ইতিহাস

সুন্দরলাল বহুগুণা

সুন্দরলাল বহুগুণা (Sunderlal Bahuguna) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় পরিবেশবিদ যিনি ‘চিপকো আল্দোলনের’ নেতা হিসেবে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধে আজ যখন সারা পৃথিবী জুড়ে বৃক্ষ ছেদন প্রতিহত করতে এক জোট হয়ে আন্দোলন কর্মসূচী গ্রহণ করা হচ্ছে দেশে দেশে, সেই ১৯৭৩ সালে সুন্দরলাল বহুগুণা চিপকো আল্দোলনের মাধ্যমে বৃক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের ভিত্তিভূমি রচনা করে গেছেন। কেবল চিপকো আল্দোলনই নয়, তিনি ‘তেহরি বাঁধ বাঁচাও’ আন্দোলনেরও নেতৃত্ব দান করেছেন।

১৯২৭ সালের ৯ জানুয়ারি অধুনা উত্তরাখন্ড রাজ্যের তেহরি গাড়োয়াল জেলার মারোদা গ্রামে সুন্দরলাল বহুগুণার জন্ম হয়। তাঁর বাবা অম্বাদত্ত বহুগুণা তেহরি গাড়োয়াল বনদপ্তরের আধিকারিক ছিলেন। সুন্দরলালের মায়ের নাম পূর্ণা দেবী। ১৯৭১ সালে সুন্দরলালের সাথে বিমলা নটিয়ালের বিবাহ হয়। তাঁদের তিন সন্তান রয়েছে।

সুন্দরলালের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় প্রতাপনগর স্কুলে এবং এখান থেকে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর তিনি চলে যান লাহোরে। লাহোর থেকে তিনি স্নাতক পাস করার পর স্নাতকোত্তর করার জন্য তিনি বেনারস যান কিন্তু শেষ অবধি স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য গাড়োয়ালে ফিরে আসেন পরীক্ষা না দিয়েই।

সুন্দরলাল মাত্র তেরো বছর বয়সে তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের (অধুনা উত্তরাখন্ড) গান্ধীবাদী কংগ্রেস নেতা শ্রীদেব সুমনের শিক্ষায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে সমাজ সেবার ব্রতে আত্মাহুতি দেন। সুন্দরলাল মহাত্মা গান্ধীর ভাবাদর্শ দ্বারা ভীষণভাবে অণুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

১৯৪৯ সালে মীরাবেন ও ঠাক্কর বাপ্পার সাথে মিলে দলিত সম্প্রদায়ের উন্নতির জন্য কাজ করেন তিনি। দলিত শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি ‘ঠাক্কর বাপ্পা হষ্টেল’ স্হাপন করেন। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর সুন্দরলাল গাড়োয়াল হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করেন। পাহাড়ের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিনা সেই বিষয়ে নিরন্তর খোঁজ চালাতে থাকেন তিনি। স্ত্রী বিমলা নটিয়ালের সাথে একযোগে ‘নবজীবন মন্ডল’ নামে একটি সেবা প্রতিষ্ঠান স্হাপন করেন। প্রকৃতি প্রেমী সুন্দরলাল বাস্তুতন্ত্রে প্রতিটি জীবের নিজ নিজ পরিবেশে বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষায় ব্রতী হয়েছিলেন।

১৯৭৩ সালে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে তৎকালীন গাড়োয়াল জেলার চামেলি গ্রামে নগরায়ন ও শিল্পায়নের জন্য আড়াই হাজার গাছকে নিলামে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারি ঠিকাদাররা যখন গাছ কাটতে চামলি গ্রামে আসে তখন ওই গ্রামের মহিলারা এক অভিনব কায়দায় প্রতিবাদ করেন। তাঁরা গাছকে নিজের সন্তানের মত জাপটে ধরে, আঁকড়ে ধরে রাখেন। তাঁদের এই মানসিকতার সামনে পিছু হটেন সরকারি ঠিকাদার বাহিনী। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন সুন্দরলাল। গাছকে জড়িয়ে থাকা প্রতীকি হিসাবে সারা ভারতে তথা বিশ্বে মাইলফলক হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন। এই আন্দোলন ‘চিপকো আন্দোলন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। আন্দোলন ক্রমশ চামলি গ্রাম থেকে ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য গ্রামে। গাড়োয়ালের ৩৫টি গ্রাম এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে রাজ্যস্তরে আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সমগ্র আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব যেহেতু ছিলেন সুন্দরলাল সেই কারণে সুন্দরলালের ভুমিকা নিয়েও সর্বত্র আলোচনা শুরু হয়।

সুন্দরলাল ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩ সাল অবধি পাঁচ হাজার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে গ্রামে গ্রামে গিয়ে এই আন্দোলনের খবর পৌঁছে দেন। ক্রমশ আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। ইন্দিরা গান্ধীর কাছেও সংবাদ পৌঁছায়। আন্দোলনের চাপে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ঘোষণা করে যে আগামী পনেরো বছর উত্তরাখন্ডের হিমালয় অঞ্চলে বৃক্ষ ছেদন বন্ধ থাকবে। শুধু হিমালয় নয় কর্ণাটক, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও গাছ কাটার উপরে নিষেধাজ্ঞা আনেন তিনি। পরবর্তী পাঁচ বছরে এবং এক দশকের মধ্যে হিমালয় জুড়ে সবুজের জন্য আন্দোলন ছড়িয়ে যায়।

১৯৭৪ সালে রেনী গ্রামে সরকারের বননীতির প্রতিবাদে সুন্দরলাল দুই সপ্তাহ উপবাস করেন। সেখানেও সরকার বাধ্য হয়ে গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দেন। ১৯৭৮ সালে সরকার থেকে উত্তরাখন্ডের গাড়োয়াল হিমালয়ের ভাগীরথী নদীর উপরে তেহরি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়। তেহরি বাঁধ যে অঞ্চলে তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয় সেই অঞ্চলটি ভূমিকম্প প্রবণ ছিল। ওই অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণ হলে বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হবে এবং জলাধারের চাপে ভূস্তরে ফাটল ধরবে। ওই ফাটল দিয়ে জলাধারের জল বাষ্প হয়ে উর্দ্ধমুখী চাপ তৈরী করবে ফলে ভূমিকম্পের প্রবণতা বেড়ে যাবে যা হিরোশিমার পারমাণবিক বোমার ধ্বংসত্মাক শক্তির থেকে দশগুণ বেশী হবে বলে জানান পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। শুধু তাই নয় তেহরি বাঁধ নির্মাণের ফলে ২৩টি গ্রাম সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হবে এবং ৭২টি গ্রাম অর্ধ নিমজ্জিত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা। পরিবেশ ও জনজীবন ব্যাপকভা‌বে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে সুন্দরলাল এর বিরোধিতা করেন। এই বাঁধ নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী বিরোধিতা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামী বীরেন্দ্র দও সাকলানির নেতৃত্বে। এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেছিলেন সুন্দরলাল। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন ভুমিকম্পের ফলে যদি বাঁধ ভেঙ্গে যায় তাহলে বনভূমি, কৃষি জমি ও জনপদ সব কিছুই ডুবে যেতে পারে।

১৯৯১ সালে উত্তরাখন্ড ভূমিকম্পের পরে তিনি আরও জোরদারভাবে এই বাঁধ নির্মাণের বিপক্ষে আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৯২ সালে তিনি অনশন শুরু করেন বাঁধ নির্মাণের বিপক্ষে। তাঁর দীর্ঘদিন অনশনের ফলে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া তাঁকে আশ্বাস দেন যে তিনি একটি স্পেশাল কমিটি তৈরী করবেন যাঁরা পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র রক্ষার বিষয়টি দেখভাল করবে। সেই মত রুরকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুমিকম্প বিশেষজ্ঞ জয়কৃষ্ণের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু তাঁরা কেবল মাত্র বাঁধটির নিরাপত্তার কারণগুলিই খতিয়ে দেখেন। পরিবেশ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত কোন বিষয়েই এই কমিটি সুন্দরলালকে সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি। ফলে ১৯৯৫ সালে তিনি দিল্লীর রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিস্থলে অনশন শুরু করেন। এই সময় তিনি পঁচাত্তর দিন একটানা উপবাস করেন।

কিন্তু তাঁর এই সমস্ত প্রচেষ্টাই বিফলে যায়। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর বাঁধ নির্মাণ হয় ২০০২ সালে। কিন্তু সুন্দরলালের ভূমিকা আলোচিত হয় সর্বত্র। যখনই পরিবেশ প্রকৃতির উপরে আধু‌নিক হাতিয়ার থাবা বসাতে এসেছে তখনই সরব হয়েছেন সুন্দরলাল। পরিবেশ আন্দোলনই শুধু নয়, পরিবেশের উপর যাঁদের জীবিকা নির্ভরশীল তাঁদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে তিনি এগিয়ে এসেছেন স্বেচ্ছায়। ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি আইনের বিরুদ্ধেও তিনি আন্দোলনে অশংগ্রহণ করেছেন। এটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ আন্দোলন।

চিপকো আন্দোলনের স্বীকৃতি স্বরূপ সুন্দরলালকে “হিমালয়ের রক্ষক” আখ্যা দেওয়া হয়। সুন্দরলাল গান্ধীবাদী ছিলেন। সেই কারণে তিনি “পরিবেশ গান্ধী” বলেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৮১ সালে চিপকো আন্দোলনের সাফল্যের কারণে তৎকালীন ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৮৭ সালে তাঁকে ‘রাইট লিভলিহুড অ্যাওর্য়াড’ প্রদান করা হয়। ১৯৮৬ তে ‘যমুনালাল বাজাজ পুরস্কারে’ ভূষিত করা হয়। পরিবেশের প্রতি তাঁর অবদানের জন্য আই আই টি রুরকি ”ডক্টর অফ সোশ্যাল সায়েন্স’ উপাধিতে তাঁকে ভূষিত করে। ২০০৯ সালে তাঁর সারাজীবনের কর্মকাণ্ডের জন্য ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মান প্রদান করেন।

সুন্দরলাল আরও দুই বিখ্যাত পরিবেশবিদ বন্দনা শিবা ও মেধা পাটেকরের সাথে মিলিতভাবে “ইন্ডিয়ান এনভায়রনমেন্ট — মিথ এ্যান্ড রিয়েলিটি” নামে একটি বই লিখেছেন পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের উপর । রাজীব কে সিনহার সাথেও একটি বই লেখেন,”এনভায়রনমেন্টাল ক্রাইসিস এ্যান্ড হিউম্যান্স অ্যাট রিস্ক”।

২০২১ সালের ২১ মে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে ঋষিকেশে সুন্দরলাল বহুগুণা -র মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।