বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে বিশদে আলোচনা করতে হলে, তার সমস্যা-সংকটের অধ্যায়গুলিকেও বিস্তারিতভাবে বুঝতে চাইলে যেসব ব্যক্তির কথা উঠে আসবে তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন ফখরুদ্দিন আহমেদ (Fakhruddin Ahmed)। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি পরিচিত হলেও তাঁর যে পরিচয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উজ্জ্বল হয়ে আছে, তা হল, তিনি স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও বেশি সময় জুড়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বা ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রেও প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়েছিলেন। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসেও কাজ করেছিলেন তিনি। এছাড়াও দেশের যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন ফখরুদ্দিন। অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন তিনি।
১৯৪০ সালের ১ মে মুন্সিগঞ্জ জেলার টংগীবাড়ি উপজেলার নগরকান্দি গ্রামে মোটামুটি এক স্বচ্ছল পরিবারে ফখরুদ্দিন আহমেদের জন্ম হয়। তাঁর পিতা মহিউদ্দিন আহমেদ পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক।
ফখরুদ্দিনের বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া হাইস্কুল থেকে সম্পন্ন হয়েছিল। ১৯৫৫ সালে ফখরুদ্দিন আহমেদ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেছিলেন। এরপর ১৯৫৭ সালে তিনি সফলভাবে আই.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। সেসময় পড়াশোনার বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন অর্থনীতিকে। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সেই একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯৬১ সালে অর্থনীতি এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।
সেই ১৯৬১ সালেই অবশ্য ফখরুদ্দিন কর্মজীবনে আহমেদ প্রবেশ করেন কিন্তু তাঁর পড়াশোনা সেখানেই থেমে থাকেনি। আরও উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ফখরুদ্দিন ১৯৭০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে ম্যাসাচুসেটসের উইলিয়ামস কলেজ থেকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অজন করেছিলেন। এরপর ১৯৭৫ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতেই পিএইচডি করেন তিনি। তাঁর পিএইচডি অর্থাৎ গবেষণার বিষয় ছিল ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট ইন আ মাল্টিসেক্টর মডেল : অ্যান অ্যাপ্লিকেশন টু বাংলাদেশ’।
১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম.এ পাশ করবার পর সেই বছরই ফখরুদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অর্থনীতি বিভাগে লেকচারার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। দুবছর সেখানে শিক্ষকতা করবার পর ১৯৬৩ সালে তিনি সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে যোগদান করেছিলেন। সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে কাজ করবার পর ফখরুদ্দিন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে এসে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে ফখরুদ্দিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব পদে যোগদান করেছিলেন। ১৯৭৮ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত এই পদের দায়িত্ব সামলেছিলেন ফখরুদ্দিন।
সেই বছরেই, অর্থাৎ ১৯৭৮ সালেই দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের কান্ট্রি অফিসার হিসেবে বিশ্ব ব্যাংকে যোগদান করেন তিনি। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফখরুদ্দিন আহমেদ এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটির বিভিন্ন পদ, যথা প্রিন্সিপাল প্রোগ্রাম অফিসার, পূর্ব আফ্রিকার কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রধান, মুখ্য অর্থনীতিবিদ, কান্ট্রি ডিরেক্টর ইত্যাদি পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার অর্থনীতি এবং উন্নয়নের নীতিগুলিই তাঁর কাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
২০০১ সালের ১৯ নভেম্বর বিশ্ব ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করেন ফখরুদ্দিন এবং তারপর ২৯ নভেম্বর বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অষ্টম গভর্নর। ২০০৫ সাল পর্যন্ত এই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কাজ করে ২০০৫ সালের ৩০ এপ্রিল এখান থেকে অবসর নেন ফখরুদ্দিন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিশৃঙ্খলা করবার কারণে ১০জন সিবিএ নেতাকে তিনি চাকরি থেকে বহিষ্কারও করেছিলেন। সেই নেতারা ক্ষমতাসীন বিএনপি দলের কর্মী হলেও ফখরুদ্দিন কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে একেবারে অটল ছিলেন। পরে অবশ্য খালেদা জিয়ার কথামতো চাকরিচ্যুতদের পুনরায় চাকরিতে বহাল করেন তিনি। এছাড়াও গভর্নর হিসেবে তিনি নতুন আর্থিক বাজারের উন্নতির জন্য মুদ্রা ও বিনিময় হার নীতি পরিচালনায় ব্যাপক সংস্কার প্রবর্তন করেন। এছাড়াও সুদের হারের নমনীয়তা প্রবর্তন করা এবং সুদের হার কমিয়ে আনা তাঁর উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতাকে আরও জোরদার করে তোলা, বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরে প্রথমবারের মতো বড় কর্পোরেট শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রক হিসেবে গড়ে তোলা ফখরুদ্দিন আহমেদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
২০০৫ সালেরই ১ জুন থেকে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন নামে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষুদ্র-অর্থায়ন সংস্থাটির সূত্রপাত হয়েছিল। অবসরের পর ফখরুদ্দিন এই সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০০৭ সাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অস্থিরতার কাল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন এবং সেই সঙ্গে সেনা সমর্থিত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারও গঠিত হয়েছিল। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অর্থাৎ এক অর্থে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফখরুদ্দিন আহমেদকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। গভীর রাতে তাঁকে ফোন করে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। স্ত্রী-র সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করে আধঘন্টা বাদে তিনি এই দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করেন। দু’বছর অর্থাৎ স্বাভাবিক সময়ের থেকে বেশি সময় এই পদে বহাল ছিলেন তিনি। এই দুই বছরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন তিনি, যেমন, দেশজুড়ে দুর্নীতিদমন অভিযানের পরিচালনা করেছিলেন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতিদমন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কার করেছিলেন, এমনকি নির্বাচনী ব্যবস্থাতেও নানারকম সংস্কারসাধন করেন ফখরুদ্দিন আহমেদ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, দুর্নীতিদমন অভিযানের সময় দুর্নীতির অভিযোগে দেশের দুই প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রাক্তন দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল ঢাকা এবং কলকাতার মধ্যে রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা। তিনি নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করে দিয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন তাঁর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়।
২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রীত্ব যাওয়ার পর ফখরুদ্দিন সেই বছর জুন মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন বলে জানা যায়। আসলে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে সংঘটিত রাজনৈতিক যে পরিবর্তন অর্থাৎ ১১জানুয়ারি দিনটির (এক-এগারো নামে পরিচিত) কর্মকান্ড সম্পর্কে তদন্তের খাতিরে সংসদীয় কমিটি জেরার জন্য তলব করতে পারে, সেই জন্যই সম্ভবত পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তিনি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আবার হজ করতে একবার সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। কলকাতাতেও এসেছিলেন তিনি কিন্তু মূলত বিদেশেই তিনি থাকতে শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড স্টেটের পটোম্যাকে দুটো বাড়ির মালিকানাও তাঁর নামে রয়েছে। একটি বাড়িতে তিনি স্ত্রী নীনা আহমেদকে নিয়ে থাকতেন এবং অন্যটিতে তাঁর মেয়ের পরিবার থাকে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্তন কর্মকর্তা হিসেবে তিনি আজও পেনশন পান বলে জানা গেছে। আবার সাময়িক সময়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়াতে ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বিষয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতাও করেছেন। তবে বর্তমানে তিনি বাংলাদেশেই রয়েছেন।
ফখরুদ্দিন আহমেদ একজন সুলেখকও। তাঁর বেশ কিছু গবেষণামূলক প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছে।
এই প্রতিভাশালী ব্যক্তি ফখরুদ্দিন আহমেদের বর্তমান বয়স ৮৩ বছর।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান