ইতিহাস

ইমানুয়েল কান্ট

ইমানুয়েল কান্ট

পাশ্চাত্য দর্শনের ভান্ডার যাঁদের উচ্চমার্গীয় চিন্তাভাবনায় এবং লেখনীর দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে রয়েছে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant) ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁকে আধুনিক দর্শনের একজন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অধিবিদ্যা, জ্ঞানতত্ত্ব, নীতিশাস্ত্র, রাজনৈতিক দর্শন, নন্দনতত্ত্বের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও পন্ডিতমহল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে থাকেন। কান্ট আধুনিক যুক্তিবাদ এবং অভিজ্ঞতাবাদের সমন্বয়সাধন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর মতে, মানুষের উপলব্ধি হল সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের উৎস যা আমাদের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে গঠন করে। স্থান এবং সময় মানুষের অন্তর্জ্ঞানের রূপ যা তার অভিজ্ঞতা গঠনে সহায়তা করে। তাঁর মতে, আমাদের জ্ঞান প্রাকৃতিক এবং অভিজ্ঞতামূলক বিজ্ঞানের জগতে সীমাবদ্ধ। হিউমের মতো সংশয়বিদদের চিন্তাকে প্রতিহত করে এবং সংশয়বাদের বিরোধিতা করে তিনি রচনা করেছিলেন ‘ক্রিটিক অফ পিওর রিজন’ বইটি। তাঁর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রকৃতি নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদকে প্রত্যাখান করেছিলেন ইমানুয়েল কান্ট । নীতিশাস্ত্র, ধর্ম, আইন, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদি নানা বিষয়ে আমৃত্যু কাজ করে গিয়েছেন তিনি।

১৭২৪ সালের ২২ এপ্রিল বাল্টিক সাগরের দক্ষিণ-পূর্ব তীরের কাছে তৎকালীন পূর্ব প্রাশিয়ার রাজধানী কোনিগসবার্গে (বর্তমানে রাশিয়ার অন্তর্গত কালিনিনগ্রাদ) এক কারিগর পরিবারে ইমানুয়েল কান্টের জন্ম হয়। কান্ট মূলত লুথেরান প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মে বিশ্বাসী এক জার্মান-প্রুশিয়ান পরিবারের সদস্য ছিলেন। তাঁর বাবা জোহান জর্জ কান্ট (Johann Georg Kant) ছিলেন মেমেল শহরের হার্নেস বা ঘোড়ার জন্য চামড়ার সাজ প্রস্তুতকারক। কান্টের মা আনা রেজিনা রয়টারও (Anna Regina Reuter) ছিলেন একজন হার্নেস প্রস্তুতকারকের মেয়ে। আনা রেজিনা তাঁর সামাজিক স্তরের মহিলাদের তুলনায় বেশি শিক্ষিত হয়েছিলেন। কান্টের পরিবার কখনই আর্থিকভাবে নিঃস্ব ছিল না, কিন্তু কান্টের যৌবনে তাঁর বাবার ব্যবসার অবনতি হয়েছিল। কান্টের বিশ্বাস ছিল, তাঁর ঠাকুরদাদা হান্স কান্ট স্কটিশ বংশোদ্ভূত ছিলেন। কান্টের জীবনীকাররা এই দাবিকে দীর্ঘদিন সম্মতি দিলেও, এর সপক্ষে তেমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

জোহান জর্জ এবং আনা রেজিনার মোট নয়টি সন্তানের মধ্যে ইমানুয়েল কান্ট ছিলেন চতুর্থ সন্তান। ধর্মীয় ভক্তি ও নম্রতার পরিবেশে এবং বাইবেলের আক্ষরিক অনুবাদ শুনে শুনে বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। অত্যন্ত কঠোর এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন কান্ট। আজীবন অবিবাহিতই ছিলেন তিনি।

আট বছর বয়সে কান্ট প্রথমে তাঁর যাজক নির্দেশিত পাইটিস্ট স্কুল কলেজিয়াম ফ্রাইডেরিসিয়ানাম-এ ভর্তি হন। ‘পাইটিজম’ ধর্মে আসলে ঐশ্বরিক অনুগ্রহের উপর নির্ভরতা, নিয়মিত বাইবেল অধ্যয়ন, আত্মদর্শনের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। এই জোরপূর্বক আত্মানুসন্ধানের প্রক্রিয়া কান্ট মেনে নিতে পারেননি। ফলত সেই লাতিন ভাষার পাইটিস্ট স্কুলে লাতিন ভাষার ক্লাসিকের মধ্যে আশ্রয় খুঁজেছিলেন তিনি। সেখানে পড়াকালীনই সম্ভবত প্রকৃতিবাদী কবি লুক্রেটিয়াসের প্রতি তাঁর আজন্ম অনুরাগের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীকালে আবেগ, কর্তৃত্ব বা অনুগ্রহের পরিবর্তে যুক্তি এবং স্বায়ত্ত্বশাসনের উপর জোর দেওয়া তাঁর পাইটিস্ট বিরোধিতারই একরকম প্রতিফলন বলা যায়।

আট থেকে পনেরো বছর বয়স পর্যন্ত সেই স্কুলে পড়াশোনা করবার পর বিদ্যালয়-শিক্ষা সমাপ্ত করে ষোল বছর বয়সে ১৭৪০ সালে কনিগসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ইমানুয়েল কান্ট । সেখানে দর্শনবিদ্যার অধ্যয়ন এবং তার প্রতি আগ্রহ তাঁর প্রথম দিককার ক্লাসিক প্রীতিকে ক্ষীণ করে দেয়। এছাড়াও সেখানে গণিত এবং পদার্থবিদ্যার পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, অধিবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র এবং প্রাকৃতিক আইন অধ্যয়নেরও সুযোগ হয়েছিল তাঁর। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রিয় শিক্ষক ছিলেন মার্টিন নুটজেন। তাঁরই অধীনে কান্ট গটফ্রাইড লাইবনিজ এবং ক্রিশ্চিয়ান উলফের দর্শন অধ্যয়ন করেন। তাছাড়াও সেই নুটজেনই কান্টকে নিউটনের গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এই যুক্তিবাদী মার্টিন নুটজেন কান্টকে প্রভাবিত করেছিলেন বিস্তর। কান্টকে ভাববাদ থেকেও বিরত করেছিলেন তিনি। প্রথাগত ভাববাদের বিরোধিতা থেকেই পরে কান্টের অতীন্দ্রিয় ভাববাদ জন্ম নিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ১৭৪৫-৪৭ সালের মধ্যে ‘থটস অন দ্য ট্রু এস্টিমেশন অফ লিভিং ফোর্সেস’ নামক প্রথম দার্শনিক প্রস্তাব রচনা করেন কান্ট। ১৭৪৯ সালে এটি প্রকাশিত হয়। এই রচনা মূলত শক্তির সঠিক পরিমাপ নিয়ে লাইবনিজিয়ান এবং  নিউটনিয়ানদের মধ্যে প্রাকৃতিক দর্শনের বিরোধের মধ্যস্থতা করার একটি সমালোচনামূলক প্রচেষ্টা ছিল।

১৭৪৬ সালে বাবার স্ট্রোক এবং পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর কারণে কান্টের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটেছিল। ১৭৪৮ সালের আগস্টের পরপরই কোনিগসবার্গ ছেড়ে চলে যান তিনি। কলেজের পড়াশোনা শেষ করে কোনিগসবার্গের বাইরে ছোট বাচ্চাদের গৃহশিক্ষক হিসেবে ছয় বছর কাজ করেছিলেন তিনি। ১৭৫৪ সালে কোনিগসবার্গে ফিরে আসেন তিনি। তাঁর বাবা-মা উভয়েরই ততদিনে মৃত্যু হয়েছিল, ফলে আর্থিক নিরাপত্তা তখন ছিল না কান্টের। সেই সময় তিনি তাঁর নিজের কলেজ অ্যালবার্টিনাতে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৭৫৪ সালে পৃথিবীর ঘূর্ণন সম্পর্কে বার্লিন আকাদেমির পুরস্কারের প্রশ্নে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, চাঁদের মাধ্যকর্ষণ পৃথিবীর ঘূর্ণনকে ধীর করে দেবে। ১৭৫৪ থেকে ১৭৫৫ সালের মধ্যে তিনটি বৈজ্ঞানিক কাজ প্রকাশ করেছিলেন কান্ট, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল ‘ইউনিভার্সাল ন্যাচারাল হিস্ট্রি অ্যান্ড থিওরি অফ দ্য হেভেনস’ (১৭৫৫)। এই গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সৌরজগত গ্যাসের একটি বড় মেঘ থেকে তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলেন এ-গ্রন্থে তিনি ভূতত্ত্ব বিষয়েও অবদান রেখেছিলেন। কোনিগসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার যোগ্যতা অর্জনের জন্য যে দুটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন ইমানুয়েল কান্ট সেগুলি হল, ‘কনসাইস আউটলাইন অফ সাম রিফ্লেকশন অন ফায়ার’ (১৭৫৫), এবং ‘নিউ এলিউসিডেশন অফ দ্য ফার্স্ট প্রিন্সিপালস অফ মেটাফিজিকাল কগনিশন’ (১৭৫৫)। প্রথম প্রবন্ধটি রচনা করে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি এবং দ্বিতীয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবৈতনিক প্রভাষকের পদ পেতে সাহায্য করেছিল তাঁকে। ১৭৫৫ থেকে ১৭৭০ সাল পর্যন্ত এই পদে থেকে গণিত, পদার্থবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, অধিবিদ্যা-সহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি।

পরের বছর অর্থাৎ ১৭৫৬ সালে লাতিন ভাষায় আরেকটি যে গ্রন্থ প্রকাশ করেন তার নাম ‘দ্য এমপ্লয়মেন্ট ইন ন্যাচারাল ফিলোজফি অফ মেটাফিজিক্স কম্বাইন্ড উইথ জিওমেট্রি,  অফ হুইচ স্যাম্পেল আই কনটেইনস দ্য ফিজিকাল মোনাডোলজি’। এই কাজটির মাধ্যমে আসলে নুটজেনের পর নিজের জন্য যুক্তি ও অধিবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক পদ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন ইমানুয়েল কান্ট, যদিও তিনি সফল হননি সেই কাজে। ১৭৫৭ সাল থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বিষয়েও বক্তৃতা দেওয়া শুরু করেছিলেন। ভূগোলের প্রভাষক হিসেবে কান্ট অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। ১৮০২ সালে কান্টের ভূগোলের বক্তৃতার নোটগুলি একত্র করে প্রকাশ করা হয়েছিল ‘ফিজিকাল জিওগ্রাফি’ বইতে। কান্টই প্রথম পন্ডিত যিনি বলেছিলেন যে সমস্ত ক্ষীণ নীহারিকা টেলিস্কোপের মাধ্যমে বা খালি চোখে দেখা যায় সেগুলি বহিরাগত ছায়াপথের অংশ।

এরপর থেকে ক্রমে দার্শনিক বিষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন কান্ট। ১৭৬০-এর দশকের গোড়া থেকেই একের পর এক দার্শনিক গ্রন্থ প্রকাশ করতে থাকেন তিনি। যুক্তিবিদ্যা সংক্রান্ত কান্টের একটি গ্রন্থ ‘দ্য ফলস সাবলেটি অফ দ্য ফোর সিলজিস্টিক ফিগার’ ১৭৬২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এই গ্রন্থে অন্যান্য জার্মান দার্শনিকের মতো তিনিও অ্যারিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যার সমালোচনা করেছিলেন। সেবছর রয়্যাল অ্যাকাডেমির পুরস্কার প্রতিযোগিতায় ‘এনকোয়ারি কনসারনিং দ্য ডিস্টিঙ্কনেস অফ দ্য প্রিন্সিপালস অফ ন্যাচারাল থিওলজি অ্যান্ড মরালিটি’ নামক প্রবন্ধ জমা দিয়েছিলেন ইমানুয়েল কান্ট। তবে এটি দ্বিতীয় পুরস্কার লাভ করলেও এই প্রবন্ধেই নৈতিক দর্শন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ছাপার অক্ষরে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধে তিনি লাইবনিজ-উলপিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেকটা সরে এসেছিলেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তাঁর নৈতিক দর্শনের উপর রুশোর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৭৬৩ সালে তাঁর আরও যে দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, সেগুলি হল, ‘অ্যাটেম্পট টু ইনট্রোডিউস দ্য কনসেপ্ট অফ নেগেটিভ ম্যাগনিটিউডস ইনটু ফিলোজফি’ এবং ‘দ্য অনলি পসিবিল আরগুমেন্ট ইন সাপোর্ট অফ এ ডেমোনস্ট্রেশন অফ দ্য এক্সজিসটেন্স অফ গড’। ১৭৬৪ সাল নাগাদ একজন জনপ্রিয় লেখক ও চিন্তাবিদ হয়ে ওঠেন তিনি এবং সে বছরই তিনি রচনা করেন ‘অবজারভেশনস অন দ্য ফিলিং অফ দ্য বিউটিফুল অ্যান্ড সাবলাইম’। এই গ্রন্থে পুরুষ এবং মহিলার ও বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের রুচির পার্থক্য নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। ১৭৬৬ সালে ইমানুয়েল কান্ট সুইডেনবার্গের লেখা নিয়ে কাজ করেন এবং রচনা করেন ‘ড্রিমস অফ আ স্পিরিট-সিয়ার’। অধিবিদ্যার সম্ভাবনার উপর এই তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাজ। সুইডেনবার্গের বিস্তর প্রভাব পড়েছিল কান্টের উপর। কিন্তু শেষোক্ত গ্রন্থ অনুসারে রহস্যবাদে তাঁর বিশ্বাসের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। ১৭৬৬ সালে তিনি প্রাশিয়ান রয়্যাল লাইব্রেরির দ্বিতীয় গ্রন্থাগারিক হিসেবে নিযুক্ত হন।

১৭৭০ সালের ৩১ মার্চ ৪৫ বছর বয়সে কান্ট অবশেষে কোনিগসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তিবিদ্যা এবং অধিবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। এই নিয়োগের সপক্ষে কান্টকে যে গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা করতে হয়েছিল তার নাম ‘অন দ্য ফর্ম অ্যান্ড প্রিন্সিপালস অফ দ্য সেনসিবল অ্যন্ড দ্য ইন্টেলিজিবল ওয়ার্ল্ড’। এই গবেষণা পত্রে কান্ট সংবেদনশীলতা এবং বুদ্ধিমত্তার মধ্যে পার্থক্য নিরুপণের চেষ্টা করেছিলেন। এর আগে লাইবনিজ-উলফিয়ানরা উপলব্ধিকেই কেবল একমাত্র মৌলিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। কান্ট বলেন, সংবেদনশীলতা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতে প্রবেশের চাবিকাঠি এবং বুদ্ধিমত্তা বা বোধশক্তি একটি স্বতন্ত্র বোধগম্য বিশ্ব উপলব্ধিতে সাহায্য করে। কিন্তু ১৭৮১ সালে তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য দার্শনিক গ্রন্থ ‘ক্রিটিক অফ পিওর রিজন’-এ তিনি বলেন, সংবেদনশীলতার মত বোধশক্তিও এমন একটি ফর্ম সরবরাহ করে যা আমাদের অভিজ্ঞতা গঠনে সহায়তা করে। হিউমের মতে কার্যকারণ, নৈতিকতা ইত্যাদি বিষয়গুলি অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট নয়, ফলে সংশয়যোগ্য। কান্ট অনুভব করেছিলেন একমাত্র ‘কারণ’ এই সংশয় দূর করতে পারে। প্রায় এক দশক ধরে (১৭৭০-১৭৮১) অন্য কোনো গ্রন্থ প্রকাশ করেননি তিনি, কেবল এই দার্শনিক উপলব্ধিতে এসে পৌঁছেছেন। হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের বিরোধিতা করে কান্ট বলেন, কিছু জ্ঞান মনের মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকে যা অভিজ্ঞতা থেকে স্বতন্ত্র হয়।

১৭৮০-এর দশকের শেষ থেকে কান্টের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তাঁর বিখ্যাত কাজগুলি প্রকাশিত হয়। ১৭৮৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘অ্যানসার টু দ্য কোয়েশ্চেন : হোয়াট ইজ এনলাইটেনমেন্ট?’ প্রবন্ধটি। ১৭৮৫ সালে নৈতিক দর্শনের উপর প্রথম গ্রন্থ ‘গ্রাউন্ডওয়ার্ক অফ দ্য মেটাফিজিক্স অফ মরালস’ প্রকাশ পায় এবং ১৭৮৬-তে প্রকাশিত গ্রন্থটি হল ‘মেটাফিজিকাল ফাউন্ডেশনস অফ ন্যাচারাল সায়েন্স’।

১৭৮৭-তে ‘ক্রিটিক অফ পিওর রিজন’-এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ পায়। তাঁর নৈতিক দর্শন আরও বিকাশলাভ করেছিল ‘ক্রিটিক অফ প্র্যাকটিক্যাল রিজন’ (১৭৮৮) এবং ‘মেটাফিজিক্স অফ মরালস'(১৭৯৭)-এ। ১৭৯০ সালে প্রকাশিত ‘ক্রিটিক অফ জাজমেন্ট’ গ্রন্থে কান্টিয়ান সিস্টেমকে নান্দনিকতায় প্রয়োগ করা হয়েছিল।

ইতিহাস, ধর্ম এবং রাজনীতি বিষয়ে জনপ্রিয় কিছু প্রবন্ধ ও পুস্তক রচনা করেন ইমানুয়েল কান্ট, সমর্থন করেন ফরাসি বিপ্লবকে। ১৭৯৩ সালে ধর্মতত্ত্বের উপর মূলত চারটি নিবন্ধের একটি সিরিজকে একত্র করে প্রকাশিত হয় ‘রিলিজিয়ন ইন দ্য বাউন্ডস অফ বেয়ার রিজন’। ১৭৯৫ সালে ‘পার্পেচুয়াল পিস’ নামক গ্রন্থে চিরস্থায়ী শান্তি রক্ষার উপায় বিষয়ে চিন্তা করেছেন তিনি। ১৭৯৮ সালে ‘দ্য কনফ্লিক্ট অফ দ্য ফ্যাকাল্টি’ প্রকাশিত হয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যের অবনতির ফলে অবশেষে ১৮০৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কোনিগসবার্গে ৭৯ বছর বয়সে ইমানুয়েল কান্টের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন