ইতিহাস

ফেরুচ্চিও ল্যাম্বরগিনি

ফেরুচ্চিও ল্যাম্বরগিনি

সবথেকে দ্রুতগতি সম্পন্ন স্পোর্টস কার অটোমোবিলি ল্যাম্বরগিনি (Automobili Lamborghini)-র স্রষ্টা হিসেবে জগদ্বিখ্যাত হয়েছেন ফেরুচ্চিও ল্যাম্বরগিনি (Ferruccio Lamborghini)। একাধারে একজন দক্ষ ইতালীয় গাড়ি-নির্মাতা, ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। কৃষিকাজের উপযোগী ট্র্যাক্টর থেকে শুরু করে দ্রুতগামী বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাণে ল্যাম্বরগিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিলেন। কর্মজীবনের একেবারে প্রথম দিকে নিজের কারিগরিবিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে একটি ফেরারি গাড়িকে সারিয়ে নতুন রূপ দিয়েছিলেন ল্যাম্বরগিনি। ট্র্যাক্টর ব্যবসা, পরে গাড়ি নির্মাণের ব্যবসা করে ইতালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। আরেক বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা এনজো ফেরারির সঙ্গে তাঁর প্রতিযোগিতা ছিল সমানে সমানে – ল্যাম্বরগিনি একে একে ইসলেরো, জারামা, এস্পাডো, মিউরা ইত্যাদি স্পোর্টস কার বাজারে আনলে ফেরারির গুণমান অনেকাংশে পিছিয়ে পড়ে।

১৯১৬ সালের ২৮ এপ্রিল উত্তর ইতালির এমিলিয়া-রোমাগ্না অঞ্চলের ফেরারা প্রদেশে রেনাজো ডি সেন্টো শহরে ফেরুচ্চিও ল্যাম্বরগিনির জন্ম হয়। তাঁর বাবা আন্তোনিও ল্যাম্বরগিনি ছিলেন একজন আঙুর-উৎপাদনকারী এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল এভেলিনা ল্যাম্বরগিনি। জন্মের চার দিনের মাথাতেই তাঁকে রোমান ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত করা হয়। ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজের জীবনে অভ্যস্ত থাকার ফলে কৃষিব্যবস্থার থেকেও কৃষি-সহায়ক যন্ত্রপাতির দিকেই তাঁর মন বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল। পরবর্তীকালে ক্লেলিয়া মন্টি নামে এক মহিলাকে বিবাহ করলেও ১৯৪৭ সালে এক পুত্র সন্তান টোনিনোকে রেখে তাঁর স্ত্রী মারা যান। তারপরে অ্যানিতা বোরগাত্তির সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন ফেরুচ্চিও ল্যাম্বরগিনি, কিন্তু এই বিবাহ স্থায়ী হয়নি বেশিদিন। তৃতীয়বার মারিয়া টেরেসা কেনকে বিবাহ করেন তিনি। তাঁদের এক কন্যা সন্তান জন্মায় প্যাট্রিসিয়া নামে।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

কারিগরিবিদ্যার প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে ল্যাম্বরগিনি বলগ্নার কাছে ফ্রাতেলি টাড্ডিয়া টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করেন। ১৯৪০ সালে ইতালীয় রয়্যাল এয়ার ফোর্সে যোগ দেন তিনি। এই সময় রোডস দ্বীপের ইতালীয় গ্যারিসনে একজন কারিগর হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে এয়ার ফোর্সে যানবাহন দেখাশোনার সুপারভাইজারের পদে উন্নীত হন ল্যাম্বরগিনি। ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশরা এই দ্বীপ অধিকার করে নিলে বন্দি হিসেবে ল্যাম্বরগিনি কারাগারে আটক হন এবং পরের বছর পর্যন্ত ঐ দ্বীপেই বন্দি থাকেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, পিভ ডি সেন্টো-তে একটি গ্যারাজ খোলেন ল্যাম্বরগিনি। অবসর সময়ে ট্র্যাক্টর নির্মাণে মনোনিবেশ করতেন তিনি, কিন্তু একটি পুরনো ফিয়াট টোপোলিনো গাড়িকে একেবারে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলেন তিনি সময় নিয়ে। মনে করা হয় সেটাই তাঁর বানানো প্রথম ল্যাম্বরগিনি গাড়ি। আদপে এই গাড়িটি ঘরোয়া ব্যবহারের জন্য নির্মিত হয়েছিল, কিন্তু ল্যাম্বরগিনি নিজের কারিগরিবিদ্যার প্রয়োগ ঘটিয়ে ৭৫০ সিসি আয়তনের গর্জনশীল ওপেন টপ টু-সিটার গাড়িতে বদলে ফেলেন এটিকে। ১৯৪৮ সালে মিলি মিগলিয়া অনুষ্ঠানে এই গাড়িটি নিয়েই প্রবেশ করেন তিনি এবং ১১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন গাড়িটি নিয়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একটি দুর্ঘটনায় গাড়িটি নষ্ট হয়ে যায়।

১৯৪৭ সালে যুদ্ধ-পরবর্তী ইতালিতে কৃষিব্যবস্থা ও শিল্পের পুনরুত্থানের পরিবেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা টের পেয়েছিলেন ল্যাম্বরগিনি। সামরিক যানবাহনের থেকে যন্ত্রাংশ নিয়ে প্রথমবার তিনি নির্মাণ করেন ক্যারিওকা ট্র্যাক্টর। মরিস ট্রাকের ছয়টি পেট্রল সিলিণ্ডার এতে জুড়ে দিয়েছিলেন ল্যাম্বরগিনি। এরপর ট্রাটোরি ফ্যাক্টরিতে তিনি ট্র্যাক্টর নির্মাণের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং উৎপাদন বাড়াতে শুরু করেন। ইতালিতে সবথেকে শ্রেষ্ঠ ট্র্যাক্টর হিসেবে ল্যাম্বরগিনির নির্মিত ট্র্যাক্টরগুলি বিখ্যাত হয়ে ওঠে এবং তাঁর বানানো ট্র্যাক্টরের কার্যক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য শহরে ‘ট্র্যাক্টর-পুল’ আয়োজন করেন। এই ট্র্যাক্টর ব্যবসার ফলেই প্রভূত ধনসম্পদ লাভ করেন ফেরুচ্চিও ল্যাম্বরগিনি। এরপরে তিনি আরেকটি কারখানা খুলে শীততাপ নিয়ন্ত্রণ ও কেন্দ্রীয় তাপদায়ী ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ নির্মাণ করা শুরু করেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই ইতালিতে সর্বাধিক ধনী ব্যক্তি হিসেবে ল্যাম্বরগিনির নাম উঠে আসে। সেই সময় বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতির গাড়িগুলি তাঁর সংগ্রহে ছিল, মার্সিডিজ এসএল ৩০০, জাগুয়ার, ফেরারি ইত্যাদি দ্রুতগতির গাড়ির জন্য ল্যাম্বরগিনির আকর্ষণ সংবাদে পরিণত হয় ইতালি জুড়ে। কিন্তু তাঁর সংগ্রহের ফেরারি গাড়িটিতে ক্লাচে কিছু সমস্যা হওয়ায় ফেরারি কোম্পানির মালিক এনজো ফেরারির কাছে অভিযোগ জানাতে গেলে ফেরারি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অসম্মত হন। তিনি খেয়াল করেন যে ফেরারি গাড়িতে লাগানো ক্লাচটির সঙ্গে ল্যাম্বরগিনির নিজের বানানো ট্র্যাক্টরের ক্লাচের কোনো পার্থক্য নেই। ফলে কারখানায় নিয়ে গিয়ে ঐ ফেরারি গাড়িতে ট্র্যাক্টরের একটি বোর্গ অ্যাণ্ড বেক ক্লাচ লাগিয়ে নেন এবং তারপরে সেই গাড়িতে আর কোন সমস্যা হয়নি। ল্যাম্বরগিনি দেখলেন ট্র্যাক্টর এবং তেলের বার্নারের ব্যবসার ফলে তাঁর প্রভূত অর্থ উপার্জন হচ্ছে খুব বেশি পরিশ্রম না করেই। এই সময় তিনি গ্র্যাণ্ড ট্যুরিজমো গাড়ি নিয়ে নতুন একটা ব্যবসার পরিকল্পনা করেন। ষাটের দশকের শুরু দিকে সান্ত আগাতায় একটি সম্পূর্ণ নতুন কারখানা গড়ে তোলেন ল্যাম্বরগিনি। এই কারখানাতেই তৈরি হতে থাকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও উন্নত মানের গ্র্যাণ্ড ট্যুরিজমো গাড়ি। সবথেকে দ্রুতগামী ভি১২ জিটি মডেল তৈরির চেষ্টা করতে থাকেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ইতালিতে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে অনেকগুলি ব্যবসায়িক চুক্তি হারান তিনি। সত্তরের দশকেই ল্যাম্বরগিনির কোম্পানিগুলি আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় যে কোম্পানি তাঁর থেকে ল্যাম্বরগিনি ট্রাত্তোরি গাড়ি আমদানি করত, সেই চুক্তি তারা বাতিল করে। এভাবে ধীরে ধীরে বিরূপ পরিস্থিতিতে গাড়ি নির্মাণ ব্যবসা পুরোপুরি ছেড়ে দেন তিনি এবং তাঁর সমস্ত স্টেক হোল্ডিং বিক্রি করে দেন। ইতিমধ্যে ১৯৬৯ সালে হাইড্রলিক ভাল্‌ভ এবং যন্ত্রাংশ নির্মাণের জন্য তিনি তৈরি করেন ‘ল্যাম্বরগিনি ওলিওডিনামিকা এসপিএ’ নামে নতুন এক সংস্থা। সত্তরের দশকে তাঁর নতুন কারখানাটি অন্য কোম্পানিকে বিক্রি করে দিয়ে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু প্রকৃত অবসর তাঁর ছিল না। দক্ষিণ ইতালির পেরুগিয়াতে ‘ব্লাড অফ দ্য মিউরা’ নামের একপ্রকার বিশেষ মদ উৎপাদন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হন ল্যাম্বরগিনি। একজন কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ার সুবাদে অবসর নেওয়ার সময় তিনি ফের কৃষি ব্যবস্থায় ফিরে গেলেন। ল্যাম্বরগিনি নিজের সংস্থায় ওয়াইন উৎপাদন করতে শুরু করেন। এই সময় নিজের চেষ্টায় একটি গল্‌ফ কোর্স তৈরি করেন ঐ এস্টেটে। ত্রাসিমেনো হ্রদের ধারে ফেরুচ্চিও ল্যাম্বরগিনির বিশাল এস্টেট ‘লা ফিওরিতা’য় বর্তমানে একটি বিশাল মদ্য উৎপাদক কারখানায় প্রতি বছর আট লক্ষ বোতল মদ উৎপন্ন হয়ে থাকে এবং এই এস্টেটেই ফেরুচ্চিওর সংগ্রহের সেই সময়কার গাড়িগুলি নিয়ে একটি ব্যক্তিগত জাদুঘর গড়ে উঠেছে।

এনজো ফেরারির সঙ্গে তাঁর স্পোর্টস কার নির্মাণ নিয়ে এক সুস্থ প্রতিযোগিতা চলেছিল যার ফলে এস্পাডা, মিউরা, ইসলেরো, জারামা ইত্যাদি উন্নতমানের স্পোর্টস কার বাজারে আনেন ল্যাম্বরগিনি যা ফেরারিকে টেক্কা দেয়। বলা হয়, ফেরারির সঙ্গে কথা বলতে চাওয়ার ঘটনায় ফেরারি অস্বীকৃত হয়েছিলেন বলেই তাঁকে টেক্কা দেবার চেষ্টায় উঠে পড়ে লেগেছিলেন ফেরুচ্চিও ল্যাম্বরগিনি। ১৯৬৪ সালে তাই তিনি প্রথম তৈরি করেছিলেন ল্যাম্বরগিনি ৩৫০ জিটি নামের একটি গাড়ি যা সেকালের ফেরারি গাড়ির গুণমানকে অনেক পিছনে ফেলে দেয়।  

গাড়ি নির্মাণ, গাড়ির ব্যবসা, মদ্য উৎপাদন এই সবের পাশাপাশি একটি অদ্ভুত শখ ছিল ল্যাম্বরগিনির আর তা হল স্পেনীয় ষাঁড়ের লড়াই। ১৯৬২ সালে একটি খামারবাড়িতে ষাঁড় দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি যে তাঁর গাড়ি কোম্পানির প্রথম প্রতীক হিসেবে ষাঁড়কেই বেছে নেন। আবার অনেকে মনে করেন তাঁর বৃষ রাশি হওয়ার কারণেও ষাঁড়ের প্রতি তাঁর এই দুর্বলতা জন্ম থেকেই ছিল। সেভিল র‍্যাঞ্চ নামের সেই খামারবাড়ির মালিক ছিলেন ডন এডুয়ার্ডো মিউরা। জানা যায়, ল্যাম্বরগিনি তাঁর পরিবার এবং ষাঁড়ের খামারের অনুসরণে তাঁর একটি গাড়ির নাম রেখেছিলেন। তাঁর ‘ইসলেরো’ গাড়িটির নামকরণ করা হয়েছিল মিউরার একটি ষাঁড়ের নামে। ১৯৭৪ সালে ল্যাম্বরগিনি তাঁর নির্মিত আরেকটি গাড়ির নাম দেন ‘উরাক্কো’ যা একটি ষাঁড়ের অনুকরণে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ‘কাউন্টাক’ গাড়ির নামের ক্ষেত্রে কোন ষাঁড়ের অনুষঙ্গ ছিল না।  

১৯৯৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ৭৬ বছর বয়সে পেরুগিয়ার সিলভারস্টিনি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ফেরুচ্চিও ল্যাম্বরগিনির মৃত্যু হয়।    

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন