ইতিহাস

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট

ফ্রান্সের বিখ্যাত শাসক তথা বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (Napoleon Bonaparte) যাঁর প্রকৃত নাম নেপোলিয়ন দি বোনাপার্ট (Napoleon di Buonaparte) ছিলেন একজন পরাক্রমশালী যোদ্ধা এবং দক্ষ প্রশাসক। ফরাসি বিপ্লবের নায়ক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁকে বিশ্ব ইতিহাসের একজন অন্যতম নেতা বলে মনে করা হয়। গোটা পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন সামরিক বিদ্যালয়ে তাঁর যুদ্ধনীতি সম্পর্কে পড়ানো হয়। তাঁর রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক চেতনার জন্য একাধারে তাঁকে মানব ইতিহাসের বিশেষ জনপ্রিয় এবং বিতর্কিত নেতা বলে মনে করা হয়।

১৭৬৯ সালের ১৫ আগস্ট কর্সিকার আজাসিও শহরে নেপোলিয়নের জন্ম হয়। ষোড়শ শতকে নেপোলিয়নের পরিবার লিগুরিয়া থেকে কর্সিকাতে চলে আসে। ১৭৬৯ সালেই রিপাবলিক অফ গিনোয়া কর্সিকাকে ফ্রান্সে স্থানান্তরিত করে। বংশ পরিচয়ের দিক থেকে নেপোলিয়ন ইতালির হলেও, জন্মসূত্রে তিনি ফরাসি নাগরিক হয়ে যান। তাঁর বাবার নাম ছিল কার্লো মারিয়া দি বোনাপার্ট এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল মারিয়া লেটিজিয়া র‍্যামোলিনো। তাঁর মা এবং বাবা উভয়েই কর্সিকার স্বাধীনতা রক্ষার্থে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। নেপোলিয়নের চরিত্র গঠনে তাঁর বাবা, এবং বিশেষত মায়ের প্রচুর অবদান রয়েছে।

মাত্র ৯ বছর বয়সে তাঁকে ফ্রান্সের মূল ভূখন্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং ১৭৭৯ সালে ব্রিয়েনে একটি সামরিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেওয়া হয়। ফরাসি ভাষায় তাঁর তেমন দখল ছিল না। তিনি শুদ্ধ কর্সিকার টানে কথা বলতেন যার জন্য তাঁকে বন্ধুদের কাছে নানানভাবে অপমানিত হতে হত। ১৭৮৪ সালে ব্রিয়েনের পড়াশোনা শেষ করে তিনি প্যারিসে ইকোল রয়াল মিলিটেয়ারে ভর্তি হন। এক বছর পরে সেখান থেকে আর্টিলারির সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে বেরোন। এরপর থেকেই রাজনৈতিক এবং সামরিকভাবে তিনি সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন। কর্সিকার জাতীয়তাবাদী নেতা পাস্কাল পাওলির সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ায় তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে ১৭৯৩ সালে মার্সেইতে (Marseille) পালিয়ে যেতে হয়।

ফরাসি বিপ্লবের সময় নেপোলিয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নেন। ফ্রান্সের প্রাক্তন রাজাকে সমর্থন করা রাজতন্ত্রীদের বদলে তিনি প্রজাতন্ত্রীদের সাহায্য করেন। ১৭৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাজতন্ত্রীরা ব্রিটিশ নৌসেনার সাহায্য নিলে সেই বছরেরই ১৭ ডিসেম্বর নেপোলিয়নের নেতৃত্বে  ব্রিটিশ নৌসেনা পরাস্ত হয় এবং নেপোলিয়নকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। ১৭৯৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইতালিতে ফরাসি সৈন্যদলে তাঁকে মোতায়েন করা হয়। এরপরে ১৭৯৫ সালের ৫ অক্টোবরে প্রজাতন্ত্রীরা তাঁকে রাজতন্ত্রীদের পরাস্ত করার দায়িত্ব দেন। এক্ষেত্রেও নেপোলিয়ন সফল হলে তাঁকে মেজর জেনারেল পদ দেওয়া হয় এবং ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদিত হয়ে যায়। রাজতন্ত্রীদের ক্ষমতাচ্যুত করার পরে রাজনৈতিক মহলে নেপোলিয়নের খ্যাতি হঠাৎ করেই বেড়ে যায়।

এরপর এক এক করে তিনি বেশ কিছু যুদ্ধে ফ্রান্সকে নেতৃত্ব দেন। ১৭৯৬ সালের মার্চ মাসে ইতালিতে অস্ট্রীয় এবং সার্ডিনীয় সৈন্যকে আলাদা করার জন্য এবং তাদের পরাস্ত করার জন্য ধারাবাহিকভাবে কিছু যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ২১ এপ্রিল সার্ডিনীয় সৈন্যদের পরাস্তও করেন। তারপরে বেশ কয়েকটি যুদ্ধের মাধ্যমে অস্ট্রীয়দের থেকে লম্বার্ডি (Lombardy) ছিনিয়ে নিতে সফল হন। এরপরে ১৭৯৮ সালে মিশরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। সেখানে পিরামিডের যুদ্ধে দারুণভাবে জয়ী হলেও নীলনদের যুদ্ধে তিনি হেরে যান। তবে এই পরাজয়ের জন্য ভীষণভাবে দায়ী ছিল বিউবোনিক প্লেগ এবং সৈন্যদলের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দুর্বল সরবরাহ।

১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন যখন ফিরে আসেন তখন ফ্রান্সের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। ফরাসি বিপ্লব চলাকালীন যে অরাজকতার মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সকে যেতে হয়েছিল তা থেকে ফ্রান্স অনেকাংশেই বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু প্রজাতন্ত্রীরা ইতিমধ্যে দেউলিয়া হয়ে যায় এবং ফরাসি ডিরেক্টরির (French Directory) ওপর  ফ্রান্সের সাধারণ জনগণের আস্থাও উঠে যায়। ফলে ফ্রান্সের সাধারণ জনগণের একজন এমন নেতার দরকার ছিল যে সবদিক সমানভাবে  নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। বলাই বাহুল্য সেই মুহূর্তে ফ্রান্সে নেপোলিয়ন ছাড়া এই দায়িত্ব নেওয়ার মত জায়গায় আর কেউ ছিলেন না।

এরপর নেপোলিয়ন অষ্টম বছরের সংবিধানের( Constitution of the Year VIII) খসড়া তৈরি করেন এবং তাঁর নিজের নির্বাচনকে প্রথম কাউন্সিল হিসেবে ঘোষণা করেন। আল্পস পেরিয়ে মারেঙ্গোতে (Marengo) অস্ট্রীয়দের হারিয়ে ১৮০০ সালে নেপোলিয়ান ফ্রান্সে নিজের ক্ষমতা সুনিশ্চিত করেন। তিনি ক্ষমতায় আসার পরে ফ্রান্সের প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো হয়, আইন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার জন্য সমস্ত আইনকে কিছু নির্দিষ্টভাগে ভাগ করে আদর্শায়িত করা হয়। এই ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয় ‘কোড নেপোলিয়ন’ বা ‘নেপোলিয়ন কোড’ (Napoleon Code)। ফ্রান্সের সমস্ত বিদ্যালয়কে কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়। অর্থনীতিতেও সংস্কার সাধিত হয়, নতুন নতুন শিল্প গড়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের সাম্য, স্বাধীনতা এবং অধিকার সুনিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়। ১৮০১ সালে কনকরডাটের মাধ্যমে ক্যাথোলিক গির্জার সঙ্গে শান্তি স্থাপন করেন তিনি। এই কনকারডাট গির্জাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রাখলেও ক্যাথোলিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হতে দিত না।

১৮০৪ সালের ২ ডিসেম্বর নেপোলিয়ন নিজেকে ‘ফরাসিদের সম্রাট’ বলে অভিহিত করেন। প্যারিসের নোতরদাম গির্জায় তাঁর রাজ্যাভিষেকের অনুষ্ঠানে তিনি পোপ সপ্তম পিয়াসের থেকে মুকুট নিয়ে নিজের মাথায় পরে নেন। ১৮০৫ সালের ২৬ মে মিলান গির্জায় লম্বার্ডির লোহার মুকুট পরে ইতালির রাজা হিসেবে নেপোলিয়নের অভিষেক হয়।

ইউরোপের অন্যতম শক্তি ইংল্যান্ডকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা থাকলেও নেপোলিয়ন দ্রুত অস্ট্রো-রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ১৮০৫ সালের ২ ডিসেম্বর অস্টারলিটজের যুদ্ধে অস্ট্রো-রুশ শক্তিকে পরাস্ত করেন তিনি। ১৮০৬ সালে তিনি প্রুশিয়ান সৈন্যদেরও পরাস্ত করেন। তাঁর রাজত্ব ক্রমশ আরও বড় হতে শুরু করে।

১৭৯৬ সালের ৯ মার্চ যোশেফিন দে বহার্নিসের সঙ্গে নেপোলিয়নের বিয়ে হয়। বিয়েটি সার্বিকভাবে সুখকর হয়নি। পরে নেপোলিয়ন স্বেচ্ছায় তাঁর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটান এবং নিজের রাজত্বকে বৈধ করতে অস্ট্রিয়ার রাজা প্রথম ফ্রান্সিসের মেয়ে মারি লুসিকে বিয়ে করেন। অল্পদিনের মধ্যেই জন্মায় তাঁর বংশধর নেপোলিয়ন ফ্র্যাঙ্কোইস যোশেফ চার্লস বোনাপার্ট যিনি দ্বিতীয় নেপোলিয়ন হিসেবেই অধিক পরিচিত।

১৮০৭ সালে রাশিয়ার জার আলেকজান্ডার রোমানভের সঙ্গে টিলসিটের চুক্তি করলেও ১৮১২ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন নেপোলিয়ন। রাশিয়াকে বেশ কিছুটা পরাস্ত করে নেপোলিয়ন ও তাঁর দল যখন মস্কোতে পৌঁছায় তখন প্রবল ঠান্ডা এবং খাদ্যাভাবের জন্য তাঁরা রুশ বাহিনীর সঙ্গে পেরে উঠতে পারলেন না এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরা সেখান থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। অবশেষে জাতিসমূহের যুদ্ধে (Battle of Nations) সুইডেন, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া এবং প্রুশিয়ার মিলিত শক্তির কাছে নেপোলিয়ন পরাস্ত হন।

প্রথমে তাঁকে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী এলবা (Elba) দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়। ১৮১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সেখান থেকে তিনি পালিয়ে আসেন এবং ১০০ দিনের জন্য ফ্রান্সের শাসনভার গ্রহণ করেন। ঐ একই বছরের ১৮ জুনে ব্রিটিশ এবং প্রুশ বাহিনীর কাছে ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়ন পরাস্ত হলে দ্বিতীয়বারের জন্য তাঁকে আফ্রিকার সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়।

১৮২১ সালের ৫ মে পাকস্থলীর ক্যান্সারে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মৃত্যু হয় এবং এই ঘটনার সঙ্গেই বিশ্ব ইতিহাসের এক সুবর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।