ে পড়েন হেগেল। এই সময়পর্বেই ১৮০৬ সালের শেষ দিকে হেগেল তাঁর বিখ্যাত কাজ ‘দ্য ফেনোমেনোলজি অফ স্পিরিট’ প্রকাশ করেন। শেলিং ১৮০৩ সালে জেনা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু হেগেলের এই বই প্রকাশের পর বইয়ের ভূমিকা পড়ে তাঁর মনে হয় যে হেগেল তাঁর সম্পর্কে নিন্দনীয় মন্তব্য করেছেন, ফলে অচিরেই তাঁদের বন্ধুত্ব শেষ হয়। জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ না থাকার সময় বামবুর্গের একটি পত্রিকার সম্পাদকের পদে বেশ কিছুদিন কাজ করেন হেগেল এবং পরে ন্যুরেমবার্গের একটি জিমন্যাসিয়ামে প্রধান শিক্ষকের পদে আসীন হন। ১৮০৮ থেকে ১৮১৫ সাল পর্যন্ত তিনি এই জিমন্যাসিয়ামেই কর্মরত ছিলেন। ১৮১৬ সালে তাঁর লেখা আরেকটি বিখ্যাত বই প্রকাশ পায় ‘দ্য সায়েন্স অফ লজিক’ নামে। তাঁর এই শেষ দুটি বইয়ের জনপ্রিয়তার কারণে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার আমন্ত্রণ পান হেগেল। ১৮১৬ সালের শেষ দিকে তিনি হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ঠিক এর পরের বছর তিনি লেখেন ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ফিলোজফিকাল সায়েন্স ইন আউটলাইন’ বইটি। ১৮১৮ সালের মাঝামাঝি নাগাদ হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন হেগেল। ১৮২১ সালে বার্লিনে থাকার সময় হাইডেলবার্গে দেওয়া বক্তৃতার ভিত্তিতে হেগেল দুটি বই লেখার পরিকল্পনা করেন যার বিষয় ছিল রাজনৈতিক দর্শন এবং অধিকারের দর্শনের সমস্ত উপাদান। ১৮২১ সালে হেগেল লেখেন ‘ফিলোজফি অফ হিস্ট্রি’ বইটি। কিন্তু এই বইগুলি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ পায়নি, বরং তাঁর মৃত্যুর ছয় বছর পরে ১৮৩৭ সালে প্রকাশ পেয়েছিল। ১৮৩১ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বার্লিনে একজন জনপ্রিয় অধ্যাপক হিসেবে বিভিন্ন বক্তৃতা দিয়েছেন তিনি।

বিখ্যাত দার্শনিক কান্টের দর্শনের বিপ্রতীপে গড়ে উঠেছে হেগেলের দর্শন। কান্টের দর্শনকে সমালোচনা করেছিলেন হেগেল এবং এই সমালোচনার মধ্য দিয়েই তাঁর দার্শনিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হেগেলের মতে বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাই আসলে জ্ঞানের প্রধান মাধ্যম। এই বুদ্ধি দ্বারাই আমরা জগৎ ও সত্যকে জানি। অন্যদিকে কান্ট বলেছিলেন যে জ্ঞেয় জগৎ কখনোই মানুষের বুদ্ধিকে অতিক্রম করে যেতে পারে না। সত্য সমগ্র, সত্যের কোনো বিভাজন হয় না – একথা স্বীকার করে হেগেল কান্টের বিপ্রতীপে বুদ্ধির কোনো তারতম্য করেননি। নীতির ক্ষেত্রে কান্ট এমন এক মহৎ আদর্শের কথা বলেন যেখানে আদর্শ বাস্তুবায়িত হতে না পারলেও মানুষ তাকে বাস্তব ভাবতে বাধ্য। কিন্তু হেগেল বলেন অন্য কথা – আদর্শ বিকাশের পর্যায়গুলি বুঝতে পারা যায় বলেই বাস্তব-অবাস্তবের বিরোধ থাকে না। হেগেলের দর্শনের মূল কথাই হল দ্বন্দ্ব – তাঁর মতে দ্বন্দ্বই হল ভাবের বিকাশের প্রধান মাধ্যম। কান্টের দর্শনের সমালোচনা করলেও হেগেলের দর্শনও ভাববাদকে অতিক্রম করতে পারেনি। হেগেলের এই দর্শন থেকে পরবর্তীকালে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ এবং স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক মতবাদের জন্ম হয়েছে।

রাষ্ট্রের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হেগেল বলেন যে রাষ্ট্র সর্বদা ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণ করে। তাঁর মতে রাষ্ট্র একটি শক্তিশালী সংস্থা হলেও স্বৈরাচারি রাজার বিরুদ্ধে এই রাষ্ট্রের জনগণ সর্বদা বিরোধিতা করতে পারে। তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক গ্রন্থ ‘পলিটিক্যাল থট’-এর মধ্যে রাষ্ট্রের স্বরূপ ও গঠনকাঠামো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। হেগেলের মতে পরিবারই হল মানুষের প্রাচীনতম সংগঠন এবং ক্রমে এই পরিবার থেকেই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি এবং জাতীয় রাষ্ট্রের নীতি এই দুই বিষয়ই একটি রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ বলে মনে করেছেন তিনি। ইতিহাস ও সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের ফল হল রাষ্ট্র যার অনেকগুলি ক্ষুদ্র সত্তা থাকলেও সেই সত্তাগুলির স্বাধীন বিকাশের ভাবনাকে অস্বীকার করেছেন হেগেল। যদিও হেগেলের রাষ্ট্রের স্বরূপ ব্যাখ্যায় ব্যক্তির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করা হয়নি।

১৮৩১ সালের ১৪ নভেম্বর জার্মানির বার্লিনে ৬১ বছর বয়সে হেগেলের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন